‘মেরে পাস বংগলা হ্যায়, গাড়ি হ্যায়, পয়সা হ্যায়, তেরে পাস ক্যায়া হ্যায়?’, সোজা, সপাট উত্তর- ‘মেরে পাস মা হ্যায়’। এবার অমিতাভ বচ্চনের বদলে বিজেপিকে দাঁড় করিয়ে দিন, শশী কাপুরের জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেসকে, হুবহু মিলে যাবে। বিজেপির সমস্যাটা ওখানেই। প্রচুর পয়সা, প্রচুর বললে ঠিক বোঝানো যাবে না। ভোট ঘোষণা হওয়ার দু’মাস আগেই আগে রাজ্যে চলে এসেছে বাইক, গাড়ি, প্রচার গাড়ি তাতে টিভি সেট লাগানো, তারা পথে পথে ঘুরবে এবং প্রচার হবে। কোত্থেকে এল সেই গাড়ি? মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ বিহার এমনকি ঝাড়খন্ড থেকে। মুরলীধর লেন বা সদ্য নেওয়া হেস্টিংসের অফিস থেকে নয়, রাজারহাটের এক ঝাঁ চকচকে হোটেলে ২০-২৫টা ঘর আগেরবারের মতোই নেওয়া হয়ে গিয়েছে, সেখানেই তৈরি হয়ে গিয়েছে ওয়ার রুম, প্রতিদিন এ বাংলায় কোনও না কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা ঘুরছেন, ভাষণ দিচ্ছেন, সামনের সম্পাত থেকে নাকি কার্পেট বম্বিং শুরু হবে। ইন্টারনেটে যে কোনও সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দেখুন, বিজেপির বিজ্ঞাপন চালু, এক ভাষায় নয়, নানান ভাষায়। মানে ওই বংগলা হ্যায়, গাড়ি হ্যায়, পয়সা হ্যায়। কিন্তু মা নঁহি হ্যায়, মা নেই। ঠিক এই মুহুর্তে একবারও ভাববেন না প্লিজ যে, আমি রুদ্রনীল ঘোষের মতো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে মা বলে ডাকা শুরু করছি, মা মানে পরিচয়, মা মানে সেই মাটির গন্ধ, মা মানে মাতৃভাষা, মা মানে এ বাংলার নদী, এ বাংলার মাটি, বাংলার কবি, বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য।
হ্যাঁ, বিজেপির দুর্ভাগ্য, এগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বিজেপির নেই। থাকবেই বা কী করে? সেই কবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছাড়া তাদের এ বঙ্গে মুখ কোথায়? এবং সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যাঁর মিটিংয়ে লাঠি আর ঢিল নিয়ে তেড়ে গিয়েছিল সুভাষ বসুর ছেলেরা, মাথায় ঢিল পড়েছিল, স্বয়ং শামাপ্রসাদের, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র এ বঙ্গে তেমন কলকে পাননি, ওদিকে বিপ্লবীরা, যাঁরা আন্দামানে গিয়েছিলেন, যাঁরা জেল থেকে বের হলেন, তাঁদের বেশিরভাগ যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টি, নিদেন পক্ষে সোশ্যালিস্ট পার্টি, এবং কংগ্রেসের বাঘা-বাঘা নেতারা রাজ্যজুড়ে, বিধান রায়, অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন। জনসংঘের তেমন নেতা কই? তারপর থেকে বাংলায় আছে বাম আর কংগ্রেস। মধ্যের খালি জায়গাতে ঘুরঘুর করলেও, ব্রাত্য থেকে গিয়েছে বিজেপি। এরপর সারা দেশেই বিজেপির উত্থান, রামমন্দির আন্দোলন, নরেন্দ্র মোদীর ক্যারিস্মা আর সামনে জাতীয় কংগ্রেসের অপদার্থতা, তৃণমূল কংগ্রেসের একছত্র দাপট, কমিউনিস্ট পার্টির দিশা হীনতার সুযোগে এ রাজ্যে ঢুকে পড়ল বিজেপি, ১০ শতাংশ ভোট থেকে নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে ৪০ শতাংশ ভোট। আর তারপর থেকেই তাঁদের মাথায় ঢুকল বাংলা দখলের ইচ্ছে, আর কে না জানে গত এক দশকে বিজেপি ইলেকটোরাল পলিসিকে যেভাবে দেখেছে, যেভাবে লালন পালন করেছে, অন্য দল তার কাছে শিশু। কিন্তু বাংলায় তাদের সমস্যা হল মা নেই, তাদের এই বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে কোনও ধারণা নেই, এবং তা না থাকলেও তারা সারা দেশের লোকসভা ভোটের সুযোগে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ হয়েছেন, কিন্তু তারপর থেকেই তারা প্রতি পদে পদে বুঝতে পারছেন, মা নেই। চারিদিক খুঁজছেন, নিজেদের, দলকে, নেতাদের ওই ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রবল চেষ্টা চলছে। বাংলার আইকনদের খুঁজে বার করা হচ্ছে, এ বাংলার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী, তাদের কৃষ্টি সংস্কৃতিকে জুড়ে দেবার চেষ্টা হচ্ছে, আসুন সেসব বিফল চেষ্টার কিছু নমুনা দেখা যাক।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | নির্বাচন কমিশন এত কষ্ট না করে মুখ্যমন্ত্রীকেই ট্রান্সফার করে দিন না?
প্রথমেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিতে এসেছেন, না ‘জয় শ্রী রাম’ বলছেন না, বলছেন ‘জয় মা কালী’। ‘ব্যোম কালী’ বলেননি, এই তো আমাদের বাপের ভাগ্য। ভাষণ দিচ্ছেন পিছনে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির। ভাবা যায়! এর আগের বারে কবিতা আউড়েছিলেন, সেই ‘চোলায় চোলায়’। ‘চলায়’ আর ‘চোলাই’-এর কোনও পার্থক্যই নেই তাঁর কাছে, থাকার কথাও নয়, প্রায়শই হিন্দি সিনেমাতে বাঙালি চরিত্র নিয়ে যেমন ভাঁড়ামো হয়, তিনি সেই ভাঁড়ামোর অংশীদার মাত্র। ‘হে মোর চিত্ত পূণ্য’ নয় মোদিজি, ‘হে মোর চিত্ত, পূণ্য তীর্থে জাগোরে ধীরে’, মানে তীর্থটা পূণ্য, কারণ ওটা আমার স্বদেশ। বাংলায় এসে বাংলায় কবিতা বলবেন, তামিলনাড়ুতে গিয়ে আবার কাঁদবেন, আহা এমন প্রাচীন ভাষা আমি শিখে উঠতে পারিনি, ভালো করেই জানেন যে তামিল ভাষায় ভুলভাল বললে আগুন জ্বলে যাবে, তাই বাংলার আইকনকে নিয়ে ছেলেখেলা। রবিঠাকুর সাজা হয়ে গিয়েছে, কেবল রবি ঠাকুর কেন? নেতাজীকেও বাদ দেন না। হঠাৎ নেতাজি সেজে পোজ দিয়ে ছবি তুলেছিলেন, আইএনএ-র জওয়ান। বিজেপির প্রচার শুরু হল, নেতাজির চরম শত্রু ছিলেন গান্ধী, নেহেরু। এই দু’জনকে আক্রমণ করতে পারলেই সাফল্য, কংগ্রেস যে একটা নেতাজি বিরোধী দল, সেটা প্রমাণ করা যায়। অতএব দু’জনকে যোগাড় করে একটা থানইঁট সাইজের বই লেখানো হয়ে গেল, আর একটা সিনেমা, বাঙালি দেখল জওহরলাল নেহেরু, সুভাষ বসুর ‘খুন কা প্যাসী থা’, তাঁদেরই ষড়যন্ত্রে নেতাজি এক ঘুপচি ঘরে গুমনামি জীবন কাটিয়ে দিলেন। বাংলার এক আইকনকে নিয়ে বিজেপির সম্পর্কের গুজব গত বারেও রটেছিল, এবারে তাঁর সন্তানকে আনা হয়েছে সেই গুজবের আঙিনায়, এবারে আবার সত্যজিৎ রায়ের নাম করে ইন্ডাস্ট্রিকে ডেকে নাও, তাজ বেঙ্গলে প্রকাশ জাবড়েকর আবার বসবেন, বাংলা চলচিত্রে কী কী সুধার আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে। আবার একঝাঁক বাঙালি চিত্র তারকা, পরিচালক ইত্যাদি। মানে আপাতত বাংলার শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে বিজেপি আছে, এই ছবিটা পৌঁছে দিতে হবে।
ওদিকে সৌরভ, আর এক বাঙালির আইকন, বাংলার মহারাজ, তাঁর বাড়িতে আবার একটা লাঞ্চ বা ডিনার নিশ্চয়ই হবে, আবার গুজবটা তো ছড়াতে হবে, অন্তত এটা তো দেখাতে হবে যে, ওনার সঙ্গে বিজেপির কী দারুণ সম্পর্ক! গতবার দলের জাতীয় সভাপতি, নাড্ডাজি, চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন ‘বন্দে মাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যের বাড়ি নিয়ে, সে বাড়ি নাকি ধসে পড়ছে, রাজ্য সরকার দায়ি, তারা দেখরেখ করছে