পশ্চিম মেদিনীপুর : সময় বদলেছে, বদলেছে সমাজের রীতিনীতি। কিন্তু আড়াইশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও অটুট খেতুয়ার চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। পশ্চিম মেদিনীপুরের (Midnapore) কেশপুরের এই বনেদি বাড়িতে দুর্গোৎসব মানেই প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি, পারিবারিক আবেগ আর প্রজন্মের মিলন। দীর্ঘদিনের রীতিনীতি মেনেই আজও দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা।
এই পুজোর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এক বিশেষ কাহিনির সঙ্গে। পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্বপুরুষরা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। এরপর বাড়ির পাশের পুকুর থেকে দেবী দুর্গার মূর্তি উদ্ধার করেন তাঁরা। সেই মূর্তিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় পুজো। তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে চৌধুরী পরিবার। আড়াইশো বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও পুজোর মূল প্রথাগুলি আজও ধরে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা।
এই বনেদি বাড়ির পুজোর (Puja) অন্যতম আকর্ষণ সন্ধিপুজো। নির্দিষ্ট সময় মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয় এই বিশেষ আরাধনা। তবে সন্ধিপুজো ঘিরে রয়েছে পরিবারের নিজস্ব কিছু রীতি। পরিবারের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, সন্ধিপুজোর বিশেষ উপাচার হিসেবে ব্যবহৃত সিঁদুর ও ফুল পরিবারের বাইরের কাউকে দেওয়া হয় না। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নিয়ম পুজোর স্বাতন্ত্র্যকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
তবে চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের অন্য সময়ে কাজের সূত্রে কিংবা নানা কারণে পরিবারের বহু সদস্য দূরে থাকেন। দুর্গাপুজো তাঁদের আবার এক ছাদের নীচে নিয়ে আসে। পুরনো বাড়ির আনাচকানাচে ফিরে আসে হাসি, গল্প, আড্ডা আর আনন্দের মুহূর্ত। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করারও উপলক্ষ হয়ে ওঠে এই উৎসব।
আরও খবর : বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের পুজোর উপহার, পরিবার পিছু ৫ হাজার টাকা ও ৫০ কেজি অতিরিক্ত চাল
পরিবারের সদস্য কাজল চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। পুজোর নিয়মনীতি ও রীতিনীতি যথাযথভাবে বজায় রাখার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। তাঁর কথায়, “বয়সে বড় না হলেও সম্মানে বড়। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারের পুজোর সঙ্গে রয়েছি। পুজোর সমস্ত রকম নিয়ম-নীতি ও রীতিনীতি যাতে ঠিকভাবে বজায় থাকে, সেই বিষয়টি আমি দেখভাল করে থাকি।”
কাজল চৌধুরীর মতে, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের অভিজ্ঞতা এবং দায়িত্ববোধের কারণেই আজও টিকে রয়েছে বহু পুরনো প্রথা। তাঁদের কাছ থেকেই নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে পুজোর ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা।
আড়াইশো বছরের ইতিহাস, স্বপ্নাদেশ ঘিরে প্রচলিত কাহিনি এবং সন্ধিপুজোর বিশেষ নিয়ম—সব মিলিয়ে খেতুয়ার চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো আজও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই পুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং শিকড়ের টান, পারিবারিক মিলন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা বিশ্বাসের এক জীবন্ত ইতিহাস।
