সেই উলটে দেখুন পালটে গিয়েছে, না তেমন নয়, আরেক বদল হয় ধীরে ধীরে, যাকে অনেকে বিবর্তনও বলতেই পারেন। মানে ‘সেই কাল ছিল ডাল খালি আজ ফুলে যায় ভরে’, না তেমন নয়, চোখের সামনে পাতা গজালো, কুঁড়ি এলো, ফুটল, কিন্তু না ফোঁটা কুঁড়িও কিছু থেকে গেল, তারা পরে ফুটবে, তেমন আরকি। হ্যাঁ, আমরা যারা সেই জন্ম লগ্ন থেকে তৃণমূল দলকে দেখে আসছি, তারা যদি রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো ঘুমিয়ে পড়তাম, তাহলে আজ ঘুম থেকে উঠে আমাদের অজানা লাগত, অনেকটাই অচেনা লাগত এই আজকের তৃণমূল দলকে। হ্যাঁ, এখনও কালীঘাটের সেই ছোট্ট ঘরেই প্রার্থীদের নাম বলা হল, কিন্তু সে তো বহিরঙ্গ, ভেতরে ভেতরে বদলে গিয়েছে তৃণমূল। আবার সেই বদলও কোনও নির্দিষ্ট ফরমুলা মেনে নয়, না সবক্ষেত্রে সেই ফরমুলা তো কাজে দিচ্ছে না। কিন্তু আজ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল যখন আবার ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যাপারে একশর ওপরে দেড়শ শতাংশ সিওর, তখন দেখুন ২৯৪ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরে হাতে গুনে ৪ থেকে ৫ জায়গা থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এসেছে। হ্যাঁ, মনে আছে এই কালীঘাটের খাপরা টালির চালে ইঁট পড়েছিল নাম না থাকার জন্য, তখন তৃণমূল ক্ষমতাতেই নেই। সেই কবে থেকেই তৃণমূল প্রার্থী তালিকা বার করবে, যতটা ব্যস্ত থাকতেন রাজনৈতিক সংবাদদাতা, ততটাই ব্যস্ত থাকতেন খেলা বা সিনেমা, বিনোদনের পাতার সাংবাদিকেরা। কখন কোন লাভলি এসে পড়বে, আর প্রার্থী তালিকাতে সেই লাভলি মদন মিত্রের না টালিগঞ্জের তা জানাটা রাজনৈতিক সংবাদদাতার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই ছবির সঙ্গে গতকালের প্রার্থী ঘোষণা এক্কেবারেই মিলল না, হ্যাঁ এক বিবর্তনের পথে তৃণমূল। সেটাই বিষয় আজকে, বদলাচ্ছে তৃণমূল, পাল্টাচ্ছে তৃণমূল।
কল্যাণ ব্যানার্জির প্রচার গাড়ি থেকে কাঞ্চন মল্লিককে স্রেফ ‘তুমি নেমে যাও’ বলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মনে আছে? হ্যাঁ, সেই কাঞ্চন মল্লিক কিন্তু এবারের তালিকাতে নেই। গতবার বিজেপিতে গিয়ে ফিরে এসেছেন প্রবীর ঘোষাল, না তাঁকেও প্রার্থী করা হয়নি, হয়েছে কল্যাণ ব্যানার্জির পুত্র, ওই অঞ্চলে পরিচিত তৃণমূলের মুখ। সল্টলেকে থাকেন, বিদ্রোহী হয়েছিলেন, বারাসাতে পাঠানো হয়েছে সব্যসাচী দত্তকে, বাদ পড়েছেন চিরঞ্জিৎ, একবার সাধিলে তিনি কি প্রার্থী হতেন না? আবার দেখুন সবুজ ধুতির উপরে গোলাপি পাঞ্জাবি পরে শোভন চাটুজ্জে গিয়েছিলেন তো দিদির সঙ্গে দেখা করতে, তাঁর আসন জোটেনি, সেই আসন গিয়েছে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী রত্না চ্যাটার্জির কাছে, আরজি কর মামলাতে দুই ডাক্তারের নাম এসেছিল, ডাঃ শান্তনু সেন আর ডাঃ সুপ্রিয় রায়। না, কেউ আসন পায়নি, শ্রীরামপুর গিয়েছে তন্ময় ঘোষের কাছে, রটেছিল বরানগর থেকে সায়ন্তিকা, সোনারপুর থেকে লাভলিকে সরানো হবে, না সরানো হয়নি, আবার শোনা গিয়েছিল ইমন চক্রবর্তী বা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নাম, না তাঁদের নাম তালিকাতে নেই। ৭৪ বছরের মানস ভুঁইয়া আছেন, ৭৬ বছরের অশোক দেব আছেন, কিন্তু ৪০ বছরের মনোজ তেওয়ারি বাদ।
আরও পড়ুন: Aajke | বিরোধী দলনেতা কে হবেন? দিলীপ ঘোষ না শুভেন্দু অধিকারী?
নতুন তালিকায় গতবারের ৩৩ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। মনে আছে সবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলা শুরু করেছিলেন একটা বয়সের পরে সক্রিয় রাজনীতি ছাড়তে হয়, দলের প্রবীণদের নানান মন্তব্যের পরেও সমানে এই কথা বলে গিয়েছেন, আজ দেখা গেল সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী ৬০ বছরের নীচে। টলিউডের একটাও নতুন রিক্রুট নেই, নন্দীগ্রাম নিয়ে চমকের খেলা না খেলে এমন একজনকে দাঁড় করানো হল, যিনি নিজেকে প্রমাণ করার জন্য জান লড়িয়ে দেবেন, তিনি নিজের চেষ্টায় হাজার পাঁচ সাত আনলেই পাশার দান পাল্টাবে, জানে সবাই। নাম করা কেউ দাঁড়ালে, দাঁড় করানো হলে তাঁর নিজের হেরে যাবার, ফেস লস হবার এক চাপ থাকত, পবিত্র করের সেটা নেই। কোনও একটা আসনেও তৃণমূল সুলভ চমক নেই, আর সেটাই সম্ভবত এবারে প্রার্থী তালিকার সবথেকে বড় বিষয়। আর খেয়াল করে দেখুন, যুবরাজ তাঁর টিম তৈরি করছেন, কিছু হাতে রেখেছেন, কিছু পাতে দিয়েছেন, মানে এখন থেকেই এক টিম ওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছেন তিনি। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, নবীনে প্রবীণে এক্কেবারে চমকহীন তৃণমূল দলের প্রার্থী তালিকার সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তারুণ্য, দলে নতুন মুখ, তরুণ মুখকে জায়গা করে দেওয়া, ২০১১-র তৃণমূল ২০২৬-এ এসে কতটা পাল্টেছে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
২০১১-তে তৃণমূল চলত খানিক ক্লাব সংগঠনের মতো, সে ক্লাবের সম্পাদক, সভাপতি, ক্যাশিয়ার সবই ওই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর থেকে আজ অবধি তৃণমূলের খোল নলচে বদলে গিয়েছে, তার সংগঠন আজ অনেক বেশি শক্তিশালী, তৃণমূল এখন মমতাকে সামনে রেখে এক সংগঠনের ভিত্তিতেই দল চালাতে চায়। সে দলের ডিজিটাল টিম আছে, নিজেদের কাগজ আছে, এক্কেবারে একসুরে কথা বলা মুখপাত্ররা আছেন, উত্তর থেকে দক্ষিণে এক সূত্রে বাঁধা প্রচার আছে, সব মিলিয়ে ২০১১-র তৃণমূল বদলে গিয়েছে, ২০২৬-এ প্রার্থী পদের ঘোষণা সেই বদলকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
দেখুন আরও খবর:

