গণতন্ত্রের প্রথম আর শেষ কথা হল মানুষ, মানুষের সমর্থন। ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলবো কী স্বত্বে?’ আমাদের মধ্যে থেকেই কেউ আমাদের প্রতিনিধি হবে তিনি আমাদের লোক এই স্বত্বেই তো গণতন্ত্র বাঁচে। তো যবে থেকে এই প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার চালু হয়েছে তবে থেকেই আমরা জানি যে, নির্বাচনে দাঁড়াবেন এক দুই তিন চার বা অনেক পক্ষ, তাঁরা আসবেন, তাঁদের কথা বলবেন, মানুষ তাঁদের আগের কাজ বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তাঁদের ভোট দেবেন, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন তিনিই হবেন প্রতিনিধি। কার? যাঁরা ওনাকে ভোট দিয়েছে কেবল তাদের? না, প্রত্যেকের। আর এইখানেই একটা জিনিস গণতন্ত্রের কাঠামোর সঙ্গে জুড়ে যায় তা হল ট্রাস্ট ফ্যাক্টর, আস্থা, ভরসা বা বিশ্বাসের বিষয়টা আসে। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা তো খুনি গ্রেফতার করে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ব্যবস্থা করছে না। সেখানে অভিযুক্তকে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই, সেখানে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে। কিন্তু যদি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সংস্থা আপনাকে সারাক্ষণ সন্দেহের নজরেই রাখতে থাকে? তা হলে? তাহলে ওই ট্রাস্ট ডেফিসিট শুরু হয়, মানে মানুষের শাসনের ওপরে, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের উপরে ভরসা কমতে থাকে। আজ আমরা, ভারতের নাগরিকেরা সেরকম একটা জায়গাতে এসে দাঁড়িয়েছি। কেবলমাত্র একটা দলকে জেতানোর জন্য পুরো ব্যবস্থা নেমে পড়েছে নির্লজ্জভাবে। আর সেটাই আজ বাংলার নির্বাচনকে মোদি–শাহের সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থার এক অংশ, প্রশাসন বনাম বাংলার মানুষ করে তুলেছে। ঠিক সেই কারণেই বিজেপি হারবে, আবার হারবে।
তাকিয়ে দেখুন চলছেটা কী? সমস্ত বিধানসভা এলাকা থেকে নাম চেয়ে পাঠানো হয়েছে, হ্যাঁ, নাম পাঠাচ্ছেন স্থানীয় বিজেপি নেতারা, কাদের নাম? সেই এলাকাতে যে সব ডাকাবুকো তৃণমূল নেতারা আছে, যারা জানিয়েই দিয়েছে জান কবুল। হ্যাঁ, তাঁদের তালিকা তৈরি করে তাঁদেরকে গ্রেফতারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে কিছু দাগী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হতো, সেটা নতুন কিছু নয়, এখানে অনেকে এমন আছেন যাঁদের বিরুদ্ধে একটা মামলা আছে বা আগে কোনও মামলাই নেই। মানে বিরোধী প্রার্থীর হয়ে রাস্তায় থাকতে পারে, এই জন্যই তাকে হাজতে ভরা হবে? এটা গণতন্ত্র? প্রধানমন্ত্রীর সাজানো-গোছানো ঝালমুড়ি নাটক হবে, তার জন্য বিরোধী দলের নির্বাচন প্রচার থেমে থাকবে? দেশের সমস্ত মিডিয়াকে ব্যবহার করে নির্বাচন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের বিরুদ্ধে খুল্লম-খুল্লা প্রচার করবেন? ভোটার তালিকার সংশোধনের নাম করে ৩৫-৩৭ লক্ষ ভোটারকে তালিকার বাইরে এই জন্য রাখা হবে যে, তাঁরা সম্ভবত ঘুসপেটিয়া রোহিঙ্গা? রাজ্য প্রশাসনের মাথাতে বসে থাকা সমস্ত আমলাদের নির্বিচারে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এই সন্দেহে যে তাঁরা থাকলে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা দলকে সাহায্য করবেন? পুলিশকে বলে দেওয়া হয়েছে আপনাদের আধা সামরিক বাহিনীর কথা শুনে চলতে হবে, কারণ তাঁরাও নাকি সরকারে যারা ক্ষমতায় আছেন তাঁদের জন্যই কাজ করতে পারেন। অসংখ্য সিভিল পুলিশ আছে যাঁরা এর আগেও বুথের সামনে ভিড় সামলানোর কাজ করেন, তাঁরা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সাহায্য করেন, তাঁরা সব্বাই তৃণমূলের লোকজন? তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বুথের ত্রি সীমানাতেও তাঁরা আসতে পারবেন না। ভোটের কাজ যাঁরা করছেন তাঁদের বলা হয়েছে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জলও নেওয়া যাবে না, বলা হয়েছে তারা যেন তাঁদের সমাজমাধ্যমে কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা তো দুরস্থান, লাইক পর্যন্ত করতে পারবেন না। কেন? তাঁরা সব্বাই তৃণমূলের? তার মানে কি এই লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারীদের সমাজমাধ্যমে নজরদারী চালানো হচ্ছে?
আরও পড়ুন: Aajke | একচোখো ইলেকশন কমিশনের ভরসা এখন সাজোঁয়া গাড়ি
মানে একটা দল সরকারে আছে, যে বিচারপতি থেকে দলের নেতাদের ফোনে আড়ি পাতে, তার জন্য পেগাসাস সফটওয়ার এনেছে, তাঁরা দেশের প্রত্যেকটা মানুষকে প্রমাণ করতে বলছে যে তারা নাগরিক কি না? তাঁরা দেশের অন্যতম মেধাভিত্তিক পরীক্ষাতে পাস করা আইএএস, আইপিএস-দের নিরপেক্ষ মনে করে না, তাঁরা কন্ট্রাক্ট সার্ভিসে সামান্য পয়সাতে কাজ করা সিভিল পুলিশকেও বিশ্বাস করে না। এই ট্রাস্ট ডেফিসিট দিয়ে, এই অবিশ্বাস নিয়ে একটা সরকার চলতে পারে? এক গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে থাকতে পারে? পারে না। মানুষ মেনে নেয় না। ঠিক সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা এই বিজেপির, তাঁরা বাংলার একজন মানুষকেও বিশ্বাস করে না, আর তাই তাঁদের সঙ্গে মানুষের এই অবিশ্বাসের সম্পর্কই বারবার বিজেপিকে পিছিয়ে দেয়, দেবেও। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই যে এক অসম্ভব বাড়াবাড়ি চলছে নির্বাচনকে ঘিরে, রোজ নতুন নতুন ফতোয়া দিচ্ছেন নির্বাচন কমিশন, আর বিজেপি তাঁদের উপরে ভর দিয়েই জিতে নিতে চাইছে বাংলা, আসলে সেই কারণেই কি তাঁরা বাংলার মানুষের আস্থা ভরসা পাচ্ছে না, মানুষ তাঁদের বিশ্বাসই করছে না? আর তাই কি তাঁরা আবার পিছিয়ে পড়বে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
বাংলার সাধারণ মানুষের কথা ছেড়েই দিন, বাদই দিলাম বাংলায় এতদিন ধরে কাজ করা আমলা পুলিশ প্রশাসনকে, বাংলাতে তাঁদের দলের লোকজনদেরও কি বিশ্বাস করে বিজেপির দিল্লির নেতারা। না করে না। প্রতিদিন দিল্লি থেকে একটা বিরাট টিম যারা এই রাজ্যে নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে সন্ধ্যেয়, তাঁদের সঙ্গে আলাদা মিটিং হয়, হ্যাঁ, সেই টিম অমিত শাহের, একজন অও নেই বাংলা থেকে, তাঁরাই নাকি আসলি খবর দেন। আসলে বাংলার মাটিকে এনারা চেনেননি, এখানে মাটির সঙ্গে জুড়ে না থাকলে মাটির চরিত্র বোঝা যায় না, আর সেই কারণেই বিজেপি পিছিয়ে থাকে, এবারেও পিছিয়ে থাকবে।
দেখুন আরও খবর:
