খবরের কাগজ আর টিভির পর্দায় চোখ রেখে মানুষ মনে করছিল এক বিরাট ব্যাপার হতে যাচ্ছে, হাল্লা চলেছে, যুদ্ধে গোছের একটা ফিলিং হচ্ছিল, সাজোঁয়া গাড়ি, সেনা কর্তাদের বৈঠক, বিরোধী দলনেতার হুঙ্কার- সব মিলিয়ে বেশ একটা আসন্ন যুদ্ধের আবহ ছিল। কোথাও বাড়াবাড়ি হতে পারে ভাবলেই শিউরে উঠছিলাম, গত বারের শীতলকুচির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। রোজ রুটমার্চের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা ক্লিশে ছবি খবরের কাগজের পাতায়, সমাজমাধ্যমে আসন্ন কালবৈশাখীর ইঙ্গিত দিচ্ছিল বৈকি। আসলে গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে তো এই ছবি মেলে না, তাই মানুষ ভোট আসলেই শঙ্কিত হয়, আর রাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রস্তুতির ছবি সেই আশঙ্কাকে বাড়ায়। বাম জামানাতে এটা দু’টো আবহে হত, আমরা জানতাম যে কোনও নির্বাচনেই প্রাণ যাবে, গিয়েছেও, এমনকি শরিকী যুদ্ধও দেখেছি আমরা, মাস্কেট আর দেশি পিস্তল বোমায়, আর একই ছবি আমরা দেখতাম ধান কাটার মরশুমে, সেখানেও নিয়ম করে প্রাণ যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে জমির আসল মালিকেরা হাল ছেড়ে দিলেন দু’টো কারণে- (১) তাঁরা জমি ছেড়ে শহরে অন্য রোজগারের রাস্তা খুঁজে নিলেন, চাষীদের তেভাগা মেনে নিলেন, (২) চাষের থেকে আয় আর ব্যয়ের সামঞ্জস্য হারিয়ে গেল। মধু নেই অতএব দন্দ্ব নেই। কিন্তু নির্বাচনে মধু, দুধু সবই আছে। কাজেই দন্দ্ব লেগেই আছে, আর আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক দলের ছায়া প্রচ্ছায়াতেই জন্ম নেয়, বড় হয় এক অর্থনীতির চক্র, কাজেই এখানে দন্দ্ব মেটার নয়। আর সেই আসল কারণের দিকে না তাকিয়েই কেবল পুলিশ আর প্রশাসন দিয়ে সমস্যা মেটানোর এক বৃথা চেষ্টাতে লেগে থাকে রাষ্ট্র। এবারের ভোটে সেই সত্যিটাই সামনে এল। হিংসার খবর এল বেশিরভাগ আসন থেকেই, কিন্তু সেই হিংসা যা নাকি মিলিটারি বুটের সামনে থম মেরে যাবে সেরকমটা হল না। সেটাই বিষয় আজকে, নির্বাচন কমিশনের সাঁজোয়া গাড়ি কোথায় ছিল?
না, লাশ পড়েনি, কিন্তু লাশ না পড়ার ঘটনা এই প্রথম নয়, এমনটা বেশ কবার আমরা দেখেছি, লাশ না ফেলেও এক হিংসাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, শাসক দল একধরণের সুবিধে পায়, তার এক বাহিনী এক ধরণের সাংগঠনিক তৎপরতা দেখাতে থাকে, যা হিংসার নামান্তর। হ্যাঁ, শাসক দলের বুথের অদুরে বিশাল কড়াইয়ে ফুটতে থাকা মুরগি সেই হিংসারই নামান্তর। শাসকদলের রিজার্ভ ফোর্স সেখানেই থাকে, সারাটা দিন, সেটাই দস্তুর, আর মাঝে মধ্যে দু’চারটে বাইকে একটু গ্রাম ঘুরে আসা, ‘আমরা আছি হে’, জানান দিতে। বিরোধী দল বুথ করেছে, প্যান্ডেল আছে, চেয়ার আছে, কিন্তু লোক নেই। কেন? তাঁদের বলা হয়েছে এসব করে করবি কী, তা বল? ব্যস, তাঁরা সারমর্ম বুঝে যে যার বাড়িতে ফিরেছেন, সেই বার্তা রটে গিয়েছে ক্রমে, এবং এলাকাজুড়ে গুলি নেই, গোলা নেই, কিন্তু সন্ত্রাস আছে, হুমকি আছে, এটা বুঝতে রকেট সায়েন্সের ছাত্র হবার দরকার নেই। এবং এসবের পরেও তেমন বুঝলে ‘দে ধোলাই’ থেকে ‘গণ ধোলাই’- সব পথই খোলা থাকে, তেমনটা গতকালও আমরা সক্কাল থেকে দেখেছি। হ্যাঁ, লাশ পড়েনি, কিন্তু সকাল থেকে গতকাল আমরা যা দেখেছি, তা এক ধারাবাহিক হিংসার ছবি, এক পক্ষের নয়, যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানেই মাসল দেখিয়েছেন। অবশ্যই শাসক দলের অ্যাডভানটেজ ছিল, তাদের হাতে বিরোধীরাই মারটা বেশি খেয়েছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | বিজেপি কেন আজও পিছিয়ে?
