Fourth Pillar | ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’তে বিচারাধীন একজনের নামও বাদ দিতে পারবে না নির্বাচন কমিশন

0
32

নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এই মুহুর্তে হাজির এই বাংলাতেই। আর হ্যাঁ, তাঁরাও সেই হোটেলেই উঠেছেন যেখানে অমিত শাহ এলে ওঠেন, যেখানে বিজেপির নেতারা যান বৈঠক করেন, যেখান থেকে বিজেপির এক অলিখিত দফতর চলে, যেখানে কমরেড মহম্মদ সেলিম হুমায়ুন কবীরের মন বুঝতে যান, সেই এপস্টিন হোটেলেই নির্বাচন কমিশনও উঠেছেন। অপরাধ বিজ্ঞান বলে অপরাধীদের এক মোডাস অপারেন্ডি থাকে, এক কাজ করার প্যাটার্ন থাকে যা তারা তাদের অবচেতনেই ঘটায়, যা থেকে তাদের ট্রাক, তাদের সূত্রটা ধরা পড়ে যায়। ঠিক সেরকমভাবেই এই হোটেলটা অনেক সূত্র হাজির করে। কোথাও যে সব এক সুতোয় গাঁথা, সেটা বোঝা যায়। তো যাই হোক হাজির নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ আর সবকটা রাজনৈতিক দল বসলেন বৈঠকে। বৈঠকের পরে নির্বাচন কমিশন একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তাতে কমিশন জানিয়েছে “Most political parties appreciated the massive SIR exercise being carried out by ECI in the state of West Bengal and reposed their complete faith and trust in ECI.” এই বিজ্ঞপ্তিতেই কারা কারা মানে কোন দলগুলো বৈঠকে এসেছিল, তার তালিকাও দেওয়া হয়েছে, সেখানে আছে ৭ টা দলের নাম, সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস, ন্যশনাল পিপলস পার্টি, ফরোয়ার্ড ব্লক, আম আদমি পার্টি, আর তৃণমূল কংগ্রেস। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হচ্ছে বেশিরভাগ দলই নির্বাচন কমিশনের কাজে সন্তুষ্ট।

হ্যাঁ, আমরা দেখলাম বৈঠক থেকে বেরিয়ে কমরেড সেলিম জানিয়ে দিলেন, এইসব গন্ডগোল যে আসলে ওই বিএলএ, এআরও বা ওই রাজ্য সরকারি কর্মচারীরাই করেছে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনও একমত, কমরেড সেলিম দাবিও জানিয়েছেন যাঁরা দোষী তাঁদের শাস্তি দিতেই হবে। আর কমরেড সেলিম সাংবাদিকদের জানালেন যে বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া যাবে না। ওনার বক্তব্য থেকে যা বেরিয়ে এলো তা হচ্ছে, (১) নির্বাচন কমিশন এসআইআর করেছে তা নিয়ে ওনাদের আপত্তি নেই। (২) এই এসআইআর চলাকালীন যে অসুবিধে ইত্যাদি হয়েছে তার জন্য দায়ী হল আসলে ওই বিএলও, এআরও আর রাজ্য সরকারী কর্মচারীরা, তাই ওনারা দাবি জানিয়েছেন যে ওই কর্মচারীদের শাস্তি দিতেই হবে। (৩) বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া যাবে না, কিন্তু সেই বৈধ ভোটারদের কীভাবে ভোটার তালিকাতে ইনক্লুড করা হবে, তা নিয়ে ওনাদের কোনও বক্তব্য নেই। (৪) কোন টাইম ফ্রেমের মধ্যে এই কাজ করতে হবে তা নিয়েও ওনাদের কোনও কথা নেই, অন্তত সাংবাদিকদের সামনে সেটা বলেননি। ওদিকে তৃণমূল এসআইএর গোটা প্রক্রিয়া নিয়েই তাদের ক্ষোভ জানিয়ে এসেছে বলেই সাংবাদিকদের জানালেন, তাঁরা ফর্ম নম্বর সাতের ব্যাপারেও তাঁদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। বিজেপি নেতারা জানিয়েছেন এক্কেবারে ওই একই কথা, যা কমরেড সেলিম জানিয়েছেন, যে রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের দিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই গন্ডোগোলটা পাকিয়েছেন, এই মৃত্যু, এই হয়রানির জন্য রাজ্য সরকার দায়ী।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | রাজ্যপাল দিয়ে রাজ্য দখলের চেষ্টায় বিজেপি?

আসুন এবারে একটু অন্য দিক থেকে বিষয়টাকে দেখা যাক। এই যে বাদ যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের সংখ্যাটা ঠিক কত? আর কীভাবে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে? এই ডিলিশন প্রশেসটা বুঝতে পারলেই সমস্যাটা বুঝতে পারা যাবে। এই গোটা ডিলিশন প্রসেসে মূল ইনপুট কিন্তু ভোটারের দেওয়া এনিউমারেশন ফর্ম, যার ফিজিক্যাল অস্তিত্ব আছে, সেই ইনপুটগুলোকেই ডিজিটাইজ করা হয়েছে। ধরুন আগের তালিকাতে নাম ছিল, কিন্তু নতুন ইনপুট আসেনি, মানে এনিউমারেশন ফর্মই ভরেনি, বা মৃত, বা স্থানান্তরিত ইনপুট এলে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর এক সফটওয়ারে ফেলা হয়েছে, তার প্রোগ্রামিং অনুযায়ী সে প্রথমে আন-ম্যাপড, মানে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে যাদের লিঙ্ক নেই, তাঁদের বার করেছে, এবং তার পরে এক খসড়া ভোটার তালিকা বের করা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বিতর্কিত যে অংশ সেটা হল আন-ম্যাপড ভোটার বা আন-লিঙ্কড ভোটার, মানে যাঁদের ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি, তাঁদের নাম ছিল না, তাঁদের মা-বাবার নামও ছিল না ইত্যাদি। তো এমন সংখ্যা কত ছিল? ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার। মৃত নয় জীবিত, বা স্থানান্তরিত নয় অথচ নাম বাদ গিয়েছে এমন ভোটারের সংখ্যা খুব কম, কিছু পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু সেই ডিলিটেড ভোটারদের আবার ফর্ম-সিক্স ভরে আপিল করা সুযোগ তো ছিল, এদের, মানে আন-ম্যাপড ভোটারদের কিন্তু সেই সুযোগ ছিল না। তো এদের কারা বাছল? সফটওয়ার, কোনও আধিকারিক এই ৩২ লক্ষ ভোটারদের বাছেননি, বেছেছে একটা অত্যন্ত গোলমেলে সফটওয়ার, যে সফটওয়ারের গোলমালের কথা এই ইলেকশন কমিশন এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও উল্লেখ করেছে। কিন্তু সেই খসড়া তালিকাতেও মোট বাদ পড়েছিল ৬৩ লক্ষের মতো নাম। সেখানে থামলে প্রশ্ন থাকত ওই আন-ম্যাপড ৩২ লক্ষ ভোটারকে নিয়ে।

কিন্তু এর পরে এল লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, ধূর্ত শেয়ালেরা যা লোকাতে চায় তা হল এই ৬০ লক্ষ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিও কিন্তু কোনও আধিকারিক বাছেননি, সেটাও ওই সফটওয়ারেই বাছা হয়েছে, যা প্রোগ্রামড হয়েছিল নয়ডা থেকে। ধরুণ একজনের নাম দিগন্ত, তার বউয়ের নাম মাহমুদা সুলতানা, তো দিগন্তের নাম কিন্তু ভোটার তালিকাতে আছে কিন্তু মাহমুদা সুলতানার নাম বিচারাধীন, কেন? কারণ সে হিন্দু পদবিধারী এক পুরুষের স্ত্রী, যে ঈদ আর দুর্গাপুজো দুটোই করে, কিন্তু সফটওয়ার তো জানে না, তাঁকে বাদ কোনও আধিকারিক দেয়নি, বাদ দিয়েছে ওই সফটওয়ার। কিন্তু বিপ্লবী কমরেড সেলিম জানিয়ে দিলেন, এসব গন্ডোগোল করেছে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা, সেই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীরা যারা গত ৫-৬ মাসে একটা ছুটি নিতে পারেননি, যাঁরা লাগাতার কাজ করে যাচ্ছেন, যাঁদের শুরু থেকে এক আশঙ্কা আর ভয় ঘিরে ধরেছে, সেই তাঁরা এখন ভিলেন, নির্বাচন কমিশন নয়, জ্ঞানেষ কুমার নয়, এক্কেবারে হুবহু একই কথা বলেছে বিজেপি। আবার বলি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির যে ৬-৭ টা ক্রাইটেরিয়া, তা প্রোগ্রাম করাই ছিল, খসড়া ভোটার তালিকা সেই প্রোগ্রামিংয়ে ফেলার পরে ৬০ লক্ষ মানুষকে এক ধাক্কায় বিচারাধীন করে দিয়েছে।

অবশ্যই এই বিরাট জনসংখ্যাকে বাদ দিয়ে ভোট করা যাবে না, করতে দেওয়া হবে না, কোনও দল নয়, বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়াবেন, কিন্তু তারও আগে এক বড় প্রশ্ন সম্ভবত আগামীকাল বা পরশু সর্বোচ্চ আদালতে উঠতে যাচ্ছে, সেটা কী? মানে কীসের জোরে আমি এত জোর দিয়ে বলছি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে একজনেরও নাম বাদ দিতে পারবে না নির্বাচন কমিশন, সেই তথ্যটা কী? আসলে নির্বাচন কমিশন তাদের চাল দিতে গিয়ে একটা বড় ভুল করে ফেলেছে, প্রথম খসড়া ভোটে এই লোকজনের নাম আছে, তার মানে এঁরা ২০০২-এর সঙ্গে লিংকড, ২০০২-এ এঁদের নাম আছে বা এঁদের বাবা-মায়ের নাম আছে বা ঠাকুরদা ঠাকুমার নাম আছে, আর সেই নাম আছে সেটা জানছি কোথ্বেকে? জানছি কদিন আগেই এই ইলেকশন কমিশনের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে। তার মানে এই ৬০ লক্ষ মানুষের নাম নিয়ে ঠিকানা নিয়ে বাবার বা বউয়ের বা স্বামীর পদবী নিয়ে যত রকমের ডিসক্রিপেন্সিই থাক না কেন, এঁরা দেশের আঙ্গরিক। আর দেশের সংবিধান বলছে একজন নাগরিককে তার ভোটাধিকারের থেকে বঞ্চিত করা যায় না। হ্যাঁ, ঠিক এই জায়গাটাতেই ফাটা বাঁশে কী যেন আটকে গিয়েছে ওই নির্বাচন কমিশনের। কোনও ভাবেই এই ৬০ লক্ষের একজনকেও তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন না, সেই রায় সর্বোচ্চ আদালতে মামলা ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যাবে। একজন বাবার ছয় জন বাচ্চা কেন? এই অপরাধে একজনের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে? একজন মহিলার বিয়ের পরে পদবী একই আছে কেন বা বদলায়নি কেন, এই অপরাধে একজনের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় নাকি? আসলে জ্ঞানেষ কুমার অত্যন্ত বেশি প্রভুভক্তি দেখাতে গিয়ে, শুভেন্দু অধিকারীর বলে দেওয়া এক কোটি ২৫ লক্ষ টার্গেট অ্যাচিভ করতে গিয়ে সাধারণ বোধবুদ্ধিটুকুও হারিয়েছেন, না হলে এরকম এক প্রক্রিয়া নিয়ে মাঠে নামতেন না। আর এটাও লজ্জার যে এক নেতা যিনি নাকি কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য, তিনি এই সফটওয়ার ড্রিভন এক প্রক্রিয়ার জন্য লাখ খানেক রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দায়ী করে ফেললেন, যে প্রক্রিয়া নিয়ে সারা ভারতে প্রত্যেকটা বিরোধী রাজনোইতিক দল সমালোচনায় মুখর, সেখানে ক্লিন চিট দিলেন জ্ঞানেষ কুমারকে? কেবলমাত্র মমতাকে হারানোর জন্য এতটা নীচে নামার দরকার ছিল?

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here