না। এদিকে বাড়ি ধসে পড়া তো দুরস্থান, বাড়ির সংস্কার হয়েছে, একটা ঘরে ছোট মিউজিয়াম হয়েছে, আলো আছে, দর্শকরা যায়, সে সব খবর ছিল না ছিল নাড্ডাজি’র কাছে, না ছিল বিজেপির স্থানীয়দের কাছে, তো এবারে নাকি বঙ্কিমচন্দ্রের নাতিকে প্রার্থী করে দেওয়া হয়েছে, অনেকে বলছে এমন লতায় পাতায় নাতিকে তো কেউ চেনেই না, তাতে কী? ওই যে ‘বন্দে মাতরম’ দিয়ে যদি একটু মুসলমান খেপানো যায়। সেই নাড্ডাজি, নিতীন নবীন’জি এবারে পেয়েছেন অন্তত অনেকটাই বাঙালি শমিক ভট্টাচার্যকে, তাঁকে নিয়েই ইনটেলেকচুয়ালদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন, কিন্তু সমস্যা হল বাংলার মানুষজন নাম জানে, লেখে, পড়ে, এমন কোনও বুদ্ধিজীবি লেখক ইত্যাদিকে জোগাড় করে উঠতে পারছে না, না এমন নয় যে তাঁরা কেউ আসতেই রাজি নন, কিন্তু বিনিময় মূল্য স্থির হয়নি, সম্ভবত আর সেটা না দিনের দিন কেউ হাজিরা দেবেন না।
আসলে বিজেপির সংস্কৃতি এ বাংলার সঙ্গে খাপ খায় না, এ বাংলার ভাষা, পোষাক, খাদ্যাভাসের সঙ্গে পুরোদস্তুর বেমানান। আমাদের সাহিত্য, কবিতা আরএসএস–বিজেপির দর্শন বিরোধী, আমাদের মণীষীরা সেই কবে বেঁধে বেঁধে থাকার কথা বলেছেন, ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’-এর কথা বলেছেন, বলেছেন, ‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে’। আমাদের খাদ্যাভ্যাস মাছে-ভাতে গড়ে ওঠে, আমাদের উৎসব আয়োজনে খাসির মাংস, আমাদের পুজো দুগগা ঠাকুর, আমাদের গানে আইরিশ চার্চের গানের সুর, আমাদের বিয়েবাড়িতে বিসমিল্লার সানাই বাজে, রবিশঙ্করের সেতার, আমাদের জায়নামাজের আসনের পাশেই তুলসীতলা অনায়াসে থাকে। এ সংস্কৃতি আরএসএস–বিজেপির নয়, আমাদের ঘরের মেয়েরা ‘পরায়া ধন’ নয়, বিয়ের সাতদিনের মধ্যেই সে ফিরে আসে বাপের বাড়ি অষ্টমঙ্গলা করতে, রুদ্রনীলের মতো মোবাইলে নেই, তিনি এসব জানবেন কী করে? ‘সহজ পাঠ’ থেকে বাংলার যাবতীয় অজ্ঞতার ভার নিয়ে দিলীপ ঘোষ কীভাবে বুঝবেন বিদ্যাসাগর আর রবিঠাকুর? বুঝবেন না আর তাই যত্রতত্র ছড়াবেন, আমাদের বাংলায় সেই কবেই কপিলা গাই দুধ দিত, টাটকা সরওয়ালা দুধ, দই পাতা হত, সেই দইয়ের বাঁক নিয়ে দইওয়ালা আসত অমলের পাড়ায়। এসব শুনলে দিলীপ বাবু থই পাবেন না, স্বাভাবিক। এ রাজ্যে নির্বাচনের আগে এটাই বিজেপির সমস্যা, তাদের মা নেই। তারা মা খুঁজছে, খুঁজতে খুঁজতে আমি নিশ্চিত নির্বাচনের ফল বেরিয়ে যাবে, আবার প্রতীক্ষা। হ্যাঁ, ‘তেরে পাস বংগলা হ্যায়, গাড়ি হ্যায়, পয়সা হ্যায়, লেকিন তেরে পাস মা নঁহি হ্যায়’! আগে মা কে খুঁজে নিয়ে আসতে হবে, মোদিজি, তারপর অন্য কথা!
দেখুন আরও খবর:

