29.9 C
Kolkata

Fourth Pillar | ইতিহাসে থেকে যাবে এক অপদার্থ শাসকের নাম নরেন্দ্র মোদি

Must Read

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, চৌকিদার, চায়ওয়ালা, প্রধান সেবক বেশিরভাগ সময়েই মিথ্যে বললেও দু একটা সত্যি কথা বলেন, বলে ফেলেন, তার মধ্যে একটা সত্যি কথা তিনি এই কদিন আগেই বলেছেন। তিনি বললেন, ওয়েলথ ক্রিয়েটরস আর অলসো ইম্পর্টান্ট ফর দ্য কন্ট্রি, অনলি দেন দ্য অয়েলথ ক্যান বি ডিসট্রিবিউটেড। হাউ ক্যান ওয়েলথ রিচ দ্য পুওর, হাউ ক্যান জবস বি ক্রিয়েটেড। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, যারা সম্পদ তৈরি করে তাঁরাও দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, একমাত্র তাহলেই সম্পদের বিতরণ সম্ভব। তিনি প্রশ্ন করছেন, কিভাবে সম্পদ দেশের গরীবদের কাছে পৌঁছবে, কিভাবে রোজগার তৈরি হবে? এই প্রথম আমি একমত, ১০০ শতাংশ একমত আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে, এই প্রথম সম্পূর্ণ একমত। এবার আসুন দেখা যাক বাস্তব টা কী? কারা সম্পদ তৈরি করে? কারা সেই সম্পদ ভোগ করে? কিভাবে সম্পদের বিতরণ হয়। কারণ সেইখানেই লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম প্রশ্ন, যে প্রশ্ন সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে চাইছেন মিঃ প্রাইম মিনিস্টার, মোদিজী (Narendra Modi)। আমাদের দেশের সম্পদ কার হাতে? অক্সফ্যাম রিপোর্ট সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সম্পদ আর তার বিতরণ নিয়ে, এক রিপোর্ট তৈরি করেন। ২০২৫ এর রিপোর্ট বলছে, দেশের ১ শতাংশ মানুষের কাছে দেশের মোট সম্পদের ৪০.১০ শতাংশ দখলদারি আছে, দেশের ১০শতাংশ মানুষের কাছে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ সম্পদ রাখা আছে আর ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে আছে বাকি ৪২ শতাংশ সম্পদ। তারও মধ্যে মানেই ওই ৪২ শতাংশ সম্পদের মধ্যে, ৮০% সম্পদ রয়েছে ওই মানুষজনের ৩০ শতাংশ এর হাতে। মানে মোদ্দা হিসেব বলছে, দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের ১০ শতাংশ এর মত সম্পদ। মানে দেশের মানুষের ১শতাংশ ভোগ করে ৪০ শতাংশ সম্পদ আর দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের কাছে আছে ১০ শতাংশ সম্পদ। ৬৭ শতাংশ মানুষ গত এক দশকে ১শতাংশ সম্পদ বাড়াতে পেরেছেন, আর কেবল আম্বানি গত অতিমারীর মানে কোভিড কালের মধ্যেও, গত বছরে তাদের সম্পদ বাড়িয়েছে ২ কোটি ৭৭ হাজার, ৭০০ কোটি টাকা, মানে ২০২০ তে প্রতি ঘন্টায় আম্বানির কোম্পানির আয় হয়েছে ৯০ কোটি টাকা, হ্যাঁ প্রতি ঘন্টায়। যে অতিমারীর বছরে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১৭ শতাংশ এর বেশি, মানে চাকরি চলে গেছে, মাইনে বাড়া তো দুরস্থান। তাহলে দাঁড়ালো কী? দেশের ওয়েলথ ক্রিয়েটর, যারা সম্পদ তৈরি করে বলে প্রধানমন্ত্রীর ধারণা, তাদের হাতেই রয়েছে দেশের সিংহ ভাগ সম্পদ, ওয়েলথ তৈরি হয়েছে এটা ঠিক যদি ধরেও নেওয়া যায়, তাহলে তার বিতরণ কোথায়? কে টাকা তৈরি করল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল কার কাছে টাকাটা গেলো? ২০০০ সালের আগে দেশে ৯ জন এর কাছে ১০০ কোটি বা তার বেশি টাকা ছিল, মুক্তকচ্ছ অর্থনীতি এসে গেলো, ২০১৭ তে সেই সংখ্যা দাঁড়ালো ১০১ এ, মানে ১০১ জনের কাছে ১০০ কোটি বা তার বেশি সম্পদ এসে গেলো, আর ২০২৫ এ? সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৪ জনে, মানে ক্রমশ সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছে মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে, ২০১৪ – ২০২৫ এর মধ্যে প্রতিদিন এই সম্পদ আরও বেশি বেশি করে কুক্ষিগত হয়ে চলেছে, আর আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী যেটাকে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন, বড়লোকের আরও বড় লোক হওয়া, গরীব মানুষের আরও গরীব হতে থাকা।

গত এক দশকে ওই বিলিওনিয়ার, ১০০ কোটি সম্পদের অধিকারীদের তালিকা বেড়েছে দশ গুণ, ২০২৪ – ২৫ তে ১৬৮৭ জন এমন বিলিওনিয়ারের সম্পদ ছাড়িয়ে গেছে দেশের মোট বাজেট বরাদ্দের থেকে, তাদের সম্পদ এখন ১৬৭ লক্ষ কোটি টাকা। কেবলমাত্র স্বাস্থ খাতে খরচ বেড়ে যাওয়ার জন্য, ৬৩ কোটি মানুষ চলে এসেছে দারীদ্র সীমার তলায়, মানে প্রতি সেকেন্ডে ২ জন মানুষ চলে আসছে দারিদ্র সীমার তলায়, একজন মজুর নুন্যতম যে মজুরি পান, তাই যদি পেতে থাকেন তাহলে তাকে ৯৪১ বছর ধরে রোজগার করতে হবে, তাহলে তিনি দেশের একজন বড় বস্ত্র তৈরি কোম্পানির বড়কর্তার বছরে যত আয় করেন, তার সমান রোজগার করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী একদিকের কথা বললেন, সম্পদ তৈরির কথা বললেন, সম্পদ বিতরণের কথা তাঁর কি জানা নেই? বিলক্ষণ আছে, তিনি বললেন না, বললেন না যে দেশের সবথেকে বড় শিল্পপতি আমীর আদমীর ৭ জনের ৫ জনই গুজরাটের, দেশের প্রতি পাঁচজন ১০০ কোটি ক্লাবের সদস্যদের ৪ জন গুজরাটের, সম্পদ কুক্ষিগত করার খেলাটা যে রায়দূর্লভ, জগত শেঠের সময় থেকেই চলছিল, এখন তা আরও গতি পেয়েছে, এটাই সত্য। এতক্ষণ বলছিলাম বিতরণের কথা, এবার আসুন সম্পদ তৈরির কথা নিয়েও দুটো কথা হোক। কারা তৈরি করছেন সম্পদ? কিভাবে তৈরি হচ্ছে সম্পদ? সম্পদ দু রকমের হয়। এক, যার বাজারে মুল্য আছে, তার কেনা বেচা হয়, তার মালিকানা হয়। দুই, সেই ধরণের সম্পদ যা জরুরি কিন্তু এখনও তার কোনও বেচা কেনা নেই, বাজারে তার আর্থিক মুল্য নেই। আর মালিকানার দিক থেকে সম্পদ কে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়, ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পদ আর রাষ্ট্রিয় মালিকানার সম্পদ, মজার কথা হল, একটা সময় এমন ছিল, যখন সম্পদের কোনও মালিকানা ছিল না, রাষ্ট্রও ছিলনা, সম্পদের ওপর ব্যক্তির কোনও মালিকানাও ছিলনা, গাছে ফল পেড়ে খাও, গুহা বেছে নিয়ে থাকতে শুরু করো, শিকার পেলে মারো, মেরে খাও। এক আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা, সম্পদ এর সামাজিক মালিকানা, যার প্রয়োজন সে ব্যবহার করো। কিন্তু খুব দ্রুত সেই সম্পদের মালিকানা নির্ধারণ হতে থাকলো, লাঠির জোরে, তলোয়ারের জোরে, সৈন্যবাহিনীর জোরে দখল হল ভূমি, গরু, ছাগল, মেষ এবং পরাজিতদের স্ত্রী, অন্যান্য মহিলারা, হ্যাঁ তাদেরকেও সম্পদ হিসেবেই মনে করা হত, দখল হল নদী, লেক, পুকুর এর জলের ব্যবহার, ফল, ফুল, মাছ, সবজি বাজারে এল। বাজার জমে উঠল, কেউ কেউ পয়সা কামালো, কেউ গরীব থেকে গেলো, কেউ খাজনা দিল, কেউ খাজনা পেল। সম্পদ তো ছিলই, তা কিছু মানুষের হাতে যেতে থাকলো, সমস্যা সম্পদের নয়, সমস্যা তা বিতরণের, এন্টায়ার সায়েন্স পড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক বলেছেন, সম্পদ যারা তৈরি করেন তারা গুরুত্ব পূর্ণ, কিন্তু উনি সম্পদ তৈরি করেন বলতে যাদের কে বুঝিয়েছেন, তাঁরা সম্পদ তৈরি করেন না, তারা সম্পদ এর দখলদার, তারা সম্পদ এর মালিকানা পেয়েছেন লাঠির জোরে, গায়ের জোরে বা মোসায়েবি করে, মানুষ ঠকিয়ে। সম্পদ তো সমাজের, সম্পদ তো প্রত্যেকের ছিল, কিছু লোকের হাতে তা কুক্ষিগত হল তো অনেক পরে। এবং তারপরেও, সেই সম্পদ এর আর্থিক মুল্য নির্ধারিত হয় সেই সম্পদের মালিকানা দিয়েই নয়, মানুষের শ্রম দিয়ে, মানুষ শ্রম দেয়, একটা লোহা হয়ে ওঠে তরোয়াল, মানুষ শ্রম দেয়, একটা পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হয়, মানুষ শ্রম দেয় এক নগর গড়ে ওঠে, মানুষ শ্রম দেয় বলেই মাঠের সোনালি ধান ঘরে আসে, সম্পদ তৈরি হয় শ্রম দিয়ে, নাহলে আর যা কিছু তা তো ছিলই পৃথিবীতে, ছিল তো মাটির তলায় কয়লা লোহা সোনা, ছিল তো গাছ আর গাছের ফল, ছিল তো উর্বর জমি। কিন্তু শ্রমই তো সেই সোনার কাঠি, যা নাকি এই সব কিছুকে সম্পদ তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বেকার ছেলেমেয়েদের চাকরি নিয়ে অনর্গল মিথ্যে বলছেন মোদিজি

এবার পড়ে থাকে বিতরণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ঠিক এইখানটাতেই আপনাদের চাতুর্য বড্ড পরিস্কার, আপনাদের এই বিতরণের বদমাইসি আমরা জানি, সম্পদের মালিকানা কে কুক্ষিগত করে রাখার ছকটা আমরা জেনে ফেলেছি, অতএব বাজে কথা বলা বন্ধ করুন। আদানি আম্বানি, গোয়েঙ্কা, টাটা, বিড়লারা দেশের সম্পদ তৈরি করে না। ওই যে সিংঘু বর্ডারে যেখানে কাঁটা তারের বেড়া দিয়েছিলেন, যাদের আটকাতে, ওই কৃষকরা দেশের সম্পদ তৈরি করে, দেশের সম্পদ তৈরি করে ওই শ্রমিকরা যাদের ট্রেড ইউনিয়নের আইন কেড়ে নিতে চান আপনারা, নতুন শ্রম বিল তো সেই জন্যেই এনেছেন। তারা, সেই শ্রমিক, কৃষক আম জনতা তৈরি করে দেশের সম্পদ, এবার তারা তাদের সম্পদের দখলদারি চায়। আর চোখের সামনে তাকিয়ে দেখুন ভুয়ো দখলদারদের, যারা দেশের সম্পদ লুঠ করে পালিয়ে যায় বিদেশে, যে লিস্টে আপনার পরিচিত জনের সংখ্যা খুব কম নয়, মেহুল চোকসি কে তো মেহুল ভাই বলতেন। নীরব মোদিও ছিল আপনার পরিচিত, সেই লুঠেরাদের আপনি মনে করেন সম্পদ সৃষ্টি কর্তা, এর থেকে মিথ্যে আর কিছুই হতে পারে না। রবিঠাকুর পড়েন নি, পড়ার কথাও নয়। একতা কাজ করবেন, আপনার দলে এখন অন্তত একজন আছেন যিনি রবি ঠাকুরের কবিতাও পড়েছেন, সেই শমীক ভট্টাচার্যের কাছ থেকে বুঝে নেবেন।

কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে
সুদীর্ঘ অতীতে
জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে।
এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল,
এসেছে মোগল,
বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্য পথে চাই
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।
নির্মল সে নীলিমায় প্রভাতে ও সন্ধ্যায় রাঙালো,
যুগে যুগে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আলো।
আরবার সেই শূন্যতলে
আসিয়াছে দলে দলে
লৌহবাঁধা পথে
অনলনিঃশ্বাসী রথে
প্রবল ইংরেজ
বিকীর্ণ করেছে তার তেজ।
জানি তারো পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল
কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশবেড়া জাল।
জানি তার পণ্যবাহী সেনা
জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না।

মাটির পৃথিবী পানে আঁখি মেলি যবে
দেখি সেথা কলকলরবে
বিপুল জনতা চলে
নানা পথে নানা দলে দলে
যুগযুগান্তর হতে মানুষের নিত্য প্রয়োজনে
জীবনে মরণে।
ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল;
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে।
রাজছত্র ভেঙে পড়ে, রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে,
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে,
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্তআঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।
ওরা কাজ করে
দেশে দেশান্তরে,
অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের সমুদ্র নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই গুজরাটে।
গুরু গুরু গর্জন গুন গুন স্বর
দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি’ দিনযাত্রা করিছে মুখর।
দুঃখ সুখ দিবস রজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ ‘পরে
ওরা কাজ করে॥

হ্যাঁ যারা কাজ করে, ঘাম ঝরায় ফসল ফলায় তারাই লিখবে ইতিহাস আর সেই ইতিহাসে এক অপদার্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নাম থেকে যাবে নরেন্দ্র মোদির। আজ্ঞে হ্যাঁ মিঃ প্রাইম মিনিস্টার, ঐ আমবানি আদানি টাটা বিড়লার ইতিহাস মুছে যাবে, থেকে যাবে মানুষের কলতান আর শ্রমের ইতিহাস।

Latest News

জল জীবন মিশন কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

কলকাতা: জল জীবন মিশন (Jal Jeevan Mission) নিয়ে ফের কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।" কল থেকে...

More Articles Like This