ভোটচুরির অভিযোগে আন্দোলন চলবে, রাহুলের বাসভবনে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত ইন্ডিয়া জোটের?

Must Read

ওয়েব ডেস্ক : ভোটচুরির অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ইন্ডিয়া জোট (India Bloc)। টানা চার দিন বিক্ষোভের পর মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, নয়াদিল্লিতে রাহুল গান্ধীর বাসভবনে চা-চক্রে মিলিত হন জোটের নেতারা। বৈঠকের আগে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টেও আবেদন জমা দিয়েছে বিরোধী জোট। বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সরব হন রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, সুপ্রিয়া সুলে, তেজস্বী যাদব, সঞ্জয় রাউথ-সহ একাধিক বিরোধী নেতা। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিও তোলেন তাঁরা।

রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) বলেন, “আমরা সবাই এখানে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। গতকালও বলেছিলাম, আলাদা আলাদা কোনও বিক্ষোভ নেই। এই বিক্ষোভ একটাই এবং এর একমাত্র লক্ষ্য ভারতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।”তিনি আরও বলেন, “এই দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। সংবিধানকে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ফিরিয়ে আনতে আমরা একসঙ্গে লড়াই করছি।” আন্দোলনে সমর্থন জানানো সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রাহুল বলেন, “গতকাল আপনারা দেখেছেন, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক দলের নয়, বরং ভারতের মানুষের মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দিল্লি ও দেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানাই। এই লড়াই আমাদের নিজেদের জন্য নয়, দেশের মানুষের জন্য। দেশের ভবিষ্যতের জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।”ভোটচুরির অভিযোগে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “যাঁরা এই কাজ করেছেন, সেই মিস্টার মোদি, মিস্টার শাহ, মিস্টার জ্ঞানেশ কুমার, বর্তমানে যিনি দেরাদুনে আত্মগোপন করে রয়েছেন বলে অভিযোগ, এবং অন্যদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।” আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাহুলের বার্তা, “আমাদের এই দল থামবে না। আগামীকাল হোক, পরশু হোক, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর কিংবা দু’বছর পর—এই লড়াই চলবে। শেষ লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।” তিনি আরও বলেছেন, মোদি-শাহ-জ্ঞানেশ কুমার। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিচার হবে। আপনাদের গ্যারান্টি দিচ্ছি। আমরা সবাই একসঙ্গে লড়াই করব। চাইব সুপ্রিম কোর্ট পদক্ষেপ করবে।

সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর কথায়, “সুপ্রিম কোর্ট, ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। এই বিষয়ে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে এবং আমরা আশা করি, তাঁরা সেই ভূমিকা পালন করবেন।” তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, “যে প্রতিষ্ঠানই ভূমিকা পালন করুক বা না করুক, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং মানুষের প্রতিরোধ চলবে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিরোধ সফল হবে।”

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে (Mallikarjun Kharge) ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভকে সফল বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, “মোদি সরকার এবং ভোটচুরির বিরুদ্ধে এই ঐক্যবদ্ধ লড়াই আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব।”

বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা (D Raja) বলেন, “ইন্ডিয়া জোটের প্রবীণ নেতাদের নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।” যন্তরমন্তরকে বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও তীব্র নিন্দা করেন তিনি। ডি রাজার কথায়, “সরকার এখন যন্তরমন্তরকে বিক্ষোভস্থলের স্বীকৃতি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করছি। যন্তরমন্তর এমন একটি জায়গা হিসেবেই থাকা উচিত, যেখানে মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পারেন।”

সিপিআইএম নেতা এম এ বেবি (M A Baby) নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আরও তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার শাসক দলের শিবিরে যোগ দিয়েছেন। তিনি ভোট চুরি করেন, বিক্ষোভের জায়গা চুরি করেন এবং গণতন্ত্রও চুরি করেন।”

আরও খবর :  পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা, সাংসদ এবং বিরোধী নেতাদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ রাহুলের

শিবসেনা উদ্ধব গোষ্ঠীর নেতা সঞ্জয় রাউত (Sanjay Raut) মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিশানা করে বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার একজন মাফিয়া, যিনি গোটা ব্যবস্থাকে অপরাধপ্রবণ করে তুলেছেন। এই ধরনের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করতে হয়, তা আমরা জানি।” বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “রাহুলজি বৈঠক ডেকেছিলেন এবং সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নেতারা ও সাংসদরা চা-চক্রে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক খুব ভাল হয়েছে। আগামী দিনের কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রত্যেকের মতামত ও প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার, মোদিজি ও শাহজির বিরুদ্ধে এই লড়াই চলবে—দিল্লিতে এবং দেশের অন্যান্য জায়গাতেও।”

তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষ (Sagarika Ghose) নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে, জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ভারতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে দুর্বল করছে। এই কমিশন যত দিন কাজ করবে, তত দিন দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।” তিনি আরও বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো এবং তাঁর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সেই সমস্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না, যাঁরা হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, বাংলা ও বিহারের নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন। আমাদের অভিযোগ, এই নির্বাচনগুলিতে ভোটচুরি হয়েছে।” বাংলার সরকার নিয়েও অভিযোগ তোলেন সাগরিকা। তাঁর কথায়, “বাংলায় বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা সরকার অবৈধ। ভোটচুরির মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় এসেছে।” এরপর নিজেদের দাবির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে এবং পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনতে হবে। জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু করতে হবে। ভোটচুরির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।”

এনসিপি শরদচন্দ্র পওয়ার গোষ্ঠীর নেত্রী সুপ্রিয়া সুলেও (Supriya Sule) সংবিধান ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, “ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসেবে আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। আমাদের লড়াই চলবে, কারণ সংবিধানকে দুর্বল করা হয়েছে এবং বর্তমানে দেশের সংবিধান বিপদের মুখে।” তিনি আরও বলেন, “ভারতরত্ন ডক্টর বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে যে অধিকার দিয়েছে, তা রক্ষার জন্য আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। একটি সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী একজন ব্যক্তি এই অধিকারগুলিকে পদদলিত করার চেষ্টা করে গুরুতর ভুল করছেন। এই অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ব। দিল্লি থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”

আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের (Tejashwi Yadav) দাবি, সরকারের বিরুদ্ধে ভোটচুরির অভিযোগ মানুষের সামনে এসেছে। তিনি বলেন, “সরকারের ভোটচুরি মানুষের সামনে প্রকাশ্যে এসেছে। আমরা সবাই একসঙ্গে রয়েছি এবং জয়ী হব।” যন্তরমন্তর থেকে বিক্ষোভের স্থান সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তেজস্বীর বক্তব্য, “বিক্ষোভস্থল হিসেবে যন্তরমন্তরের স্বীকৃতি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তেই সরকারের ভয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।”

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরাও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি বলেন, “এই দেশের মানুষ, ভারতীয় গণতন্ত্র এবং সংবিধানের একমাত্র শত্রু বিজেপি। ভোটারদের অধিকারের উপর আঘাত মানে ভারতের উপর আঘাত, গণতন্ত্রের উপর আঘাত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে যেতেই হবে। এসআইআর প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে।”

Latest News

‘ভারত গণতন্ত্রের জননী’, আন্দোলনের আবহেই রাজধানীতে দাঁড়িয়েই বার্তা মোদির

ওয়েব ডেস্ক : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যখন দিল্লিতে চাপানউতোর তুঙ্গে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক...

More Articles Like This