ওয়েব ডেস্ক : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যখন দিল্লিতে চাপানউতোর তুঙ্গে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। মঙ্গলবার ব্লুমবার্গ ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র, সংবাদমাধ্যমের বিস্তার এবং ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণকে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ নিয়েও সতর্ক করেন তিনি।
ভারতের গণতান্ত্রিক পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি (Narendra Modi) বলেন, “ভারত গণতন্ত্রের জননী।” তাঁর বক্তব্য, দেশে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ এবং নানা বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতে ১০০টিরও বেশি ভাষা, প্রায় ৮০ হাজার নথিভুক্ত সংবাদপত্র ও প্রকাশনা এবং ১,০০০-এর বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারকেও দেশের জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন মোদি (Narendra Modi)। তাঁর কথায়, “ভারতে ইউটিউবের ৫০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী রয়েছেন। ইনস্টাগ্রামেও ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি।” তিনি বলেন, “আমাদের দেশে মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা বিতর্ক করেন এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেন। বর্তমান সময়ে এই প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”
সরকার ও নাগরিকদের সম্পর্ক নিয়েও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রশাসনের ক্ষমতা নাগরিকদের নির্ভরশীল করে রাখার জন্য নয়, বরং তাঁদের আরও সক্ষম করে তোলার কাজে ব্যবহার করা উচিত। মোদি বলেন, “সরকারের হাতে কর্তৃত্ব রয়েছে। কিন্তু নাগরিকদের ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল করে রাখা তার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। বরং নাগরিকদের শক্তিশালী ও ক্ষমতায়িত করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভারত সেই পথেই এগোচ্ছে।”
আরও খবর : লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, চীনের আপত্তি উড়িয়ে কড়া বার্তা দিল্লির
ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জ্ঞান, সম্পদ ও কর্তৃত্বের দায়িত্বশীল প্রয়োগের উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য, “জ্ঞান, সম্পদ ও ক্ষমতা যাঁর হাতেই থাকুক, তিনি সেগুলি কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার প্রকৃত মূল্য তার উদ্দেশ্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে।” ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্যের উল্লেখ করে তিনি জানান, এই দর্শন দেশের শাসনব্যবস্থা ও কর্মসংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। এরপর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন মোদি। তাঁর দাবি, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত এবং ধারাবাহিক সংস্কার ভারতের বৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য দেশগুলির সঙ্গে যৌথ উন্নয়নের উপরও জোর দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা কারও ক্ষতি করে উন্নতি করি না। আমরা বিশ্বের সঙ্গে এবং বিশ্বের জন্য উন্নতি করি।”
অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে চলতি অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার এবং ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। করব্যবস্থা, দেউলিয়াত্ব সংক্রান্ত আইন এবং শ্রম আইনে সংস্কারকেও অর্থনীতির ভিত মজবুত করার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি বলেন, “অনিশ্চয়তায় ভরা এই বিশ্বে ভারত নির্ভরযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতার অনুপ্রেরণা জোগায়।” তাঁর দাবি, গত ১২ থেকে ১৩ বছরে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি ৪ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ০.৫ শতাংশে নেমেছে।
তবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, জ্বালানি, সরবরাহ-শৃঙ্খল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি ক্রমশ ভূ-রাজনৈতিক চাপ তৈরির উপকরণ হয়ে উঠছে। মোদি বলেন, “এগুলি সবই ক্রমশ চাপ সৃষ্টি এবং অন্যদের বাধ্য করার হাতিয়ার হয়ে উঠছে।”
