ঝড় এসেছে, তাহলে আম পড়বে, বাজাও তালি। ঝড় আসেনি, তাহলে আম পাকবে, বাজাও তালি। এসব বাচ্চাদের খেলা, কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দল, বিশেষ করে সেই সব বিরোধী দল, যাঁরা প্রতিবারের প্রায় মন্ত্রীসভা গড়ে ফেলেন, তারপরে বোঝেন, এবারেও হল না, সেই দলের নেতারাও এরকম কিছু তত্ত্ব কে এনে হাজির করেন, যার ঠিক উল্টোটা তার আগেরবারে বলেছেন। ধরুন ভোট বেশি পড়লো, বিরোধী দল বলতে থাকেন, খেল খতম বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে। সরকারি দল আমতা আমতা করেন, নির্বাচন পন্ডিতেরা একদল বলেন বেশি ভোট মানেই অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট ভোট, অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি ভোট, অতএব পরিবর্তন আসন্ন। অন্য আরেক দল তখন স্ট্যাটিস্টিকস বার করে বোঝাতে থাকেন, কোন কোন বছরে বেশি ভোট পড়ার পরেও সরকার বদলায়নি। হ্যাঁ, আসলে মানুষ যা চায় তার স্বপক্ষে যুক্তি তৈরি করে, রাজনীতিতে সেটা একটু বেশিমাত্রায় আছে। মানুষ সরব, মানুষ বলছে এবারে পরিবর্তন আসছেই। মানুষ চুপ, সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, এবারে পরিবর্তন আসছেই। হ্যাঁ এগুলো মানুষের বানানো যুক্তি। ঠিক তেমন এক যুক্তি অন্তত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রতিবার উঠে আসে, কত দফায় ভোট হলে কার লাভ? তার এক্কেবারে হাড়ভাঙা অংক কষা হয়, তারপর সে অংক মেলে না, মেলে না তো মেলে না। কত কিই তো মেলে না। একবারও তাঁ নির্বাচনী সমীক্ষা মেলেনা, হ্যাঁ অমন যে অমন ২০১১ র ভোটে পরিবর্তনের আঁচ পাননি তেমন এক প্রবীন বৃদ্ধ সাংবাদিক, আপাতত বিজেপির এ রাজ্যের কল্কে নিয়েছেন, তিনি এই দুদফাকে মাস্টার স্ট্রোক বলেছেন, দুদফায় নাকি তৃণমূলের (Trinamool Congress) দফা রফা, ওদিকে নেট দুনিয়ার ছড়া আট দফা , দু দফা, বিজেপির (BJP) দফারফা। সেটাই আজ বিষয় আজকে দু দফায় বিজেপির দফারফা?
আসলে এই দফায় দফায় ভোট করানোর দাবিও কিন্তু সেই কবে তৃণমূলই তুলেছিল, সারা রাজ্য জুড়ে সি আর পি এফ আর আধাসামরিক বাহিনীর ডিপ্লয়মেন্ট যাতে করা যায়, যাতে রাজ্য পুলিশ নয়, রাশটা থাকে কেন্দ্রে থাকা শাসক দলের হাতে, তার জন্যই এই আবদার, নির্বাচন কমিশনও (Election Commission) বাংলার নির্বাচনে মূলত সেই কারণেই ছদফা, সাত দফা, আট দফায় ভোট করিয়েছেন। গত ২০২১ এ আট দফা ভোটের ঘোষণার পরে নেতাদের রি অ্যাকশন দেখুন, শুভেন্দু অধিকারি বলেছিলেন মাজা ভেঙে দেওয়া হল, আর কোনও জারিজুরি খাটবে না। ফলাফল সবার হাতে, ২০১৬ র ভোটের আগে পাঁচ ছ’দফায় ভোট করানোর দাবি ছিল বাম কংগ্রেসের, ফলাফল সবার জানা। আবার ২০০১ এ এক দফাতেই ভোট হয়েছিল, ফলাফল কি খুব বিরাট অস্বাভাবিক হয়েছিল? হয়নি তো। দু দফাতে ভোট হয়েছিল সেই ১৯৯৬ এ, ফলাফল? বামফ্রন্ট ২০৩, কংগ্রেস ৮৫। সেবারে অবশ্য দু দফার বিভাজন সামান্য আলাদা ছিল।
আরও পড়ুন: Aajke | বিজেপির প্রার্থী কারা? নতুন কতজন? পুরানো কতজন?
প্রথম দফা: ২ মে, ১৯৯৬ এই দফায় দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার। উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ। মুর্শিদাবাদ, নদিয়া। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বীরভূম। আর দ্বিতীয় দফা: ৭ মে, কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলি, মেদিনীপুর (তখন অবিভক্ত ছিল) আর বর্ধমান। এবারে এই ছকটা রেখে মেদিনীপুরকে প্রথম দফাতেই রেখে দেওয়া হল। আর নদিয়া হুগলি, পূর্ব বর্ধমানকে দ্বিতীয় দফাতে আনা হল। কিন্তু এসব দিয়েই কি ভোটের ফল উলটে দেওয়া যায়? এটা ঘটনা যে বিজেপির সবথেকে দুর্বল অংশে ভোট ২৯ এপ্রিল, যার আগে ২৩ এপ্রিল সারা দেশের অন্য সমস্ত রাজ্যে ভোট শেষ, কাজেই বিজেপি ফুল ফোর্স নিয়ে ঝাঁপানোর সুযোগ পেল। আবার এটাও ঘটনা যে তৃণমূল তাদের সব তারকা কে একলপ্তে নামানোর সুযোগ পেল। কাজেই দফা দুই হয়ে তৃণমূলের দফারফা হয়ে গিয়েছে বলে যারা নাচছেন, সেই তারাই গতবারে আত দফায় ভোট শুনে একইভাবে শিশু ভোলানাথের মত নেত্ত করেছিলেন, তাঁদের বলি, এসব দফা দুই, তিন বা আটের ব্যাপার নয়। প্রশ্নটা হল সারা বছর হোম ওয়ার্কটা করেছেন কিনা। সারা বছর মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক থেকেছেন কি না? সারা বছর আপনার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মানুষ ছিল কি না। হ্যাঁ একমাত্র তারপরেই আপনি মানুষের সমর্থন দাবি করতে পারেন। ক দফায় ভোট হল তা দিয়ে কিচ্ছু এসে যায় না। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, গতবারে আট দফায় ভোট হয়েছিল, তার আগেরবারে সাত দফায়, তার আগে ছ দফায় ভোট হয়েছিল, এবারে দু দফায়, তাতে কি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল বদলে যেতে পারে? শুনুন মানুষজন কী বলছেন?
দফা দিয়ে দফারফা করা যে যায় না তা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের (WB Assembly Elections 2026) ইতিহাস বলে দেবে। কিন্তু এই দফার ওপরে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেখেই বোঝা যায়, আসলে বিজেপি তার রণকৌশল নিয়ে নিজেই চূড়ান্ত বিভ্রান্ত, যে শুভেন্দু অধিকারি গতবার আট দফার ভোট জেনেই উল্লসিত হয়েছেন, সেই তিনিই এবারে দু দফাতে দফারফা করার কথা বলছেন, তৃণমূলের গুন্ডারা নাকি আর ট্যাঁ ফোঁ করতে পারবেন না। আসল রোগ না ধরতে পারলে চিকিৎসা সম্ভব নয়, বিজেপির আসল রোগ খালি চোখেই ধরা পড়ছে কিন্তু নেতারা যদি দফা আর এস আই আর করেই জিতে যাবার কথা ভাবেন তাহলে ফলাফল বের হবার পরে আবার সেই একরাশ হতাশা ঘিরে ধরবে তাদের।
