তা সে যতই কালো হোক…৷
কবি হয়তো এরপরেও কালো হরিণ চোখ দেখেছেনে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বড়ই আবর্জনা-বিলাসী৷ এখানে কালো রঙের নায়িকার গায়ে তীক্ষ্ণ ফলার মতো বিঁধতে থাকে কালো হওয়ার ‘কলঙ্ক৷’ এখানে ‘হরিণ চোখ’ নেই, বরং আছে প্রাচীন গাঁও বুড়োর মতো কিছু পিচুটি-মাখা চোখ, যে-চোখ কালোকে সহ্য করতে পারে না কিছুতেই৷ যেমন হয়েছে অভিনেত্রী শ্রুতি দাসের বেলায়৷
‘ত্রিনয়নী’ খ্যাত ‘কালো মেয়ে’ শ্রুতি দাস চেয়েছিলেন, সবাই তাঁর পাশে থাকুন। শ্রুতি জেনে খুব খুশি যে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে তসলিমা নাসরিন, লিলি চক্রবর্তী থেকে বীরবাহা হাঁসদা—সবাই তাঁকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলে অত্যন্ত বিরক্ত। এমন ঘটনায় কেউ অবাক, কেউ বা আদৌ অবাক নন। কারণ নারী যেখানে এখনও ‘পণ্য’, সেখানে এই ঘটনা নতুন করে বিস্ময় উদ্রেক করে না।
কাব্য করে কৃষ্ণকলি বলা হলেও সামাজিকভাবে গায়ের রং এখনও একটি বিষয়। স্কুল কলেজ থেকে পাড়ার রাস্তায় ছুড়ে দেওয়া হয় গায়ের রং নিয়ে নানা মন্তব্য। চাকুরিজীবনে অফিসের সবচেয়ে ফর্সা মেয়েটাকে ঘিরে যতটা মনোযোগ সবার, কালো মেয়েটাকে নিয়ে ততটাই অবজ্ঞা। বিয়ের পিঁড়িতে বসতে গেলেও যোগ্যতা, পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিকতা— সব গুণ চাপা পড়ে যায় গায়ের রঙে।
এই একুশ শতকেও নেটদুনিয়ায় সাঙ্ঘাতিকভাবে বর্ণবৈষ্যমের শিকার শ্রুতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক অশালীন মন্তব্যের স্ক্রিনশট তুলে ধরেন অভিনেত্রী। জানান, বর্ধমানের কাটোয়ার এক পরিচিত বাসিন্দা তাঁকে কটূক্তি করেছেন। এর পরেই শ্রুতি দ্বারস্থ হন লালবাজারের। সাইবার দমন শাখায় মেল করে অভিযোগও দায়ের করেন তিনি। এই অভিযোগ দায়ের করার নির্দিষ্ট কারণ আছে বলে মনে করেন শ্রুতি।তিনি বলেন, “এই ঘটনা প্রকাশ্যে এনে পাবলিসিটি বাড়ানোর ইচ্ছে নেই আমার।মৌন ভাব কখনও সম্মতির লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনও আর্টিস্টের ফেসবুকে এ-রকম অশালীন মন্তব্য করা এবং সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা খারাপ প্রভাব পড়ে দর্শক মহলে।”
প্রথম ধারাবাহিক থেকেই নেটনাগরিকদের কুমন্তব্য শ্রুতির নিত্যসঙ্গী। কেন ‘কালো’ মেয়ে ধারাবাহিকের নায়িকা হবে? এই আপত্তি থেকেই লাগাতার কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে।
সবার উদ্দেশে শ্রুতি বলেন, ”আমার এই লড়াইয়ের একটাই কারণ, বাকিরা যেন চুপ না থাকে।আমি কলকাতা পুলিশ, সাইবার ডিপার্টমেন্ট, মহিলা কমিশন সবাইকে পাশে পেয়েছি। আমি অভিনেত্রী বলেই প্রশাসন পাশে আছে এমনটা নয়। আপনার সঙ্গে এ-রকম হলে আপনিও সবাইকে পাশে পাবেন। আমার এই লড়াই বাকিদের পথ দেখাবে বলেই আশা রাখি।”
