ঘাটাল- নারী শিক্ষাপ্রসারে (Women Education) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Ishwar Chandra Vidyasagar) । তিনি ছিলেন নারীশিক্ষা বিস্তারের পথিকৃৎ। নারী জাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়, এমনই উপলব্ধি ছিল বিদ্যাসাগরের। নিজের গ্রাম ঘাটালের (Ghatal) বীরসিংহ থেকে নারীশিক্ষা প্রসারে যে লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁরই জন্মভিটাতে ১৯৭১ সালে গড়ে উঠা তাঁরই নামাঙ্কিত বীরসিংহ বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যাপিঠ (মাধ্যমিক) স্কুলে শিক্ষিকার অভাব। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পঠনপাঠন, স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে ছাত্রীরা।
এককথায় শিক্ষিকা, শিক্ষা কর্মী ও পরিকাঠামোগত অনুন্নয়নে ধুঁকছে বীরসিংহ বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যাপীঠ। ২৩-এপ্রিল প্রথম দফায় নির্বাচনে এই স্কুলেই ধূমধাম করে গণতন্ত্রের ভোট উৎসব উদযাপন হয়েছে। ২৩১ ঘাটাল বিধানসভা কেন্দ্র ১৯৫ নম্বর বুথ পোলিং স্টেশন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে এই স্কুল। অথচ স্কুলের পঠনপাঠন ও পরিকাঠামো উন্নয়নে কারও নজর নেই বলেই অভিযোগ।
বর্তমানে স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ৩৪৯ জন, টিআইসি সমেত মোট চারজন শিক্ষিকা রয়েছেন। রয়েছেন একজন গ্রুপ-সি ক্লার্ক। ইতিহাস, সংস্কৃত, ভূগোল ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষিকা থাকলেও অঙ্ক, বাংলা, বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলির জন্য নেই কোনও শিক্ষিকা। দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার পদ খালি, দায়িত্ব ভার সামলাচ্ছে টিআইসি। দু’জন গ্রুপ-ডি কর্মীর পদ শূন্য।
স্কুল সূত্রে খবর, স্কুলে ১১ জন শিক্ষিকা ও একজন প্রধান শিক্ষকা নিয়ে মোট ১২ জন শিক্ষিকার পোস্ট রয়েছে। অথচ সেখানে এখন স্কুল চালাচ্ছে চারজন শিক্ষিকা। যার ফলে লাটে উঠেছে ছাত্রীদের পঠনপাঠন।
স্কুলের টিআইসি শ্রাবণী দাস। তিনি অফিসিয়াল কাজকর্ম, মিডডে মিলের হিসাব নিকেশ সামলে ছাত্রীদের ক্লাসও নেন।পাশাপাশি স্কুলের টিফিন হোক বা ছুটির ঘন্টা তাঁকেই বাজাতে হয়।
টিআইসি শ্রাবণী দাস আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিজের বাস্তু ভিটের উপর প্রতিষ্ঠিত এই বালিকা বিদ্যালয়।স্কুলের পাশেই রয়েছে বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল হল ও ওনার আদি বাড়ির উপর তৈরি বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির। তাঁরই জন্মস্থানে গড়ে ওঠা এই বালিকা বিদ্যালয় শিক্ষিকার অভাবে বন্ধ হতে বসেছে।
আরও পড়ুন- ২০২১-এর থেকেই বেশি আসন পাবে তৃণমূল! ভার্চয়াল বৈঠকে বিরাট মন্তব্য অভিষেকের
এটা আমাদের কাছে সত্যিই লজ্জাজনক। এনিয়ে আমরা মহকুমা থেকে জেলা সব জায়গায় জানিয়েছি। দু’জন শিক্ষিকা অন্য স্কুল থেকে এনে এখানে দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে কিন্তু এখনও তারা আসেনি। ক্লাস যদি ঠিকঠাক না হয় অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের আর এই স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। অন্য স্কুলে তারা ভর্তি হচ্ছে।আমরা চাই দ্রুত স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষিকা দেওয়া হোক। আমার পক্ষে স্কুল চালাতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। ‘স্কুলের পঠনপাঠন সচল রাখতে একপ্রকার বিনা পারিশ্রমিকেই দু’জন অতিথি শিক্ষিকা রাখা হয়েছে স্কুলে। দু’জনের মধ্যে একজন আবার এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্রী।তাঁরা পালা করে স্কুলে শিক্ষিকার ঘাটতি পূরণ করছেন।
স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী বর্তমানে স্কুলের অতিথি শিক্ষিকা সংহিতা রায় বলেন, ‘স্কুলের ছাত্রীদের কথা ভেবে, ভালোবেসে বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলে দেড় বছর ধরে ক্লাস নিচ্ছি। একসময় আমি এই স্কুলেরই ছাত্রী ছিলাম। আমাকে স্কুলের পরিস্থিতি সম্পর্কে যখন বলা হয় আমি রাজি হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলতে পারে।স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে ছাত্রীদের ভুগতে হবে। এটা মোটেও কাম্য নই। অন্যদিকে ‘২০২৭ সালে স্কুলের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষিকা নবনীতা ঘোষ অবসর নেবেন বলে জানান স্কুলের টিআইসি শ্রাবণী দাস।ফলে নতুন নিয়োগ না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে বলে তিনি জানান।
স্কুল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে রাজ্য সরকারের উৎসশ্রী নামের পোর্টাল চালু হয় যার মাধ্যমে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি স্কুলে বদলির আবেদন করতে পারেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২২ সালে একসঙ্গে ছয় জন শিক্ষিকা স্কুল ছেড়ে নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি স্কুলে বদলি নিয়ে চলে যান। ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর যে চাকরি বাতিল হয়েছে তারমধ্য বীরসিংহের এই বালিকা বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা ও একজন গ্রুপ-ডি কর্মীও ছিলেন। একসময় এই স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষিকার সাথে শিক্ষাকর্মীও ছিল। পাঁচ থেকে ছয়শ ছাত্রীও ছিল স্কুলে। নানান কারণে ধাপে ধাপে স্কুলের শিক্ষিকা সংখ্যা কমতে থাকে। সঠিক ভাবে পঠনপাঠন না হওয়ায় অভিভাবকরাও তাদের মেয়েদের অন্য স্কুলে ভর্তি করান। দ্রুত শিক্ষিকা নিয়োগ না হলে স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা আরও কমবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে অভিভাবকরা।