আমরা দেখেছি রক্তাক্ত পোলিং এজেন্টের ছবি, আমরা দেখেছি, প্রার্থীর গণধোলাইয়ের ছবি, আমরা দেখেছি বিরোধী নেতা, প্রার্থী কর্মীদের ভাঙা গাড়ির ছবি। কিন্তু আমরা কি দেখেছি কোথাও সিআরপিএফ-এর বিশাল কোনও মুভমেন্ট? কোথাও বিশাল ধরপাকড়? বরং মুর্শিদাবাদ থেকে খবর এসেছে, ওই আধাসামরিক বাহিনীর কেউ কেউ তালের তাড়ি খেয়ে দিবানিদ্রায় ব্যস্ত ছিলেন। হ্যাঁ, অধ্যাপক শামিম আহমেদ সেকথা তাঁর সোশ্যাল মিডিয়াতেই লিখেছেন। একবারের জন্যও দেখিনি সাজোঁয়া গাড়িগুলোকে, অথচ সবচেয়ে উপদ্রুত বুথগুলোর ভোট নাকি গতকালই সম্পন্ন হয়েছে। তা হলে সেই সাজোঁয়া গাড়িগুলোকে দেখানো হয়েছিল কেন? ভয় দেখানোর জন্য? আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য? আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, মিডিয়াতে, খবরের কাগজে বিশাল আধা সামরিক বাহিনীর বিরাট ডিপ্লয়মেন্টের, তাদের কাজে লাগানোর খবর ছিল, সাজোঁয়া গাড়ির ছবি ছিল, ইলেকশন কমিশনারের লাগাতার হুমকি ছিল, এমনকি বিরোধী দলনেতার এতটুকু নড়চড় দেখলেই বেদম পেটানোর অ্যাডভাইস তো ছিল, তার পরেও ১৫২টা আসনের কম করে ১০০টা আসনেই বিজেপি নেতারা, কর্মী, এজেন্টরা মার খেলেন কী করে? কাদের গাফিলতিতে? তাহলে কি আধাসামরিক বাহিনী গা এলিয়ে বসে ছিল? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আসলে কারণ না বুঝেই ওষুধ দিলে তা কাজ করে না, করার কথাও নয়, রাজ্যজুড়ে সামান্য কাজের জন্য, আয়ের সামান্য ব্যবস্থার জন্য যতদিন মানুষকে সরকারে ক্ষমতায় থাকা দলের উপরে নির্ভরশীল হতে হবে, ততদিন নির্বাচনে হিংসা থামবে না। এটা বাম, তৃণমূল বা বিজেপির প্রশ্নই নয়, প্রশ্ন বাংলার রাজনৈতিক সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে, একটা বিশেষ দল ক্ষমতায় থাকলেই আপনার পেটের ভাত জুটবে, আর তা না থাকলেই তা জুটবে না, এই শর্ত থাকলে সেই মানুষটা মরিয়া হয়েই যে কোনও মূল্যে সেই দলকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করবে, তারই ফল এই নির্বাচনী হিংসা। নির্বাচন শেষ হলে আরও কিছুদিন পরে যা থামে আর পরের নির্বাচনের আগে যা শুরু হয়, সেই হিংসা থামাতে হলে রোগটা বুঝুন, তারপরে চিকিৎসা করার কথা ভাবা যাবে। নাহলে ওই সাজোঁয়া গাড়ির ছবি ছাপা হবে, রাস্তায় বের হবার আগেই তাকে খেয়ে ফেলবে অনেকে।
দেখুন আরও খবর:
