ওয়েব ডেস্ক: একদিকে পারস্য উপসাগর, অন্যদিকে ওমান উপসাগর। মাঝখানে মাত্র ২১ মাইল চওড়া একটি সরু জলপথ, নাম হরমুজ প্রণালী (Strait of Harbuz )। পশ্চিম এশিয়ার (West Asia) বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই সমুদ্রপথ। ভারতের মানচিত্রে সরাসরি না থাকলেও এর প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। তাই পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia) যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতেই বিশ্বজুড়ে নজর এখন এই হরমুজ প্রণালীর উপর।
কোথায় এই হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালীর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান। পাশাপাশি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের উপকূল জুড়ে রয়েছে আরও ছ’টি দেশ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত এবং ইরাক। এই আটটি দেশের প্রায় সকলেরই রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার। পশ্চিম এশিয়া থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির প্রধান পথই হল এই হরমুজ প্রণালী।
আরও পড়ুন: খুলল হরমুজ প্রণালী! ভারতে এসে পৌঁছল সৌদির ট্যাঙ্কার! এবার কি মিটবে জ্বালানির সংকট?
কেন এত দাপট ইরানের?
হরমুজ প্রণালী মোটামুটি ১০০ মাইল লম্বা। সবচেয়ে সরু জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল। অবস্থানগত কারণে প্রণালীর উত্তরাংশ জুড়ে রয়েছে ইরানের উপকূল। ফলে এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই বেশি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনও দেশ তার উপকূল থেকে প্রায় ১৩.৮ মাইল পর্যন্ত জলসীমার উপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে। ফলে হরমুজের সংকীর্ণতম অংশে ইরান ও ওমান, দুই দেশেরই অধিকার থাকলেও বাস্তবে সামরিক শক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরানের দাপট বেশি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ?
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবহণ করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়।
ওপেকভুক্ত দেশগুলি, যেমন সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-অধিকাংশ তেল রফতানি করে এই পথেই। এশিয়ার বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চিন, ভারত এবং বাংলাদেশ। এছাড়াও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতার। তাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পুরোটাই এই হরমুজ় প্রণালী হয়ে বিশ্বের বাজারে পৌঁছয়। মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়েই যায়।
ইরান ও আমেরিকা-ইজরায়েলের সংঘাতের জেরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। গত ৪ মার্চ ইরান হরমুজ় প্রণালীর উপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ঘোষণা করে এবং হুঁশিয়ারি দেয়। অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ গেলে হামলা করা হবে।
ইতিমধ্যে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার গুজরাতে আসার পথে একটি থাই পণ্যবাহী জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই নিয়ে হরমুজ় প্রণালীতে আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩। সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। খনিজ তেলের দাম ইতিমধ্যে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছুঁয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা ২০০ ডলারেও পৌঁছতে পারে।
ভারতের উপর কী প্রভাব?
ভারত জ্বালানি আমদানির জন্য অনেকাংশে পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল। যদিও বর্তমানে প্রায় ৪০টি দেশ থেকে তেল আমদানি করা হয়, তবু হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা জোগান ব্যাহত হলে চাপ পড়ে বাজারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করা হয় এবং তার ৯০ শতাংশই আসে এই হরমুজ় প্রণালী হয়ে। এই কারণে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিকল্প রুটে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্র।
