হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, হিন্দিতে যাকে বলে ‘কাঁটে কা টক্কর’, নির্বাচনে কান ঘেঁষে জিতে বা হেরে যাওয়ার ছবি আসে প্রতিটা নির্বাচনের পরে। হ্যাঁ, গুলিটা কান ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছে, লাগলে কবরের তলায় কিংবা ছাই হয়ে যাওয়া, এমনটা রাজনীতিতে, নির্বাচনে হয়, প্রতিটা নির্বাচনেই হয়। ধরুন ২০২৪ লোকসভা, ২৪০টা পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু কিছু আসনে বিরোধীরা হেরেছিল, প্রায় ১৯টা আসন, ওই এক্কেবারে কান ঘেঁষে, যার অর্ধেক বিরোধীরা জিতলে নরেন্দ্র মোদিকে পার্লিয়ামেন্টে উল্টোদিকে বসতে হত। আবার বিরোধীরা ২৩টা আসনে ওই একই রকম সামান্য ভোটে জিতেছিল, যার বেশ কিছু পেয়ে গেলে মোদিজি আরেকটু স্বস্তিতে থাকতেন। তো । হ্যাঁ, তৃণমূল বা বিজেপির, দু’দলেরই এরকম আসন আছে, ৩৬টা আসন আছে তৃণমূলের যা নাকি ০.০২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের কম ব্যবধানে তৃণমূল প্রার্থীরা জিতেছিলেন, আর ৩৪টা এরকম আসন আছে, যা নাকি বিজেপি জিতেছিল, এক্কেবারে কান ঘেঁষে, মানে ওই ৫ শতাংশ ভোটের ফারাকে। এই আসনগুলোর এবারের লড়াইটা দেখুন, ফারাকটা দেখুন। হ্যাঁ, এর মধ্যেই আছে নন্দীগ্রামের মাত্র ১৮৫৭ ভোটে জেতা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর আসন। কিন্তু সে নিয়ে আলোচনা আরেক দিন। সেদিন নন্দীগ্রাম আর ভবানীপুর নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে বলি বিজেপি যে আসনগুলোতে কান ঘেঁষে জিতেছিল, তৃণমূল হেরেছিল।
এর মধ্যে প্রথম নামটাই চমকে দেবে সব্বাইকে, আসনটা হল দিনহাটা। হ্যাঁ, এই আসনে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক, তৃণমূলের প্রার্থী উদয়ন গুহকে হারিয়েছিলেন মাত্র ৫৭ ভোটে। বেশ কয়েকবার পূনর্গণনার পরে জানিয়ে দেওয়া হয় নিশীথ প্রামাণিক জিতেছেন, এই নিশীথ প্রামাণিক আগে তৃণমূলে ছিলেন, আর উদয়ন গুহ ফরোয়ার্ড ব্লকে, তাঁর বাবা ফরোয়ার্ড ব্লকের বড়া নেতা, মন্ত্রীও ছিলেন, কমল গুহ। এবং এর চেয়েও মজার কথা হল, নিশীথ প্রামাণিক সাংসদ ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন, কাজেই তিনি ফিরে গেলেন দিল্লিতে, উপনির্বাচন হল, এবারেও চমকে দেবার মত ফলাফল, এবারে তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ভোটে জিতলেন। হ্যাঁ, এরেই কয় উপনির্বাচন, হারলেন অশোক মন্ডল বিজেপির, ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ১১ শতাংশ। এবারেও এখানে তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ, বিজেপি প্রার্থী অজয় রায়, হ্যাঁ, ফরোয়ার্ড ব্লকের বিকাশ মন্ডলও আছেন। এখনও যা অবস্থা তাতে তৃণমূল জিতবে এখানে, কিন্তু ফারাক? বড়জোর হাজার পনেরো কী কুড়ি। না, তার বেশি মার্জিন থাকবে না।
পরের আসন পুরুলিয়ার বলরামপুর, বিজেপির বাণেশ্বর মাহাতো জিতেছিলেন ৪২৩ ভোটে, ০.২১ শতাংশ, মানে ১ শতাংশেরও কম ভোটে হেরেছিলেন তৃণমূলের শান্তিরাম মাহাতো। এবারে? তৃণমূলের সেই শান্তিরাম মাহাতোই দাঁড়িয়েছেন, বিজেপির প্রার্থী বদলেছে, এবারে জলধর মাহাতো। এবারে বিজেপি ঝাড়খন্ডের সুদেশ মাহাতোর আজসুর সঙ্গে জোট বেঁধেছে, তার কিছু প্রভাব পড়বে, আবার কুরমি ভোটের ভাগাভাগি বিজেপিকে কতটা বিপদে ফেলবে, তা বোঝা বেশ মুশকিল, কিন্তু প্রচারে তৃণমূল বেশ এগিয়ে আর গতবারের চেয়ে এবারে এলাকাতে তৃণমূলের সাড়া বেশি, হ্যাঁ, এবারে ওই ৪২৩ ভোটের হারের জবাব দেবেন শান্তিরাম মাহাতো।
পরের আসন কুলটি, বিজেপির অজয় কুমার পোদ্দার জিতেছিলেন মাত্র ৬৭৯ ভোটে, হেরেছিলেন উজ্জ্বল চ্যাটার্জি। সেবারে এই আসনে কংগ্রেস পেয়েছিল হাজার পাঁচেক ভোট। এবারে কিন্তু তৃণমূল প্রার্থী বদলেছে, এবারের প্রার্থী তৃণমূলের নেতা মন্ত্রী মলয় ঘটকের ভাই অভিজিৎ ঘটক, বিজেপির প্রার্থী একই আছে, কুলটিতে এবারে ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী দিয়েছে, কংগ্রেসও প্রার্থী দেবে। এই আসনে কিন্তু এবারেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, যদিও প্রার্থী বদলে অভিজিৎ ঘটককে আনার ফলে ওই বিধানসভা অঞ্চলের মধ্যে তৃণমূল দলের সংগঠনের ভেতরে ক্ষোভ আছে। এই আসন এবারেও ফটো ফিনিশের জন্য রেডি, এনিবডিজ গেম।
পরের আসন ঘাটাল, শীতল কাপাট বিজেপির, জিতেছিলেন মাত্র ৯৬৬ ভোটে, হেরেছিলেন শংকর দলুই, শংকর দলুইকে নিয়ে তৃণমূলের মাথাব্যাথা অনেকদিনের, অভিনেতা দেবের সঙ্গে ঝামেলা, দলের মধ্যে কোন্দল, ইত্যাদির পরে শংকর দলুইকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এবারের প্রার্থী শ্যামলী সর্দার, এই আসনে কিন্তু তৃণমূলের না জেতার কোনও কারণই নেই। কিন্তু কেবল দলের মধ্যের কোন্দলেই এই আসন গতবারে হেরেছিল তৃণমূল, এবারে কিন্তু ঘাটাল তৃণমূল জিতে গেলে আমি অবাক হব না।
এর পরের আসন ময়না, পূর্ব মেদিনীপুরের এই আসনে অশোক দিন্দা জিতেছিলেন মাত্র ০.৪৩ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে ১২৬০ ভোটে হেরেছিলেন সংগ্রাম দলুই। এবারে তৃণমূল প্রার্থী বদলেছে, এবারের প্রার্থী চন্দন মন্ডল, বিজেপির থেকে আবার অশোক দিন্দা সিপিআই-এর স্বপন বর্মন, কংগ্রেসও এখানে প্রার্থী দেবে। এই আসনে কিন্তু এখনও বিজেপিই এগিয়ে আছে, এর মধ্যে খুব বিরাট কিছু না হলে এই আসনে বিজেপিই জিতবে, মার্জিনও বেড়ে যেতেই পারে।
পরে আসন বাঁকুড়া, নীলাদ্রি শেখর দানা জিতেছেন ১৪৬৮ ভোটের ব্যবধানে, হারিয়েছিলেন অভিনেত্রী স্বায়ন্তিকা ব্যানার্জীকে, ০.৬৭ শতাংশ ভোটের ফারাকে। গতবারের হেরে যাওয়া তৃণমূল প্রার্থী এবারে বরানগরে লড়ছেন, বাই ইলেকশনেও জিতেছিলেন, আর তার জায়গাতে স্থানীয় ক্যান্ডিডেট দিয়েছে তৃণমূল, তৃণমূলের প্রার্থী ডঃ অনুপ মন্ডল। এবারে কিন্তু এই আসনে লড়াই জমজমাট, চোখের ডাক্তার হিসেবে সুপরিচিত এই ডাক্তারবাবু কিন্তু বাঁকুড়ার হাওয়া ঘুরিয়ে দেবেন বলেই মনে হচ্ছে। ১৪৬৮ ভোটে জেতা নীলাদ্রি শেখর দানা এবারে স্বস্তিতে নেই।
এর পরের আসন গাজোল, বিজেপির চিন্ময় দেব বর্মন এই আসনে ০.৮১ শতাংশ ভোটের ফারাকে, ১৭৯৮ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের বাসন্তী বর্মনকে। গাজোলে আবারের তৃণমূলের প্রার্থী প্রসেনজিৎ দাস। মালদহতে এবারে ১২টা আসনের ৭টাতেই নতুন মুখ এনেছে তৃণমূল, গাজোলেও প্রার্থী বদলেছে। এটা হল সেই টিম অভিষেকের ঝকঝকে মুখ, নেমেও পড়েছেন, এই মুহূর্তে দলের ভেতরের কোন্দল সেই জায়গাতে নেই। সব মিলিয়ে গাজোল সেই আসন যেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, বিজেপির জেতা প্রার্থী আছেন মাঠে, কিন্তু এখানে শেষ মূহুর্তে কংগ্রেসের প্রার্থী সবকিছু বদলে দিতে পারে, সেটাই এবারে একটা বড় ফ্যাক্টর। হ্যাঁ, এই আসনে কংগ্রেসের ভোট ঠিক করে দেবে কে জিতবে গাজোল।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | ব্যর্থ বৈঠক, যুদ্ধ থামাতে এবার পুতিন
এবারে আসুন তৃণমূলের কিছু কান ঘেঁসে জেতা আসনের আলোচনা করা যাক। প্রথমেই আছে দাঁতন। গতবারে এই আসনে জিতেছিলেন বিক্রম চন্দ্র প্রধান ০.৩১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে, ৬২৩ ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির শক্তিপদ নায়েককে। এবারে এই আসনে সব দল তাদের প্রার্থী বদলেছে। তৃণমূলের এবারের প্রার্থী মানিক মাইতি, বিজেপির প্রার্থী বদলেছে এবারে অজিত কুমার জানা, সিপিআই’ও বদলেছে এবারের প্রার্থী শ্যামলকান্তি দাস পট্টনায়েক। এই আসন কিন্তু তৃণমূলেরই আসন ছিল, শুভেন্দু এফেক্ট এই গতবারে বিজেপি উঠে এসেছে, এবারে লড়াই এক্কেবারে হাড্ডাহাড্ডি। দাঁতনে এবারেও ফটো ফিনিশ।
পরের আসন তমলুক, এখানে সৌমেন মহাপাত্র জিতেছিলেন মাত্র ৭৯৩ ভোটে, ০.৩৪ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে, এবারের তৃণমূল প্রার্থী দীপেন্দ্র নারায়ণ রায়, তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি পরিবারের একজন, অন্যদিকে বিজেপির প্রার্থী একই আছে, ডঃ হরেকৃষ্ণ বেরা, এমনিতে লোকসভাতে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ার পরে প্রার্থী পরিবর্তন করে খেলাতে ফিরতে চাইছে তৃণমূল, কিন্তু ভেতরে দলের কোন্দল চলছে তো চলছেই, এবারে সেই কোন্দলই হবে এক্স ফ্যাক্টর, যার জন্য এই আসন তৃণমূল হারাতে পারে।
পরের আসন জলপাইগুড়ি, তৃণমূল প্রার্থী ডঃ প্রদীপ কুমার বর্মন জিতেছিলেন মাত্র ৯৪১ ভোটের ব্যবধানে, মানে ০.৪২ শতাংশ ভোটের ফারাকে। হেরেছিলেন পিকু, হ্যাঁ, সৌজিত সিংহ বিজেপি প্রার্থীর ডাক নাম। এবারে তৃণমূলের প্রার্থী কৃষ্ণ দাস, বিজেপির প্রার্থী অনন্ত দেব অধিকারী, মানে দুই দলই তাদের প্রার্থী বদলে ফেলেছে, কিন্তু এখানে তিন নম্বর প্রার্থীর জন্য সব্বাইকে অপেক্ষা করে থাকতে হবে, কংগ্রেসের প্রার্থী সুদীপ্ত মহন্ত, তিনি কত ভোট পাবেন, কতটা ভালো করবেন, তার উপরে নির্ভর করছে এই আসনের ফলাফল। গতবারে এই আসনে কংগ্রেসের সুখবিলাশ বর্মা পেয়েছিলেন ১১ শতাংশ ভোট, কাজেই সেই আসনে কংগ্রেসের ভোট ঠিক করে দেবে হার জিত। কিন্তু যদি এই আসনে কংগ্রেস প্রার্থী না দেয়, যদি কংগ্রেস আর তৃণমূল জোট হত? তাহলে বিজেপি প্রার্থী গোহারান হারত, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
এর পরের আসন মহিষাদল, এখানে তৃণমূলের তিলক চৌধুরী ২৩৮৬ ভোটে, ১.০৯ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিজেপির বিশ্বনাথ ব্যানার্জিকে, এবারে বিজেপি প্রার্থী বদলেছে, এবারে তাদের প্রার্থী সুভাষ পাঞ্চাল, এই আসনে কিন্তু এবারে তৃণমূল তাদের মার্জিন বাড়িয়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, এলাকার মানুষের মেজাজ সেটাই, কিন্তু গত লোকসভার আসনে বিজেপি যে ভোট বাড়াতে পেরেছিল তা কি ফ্যাক্টর হবে? অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নিষ্ক্রিয়তা বা মাঝে মধ্যেই তাল সুর কেটে অন্য কথা বলা কিন্তু আগের মেজাজকে ধরে রাখতে দেয়নি, আর তার সঙ্গে জুড়েছে ওখানকার বিজেপির মধ্যে প্রার্থী নিয়ে ঝামেলা। গত লোকসভার মার্জিনকে পার করে কতটা এগোবে তৃণমূল, সেটাই দেখার।
পরের আসন নারায়নগড়, সূর্যকান্ত অট্ট তৃণমূলের জিতেছিলেন ১.১১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে ২৪১৬ ভোটের ফারাকে, হেরেছিল রামপ্রসাদ গিরি, এবারের অবস্থা কেমন? এবারে তৃণমূল প্রার্থী বদলেছে, এবারের প্রার্থী প্রতিভা রানি মাইতি, বিজেপির প্রার্থী একই আছে রামপ্রসাদ গিরি, সিপিএম-এর প্রার্থী’ও একই, তাপস সিনহা, গতবারে ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, লোকসভাতে বিজেপি এই বিধানসভাতে তৃণমূলের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছিল। এবারের প্রশ্ন দু’টো- তৃণমূলের ক্যান্ডিডেট প্রতিভারানী মাইতি জেলা পরিষদের সভাধিপতি, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, তিনি কি আগেরবারের ভোটটা অন্তত ধরে রাখতে পারবেন? দু’নম্বর প্রশ্ন হল তাপস সিনহা কি আগের থেকে ভোট বাড়াতে পারবেন? দু’টোর উত্তরই ‘হ্যাঁ’। তৃণমূল অন্তত আগের বিধানসভার ভোট ধরে রাখতে পারবে, আর তাপস সিনহা অন্তত ১০ থেকে ১১ শতাংশ ভোট পাবেন। দুইয়ের যোগফল এই আসনে তৃণমূলকে গিয়ে রাখবে, কেবল ওই তৃণমূলের গতবারের বিধায়ক অট্টবাবু অট্টহাসি না হাসলেই এটা সম্ভব।
নির্বাচন এগিয়ে আসছে, আপনারাও আপনাদের কন্সটিচুয়েন্সিতে কারা এগিয়ে, কারা পিছিয়ে সেটা কমেন্ট করে জানান, আপনাদের মতামতের ভিত্তিতে আমাদের আসন নির্ভর সমীক্ষা আরও ঠিকঠাক হবে।
দেখুন আরও খবর:
