Fourth Pillar | বাংলা এক নতুন রাজনৈতিক বাঁকের মুখে

0
46

ঠিক এই মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যে জটিল উত্তপ্ত পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। এর আগে বাংলার মানুষ এরকম এক অবস্থার মুখোমুখি হয়নি। একদিকে এক সাংবিধানিক সংকট, যে কারণে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতেই পারে, অন্যদিকে এক গণতান্ত্রিক সংকট, রাজ্যের খুব কম করেও ৭০-৮০ লক্ষ বৈধ ভোটারকে বাদ দিয়েই নির্বাচন হবে। দু’টো ক্ষেত্রেই বাংলা উত্তাল হবে, যেটা বোঝার জন্য রকেট সাইন্সের জ্ঞান তো দরকার নেই। স্পেশাল ইনটেনসিভ প্রক্রিয়া যে জটিলতা শুরু করেছিল, তা ক্রমে আরও জটিল হয়ে চলেছে, সেটাকে কেবল নির্বাচনী সংস্কার বললে মিথ্যে বলা হবে, এটা আপাতত বিজেপি সরকারের এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা দিয়ে ইচ্ছে করেই এক গভীরতর সাংবিধানিক সংকট তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে কারোর কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিহীন অসঙ্গতির নামে ভোটার তালিকায় যে বিপুল পরিমাণ তথ্যের গরমিল বার করা হয়েছে, তার অদ্ভুত সব ব্যাখ্যা এই জটিলতাকে আরও দশগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল টা কী? ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট নামগুলোকে বাদ দেওয়া এই তো? সেরকম এক রুটিন কাজ কীভাবে এই চূড়ান্ত বিতর্কিত রাজনৈতিক রূপ পেল? কমিশনের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে গত দুই দশকে ভোটার তালিকায় কোনও বড় ধরনের নিবিড় সংশোধন ঘটেনি, যার ফলে তালিকায় অসংখ্য অসংগতি রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অঞ্চলের জেলাগুলিতে ভোটার সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আর তথ্যের গরমিল বেশ গোলমেলে।

আচ্ছা অন্য রাজ্যে গত দু’দশকে কি কোনও নিবিড় সংশোধনের কাজ হয়েছিল? কোথাও হয়নি, তাহলে এই গুল-গপ্পোটা কেন দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন? কোন সত্যিটাকে ঢাকতে? আন্তর্জাতিক সীমান্তে ভোটার বেড়েছে? কোন বছরের তুলনায় কোন বছরে বেড়েছে? একটা হিসেবও কি দিয়েছে এই নির্বাচন কমিশন? বরং তথ্য একেবারেই অন্য কথা বলছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বাংলাভাষী-অধ্যুষিত রাজ্যগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশ কম। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় গড় ছিল ১৭.৭ শতাংশ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১৩.৮ শতাংশ, অসমে এই সংখ্যাটা ছিল ১৭.১ শতাংশ আর ত্রিপুরায় ১৪.৮ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের ঢপবাজিটা সত্যি হলে এই রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের থেকে অনেক বেশি হত। এই মিথ্যেটাকে প্রমাণ করার জন্য অনুপ্রবেশ নিয়ে আর একটা অভিযোগ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় মানে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে নাকি জাল আধার, ভোটার বা রেশন কার্ড তৈরি এক ‘কুটির শিল্প’-তে পরিণত হয়েছে। যদি ধরেইনি এই অভিযোগটা সত্যি, তাহলে রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে এই কার্ডগুলোর সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এখানেও তথ্যে কোনও গরমিল নেই। পশ্চিমবঙ্গের আধার, ভোটার বা রেশন কার্ডের সংখ্যা রাজ্যের জনসংখ্যার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ২০১১ সালের জনগণনা বলছে, ভারতের মোট জনসংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের অংশ ছিল ৭.৫৫ শতাংশ। এর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারি কার্ডের আনুপাতিক হারও এর খুব কাছাকাছি। যেমন, কেন্দ্রীয় সরকারের ইউআইডিএআই-এর তথ্য হল ২০২৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত রাজ্যের আধার কার্ডধারী মানুষের সংখ্যা দেশের মোট আধার কার্ড আছে এমন মানুষের ৭.৪১ শতাংশ। একইভাবে, কেন্দ্রীয় খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের ২০২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে সংসদে পেশ করা তথ্য হল, পশ্চিমবঙ্গের রেশন কার্ডের সংখ্যা গোটা ভারতের ৭.৪৬ শতাংশ। আবার, ২০২৪ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী রাজ্যের ভোটার সংখ্যা দেশের মোট ভোটারের ৭.৭৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বিজেপি এক নোংরা খেলায় নেমেছে, যা এর আগে ভারতে কখনও হয়নি

তাহলে এই ঢপবাজি কেন? কারণ তো একটাই, নাম বাদ দিতে হবে, আর একটা সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে হবে, যাতে করে রাষ্ট্রপতি শাসন চাপানো যায়, ওই যে শঙ্কর ঘোষ, বিজেপির বামপন্থী এমএলএ বলেছেন না যে, দু’মাস পর থেকে উনিই নাকি সরকার চালাবেন, সেটা এই গ্রান্ড প্ল্যানের অংশ, মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে মাত্র। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করছেন, নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের তথা দিল্লির রাজনীতির চাপে কাজ করছে। অসম বা অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তো এত বেশি কড়াকড়ি নেই, পশ্চিমবঙ্গে কেন মাইক্রো-অবজার্ভার নিয়োগ করা হচ্ছে? কেন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে? মমতা বলছেন, এটা আসলে ভোটারদের ভয় দেখানোর আর একটা নির্দিষ্ট অংশের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার গভীর চক্রান্ত। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ করেছে যে, ভোটার তালিকায় নাকি এমন অসংখ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে যা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। কমিশনের তথ্য, পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ২৫ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৬৭ লক্ষ ভোটারের তথ্যে এই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। এই অসংগতিগুলো মূলত ধরা পড়েছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটারদের তথ্যের মেলবন্ধন বা ‘প্রোজেনি ম্যাপিং’ করার সময়। মানে ২০০২ সালে নাম আছে, কিন্তু তথ্যের অসঙ্গতি আছে। আসলে কেবল ২০০২ সালে নাম নেই, সেই ভিত্তিতে তো সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া যায়নি, কাজেই এবারে সেই সংখ্যালঘুদের টার্গেট করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তো তাঁদের এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিগুলো কেমন? (১) এমন অনেক ভোটার রয়েছেন, যাঁদের নথিতে সন্তানের সংখ্যা ১০০-র বেশি, এমনকি দু’জন ভোটারের ক্ষেত্রে সন্তানের সংখ্যা ২০০-র বেশি দেখানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এমন তিনটে ঘটনা সামনে এসেছে, আর তিনটেতেই দেখা গিয়েছে ধর্মীয় আশ্রমের গুরুজিকে বাবা বলে লেখা হয়েছে ওই দলিলে। কে করলেন? ধরে নিলাম ওই মানুষজন বলেছেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি সেটা করবেনই বা কেন? আর যদি করেই থাকেন তো তিন জায়গার ওই শ’চারেক-পাঁচেক লোকজনকে বসিয়ে তথ্য ঠিক করতে কত সময় লাগবে? (২) বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম অথবা ৫০ বছরের বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা লেখার ভুল, ছাপার ভুল। (৩) দাদু বা দিদার সঙ্গে নাতি-নাতনির বয়সের পার্থক্য ৪০ বছরের কম হওয়া, এটাও ওই একই ধরণের ভুল, এগুলো ষড়যন্ত্র করে করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন চাইলে এই কাজ বছর দেড়-দুই ধরে করলে এগুলোকে একেবারে ঠিক করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এখন তড়িঘড়ি করে সবটা করতে গিয়ে এক অভূতপূর্ব সমস্যার জন্ম দিয়েছে কমিশন, আর রাজ্যের মানুষকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তুলেছে, এক সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছে, গণতান্ত্রিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অনেক সময়েই ভোটার কার্ড করার সময় আধিকারিকদের ভুলেও ভুল তথ্য নথিভুক্ত হয়। এই প্রশাসনিক বা পদ্ধতিগত ত্রুটিকে সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেবার কারণ কী?

আর এই টানাপড়েনের এক পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট বাধ্য হয়েই ভোটার তালিকা যাচাই এর Quasi-Judicial বা আধা-বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে তুলে দেবার এক নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কেবল নির্দেশ দিলেই তো হবে না। কার্যকরী করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারকই নেই যারা এই পাহাড়প্রমাণ কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারবেন। ক্যালকাটা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ মামলার শুনানি এখনও বাকি রয়েছে আর এখন নিযুক্ত ২৯৪ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক যদি দিনে ২৫০টা করেও মামলা নিষ্পত্তি করেন, তাহলেও এই কাজ শেষ করতে অন্তত ৮০ দিন সময় লাগবে। অথচ হাতে সময় রয়েছে মাত্র কয়েক দিন। তাহলে? সুপ্রিম কোর্ট তার সংবিধানের দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা (Article 142) ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে অভিজ্ঞ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের পশ্চিমবঙ্গে ডেপুটেশনে নিয়ে আসার অনুমতি দিয়েছে। আদালতের যুক্তি ছিল যে, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ঐতিহাসিক‌, ভৌগোলিকভাবে বাংলার লাগোয়া হওয়ায় সেখানকার বিচারকদের ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক জটিলতা কাটিয়ে কাজ করা সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে কতটা কাজ হবে? ওই ভিনরাজ্যের বিচারকরা কি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের পারিবারিক ইতিহাস, স্থানীয় নথিপত্র যাচাই করে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? এই প্রশ্নটাই এখন সবার সামনে। সবাই জানেন এটা অসম্ভব। তার মানে হয় ৭০-৮০ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়েই নির্বাচন হবে, নাহলে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু হবে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ বলে দিয়েছেন, এই ধরনের কোনও গণ-ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়াকে তিনি বা তাঁর দল মেনে নেবে না।

কাজেই এবার মুখোমুখি সংঘর্ষ আসন্ন, একটা শো-ডাউনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা। পশ্চিমবঙ্গের এই বিধানসভার মেয়াদ ২০২৬ সালের ৭ মে শেষ হতে চলেছে। ভারতীয় সংবিধান বলছে, বিধানসভার মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি বাড়ানো যায় না, যদি না জরুরি অবস্থা জারি থাকে। অন্যদিকে, সেই আইনই বলছে, দুই বিধানসভা অধিবেশনের মধ্যে ৬ মাসের বেশি গ্যাপ থাকা চলবে না। অর্থাৎ ৭ মে’র মধ্যে নতুন সরকার গঠিত না হলে রাজ্যে এক সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। কী হবে? রাষ্ট্রপতি শাসন? যে বোকা এরকম এক সম্ভাবনা কে উসকে দিচ্ছে সে জানেও না কত বড় আগুন ছড়াবে বাংলা জুড়ে। দিল্লির রাজনীতির চাপ বনাম রাজ্যের সার্বভৌমত্বের লড়াই এখন পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে। “বাংলা এক নতুন রাজনীতিক বাঁকের মুখে”— এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here