শ্রুতির গায়ের রং যে আলোচনার বিষয় হতে পারে তা ভেবেই হতবাক বিশিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্না লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মতে অবশ্য এই ব্যাপারটি অস্বাভাবিক কিছুই না।তাঁর কথায়, “আজও সমাজে সাদা গায়ের রঙকে সুন্দরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। লড়াই করে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দিলেও তাদের গায়ের রংটা আমরা ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি। বাঙালি হিসেবে যতই ক্ষুদিরাম, সূর্য সেনের দেশ বলে মুখে বড়াই করি না কেন, সাদা রংটার প্রতি আমাদের অদ্ভুত একটা টান আছে। এখনও একটি মেয়ের ব্যক্তিত্ব, স্বনির্ভরতা কোনও বিচার্যের বিষয় নয়। আমাদের সংস্কৃতি কিছুটা বিকৃত হলেও সাদা-কালো রঙের বিষয় এখনও অবিকৃত।পুরুষতন্ত্রে এখনও মেয়েকে পণ্য হিসেবেই ভাবা হয়।”
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এই ঘটনায় অবাক। তাঁর কথায়, “যথেষ্ট অবাক হলাম এই ঘটনা শুনে। ভারতবর্ষ কালোর দেশ। এই দেশে কালো নিয়ে নিন্দে করাটা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক। হিসেব করে দেখলেই দেখা যায় অধিকাংশই কালো মানুষ এ দেশে এবং এটাই স্বাভাবিক।এই ট্রোলিংটাই হাস্যকর। যারা ট্রোল করছে তাদের উপেক্ষা করাটাই ভালো। সোশ্যাল মিডিয়া আজকাল লাগামছাড়া। কিছু কর্মহীন মানুষ ভুয়ো অ্যাকাউন্টের আড়ালে এ-সমস্ত কাজ করে বেড়ায়। শ্রুতিকে বলব, তুমি যেমন সে-রকমই থাকো।’
কালো হওয়ায় কটূক্তি শুনতে হয়েছে বিধায়ক তথা অভিনেত্রী বীরবাহা হাঁসদাকেও।তিনি বলেন, “ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে চারদিকের সমাজ, কালো হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই নিচু চোখে দেখা হয়েছে। ছোটোবেলায় নাচ করতাম। সেখানেও ফর্সাকে সুন্দরের সঙ্গে তুলনা করা হতো। নাচ ঠিকঠাক না-পারলেও তাদের জন্যই ভালো রোল বরাদ্দ থাকত। অভিনয় জগতেও এ-রকম অবহেলিত হতে হয়েছে বহুবার। মায়ের কথামতো মনোবল না-ভেঙে এগিয়ে গিয়েছি।বারাক ওবামার গায়ের রং কালো হওয়া সত্ত্বেও দেশ চালিয়েছেন তিনি। তাই যারা রং দিয়ে বিচার করে, তারা নিজেদের অশিক্ষিত মানসিকতারই পরিচয় দেয়।”
অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তীর কাছে রং কখনওই বিচার্য বিষয় নয়। তিনি বলেন, ‘কালো-ফর্সা কখনওই মানিনি। আমার কাছে সবাই ভালো। একটা মেয়েকে এ ভাবে ছোটো করা বড়োই নিন্দনীয়। ঘটনাটি শুনে খারাপ লাগল। ওর ভবিষ্যৎ অনেক বড়। এ-রকম কুরুচিকর মন্তব্যে কান না-দিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধির কাজ।’
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশে পেয়ে আপ্লুত শ্রুতি।বললেন, “তসলিমাদির ভীষণ বড় ভক্ত আমি। সবাই আমার শ্রদ্ধেয়। ওঁদের পাশে পেয়ে খুব খুশি।”
শুধু শ্রুতিই নন, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বাইরে বলিউডেও এমন উদাহরণ দেখা গিয়েছে আগে। প্রথম প্রথম কাজের সময় বিপাশা বসু, প্রিয়াঙ্কা চোপড়াদেরও গায়ের রং নিয়ে নানা কুরুচিকর মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে। তবে নিজের কাজ নিয়ে তাঁরা যেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, একই পথের পথিক বাঙালি মেয়ে শ্রুতিও। সব কিছুরই মোক্ষম জবাব পাওয়া যাবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী৷ তা সে আজ হোক কিংবা কাল।