ওয়েব ডেস্ক : বাঙালির দুর্গাপুজো (Durga puja) মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশভুজা দেবীর ছবি। কিন্তু দুর্গার হাতের সংখ্যা যে সবসময় ১০ ছিল, এমনটা বলছে না ইতিহাস বা পুরাণ। বরং বিভিন্ন সময়ের প্রতিমা ও শাস্ত্রীয় বর্ণনায় দেবীর একাধিক রূপের সন্ধান পাওয়া যায়। কোথাও চার হাত, কোথাও আট বা আঠারো, আবার কোথাও ৩২ হাতের দুর্গামূর্তিরও নিদর্শন রয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি সরকারি বিজ্ঞাপনে ১১ হাতের দুর্গার (Ma Durga) ছবি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সেই সূত্রেই সামনে এসেছে দেবীর হাতের সংখ্যা নিয়ে পুরনো নানা তথ্য। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, ৩, ৫, ৭ কিংবা ১১ হাতের দুর্গার সন্ধান মেলেনি। বরং বিভিন্ন নিদর্শনে জোড় সংখ্যার হাতই দেখা গিয়েছে। দুর্গার পরিচিত দশভুজা রূপের পিছনে দেবতাদের অস্ত্রদানের গল্পটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু ‘দেবীমাহাত্ম্য’-এর বর্ণনায় দেবীর রূপ আরও বৈচিত্র্যময়। সেখানে অষ্টভুজা, দশভুজা এবং আঠারোভুজা—তিন ধরনের রূপের উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধের সময় দেবী সহস্র বাহু ধারণ করেছিলেন বলেও বর্ণনা রয়েছে।
আরও খবর : UPI Payment Limit: ১ লক্ষ নয়, ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত! কোন কোন পেমেন্টে কত সীমা জানেন?
দেবীর হাতে অস্ত্রের সংখ্যার সঙ্গেও এই বৈচিত্র্যের যোগ রয়েছে। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, বিভিন্ন দেবতা তাঁদের নিজস্ব অস্ত্র ও শক্তি দেবীর হাতে তুলে দেন। ত্রিশূল, চক্র, বজ্র, শঙ্খ, পাশ, ধনুক, বর্শা, দণ্ড, তরবারি থেকে শুরু করে আরও নানা অস্ত্র ছিল সেই তালিকায়। তাই ১০ জন দেবতা ১০টি অস্ত্র দিয়েছিলেন বলেই দেবীর ১০ হাত—এমন সরল হিসাব শাস্ত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও মিলেছে নানা ধরনের রূপ। প্রত্নতত্ত্ববিদ শুভ মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজস্থানের নাগর থেকে পাওয়া প্রাচীন মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিতে রয়েছে চারটি হাত। আবার উত্তর দিনাজপুরের বেতনা থেকে ৩২ হাতের দুর্গামূর্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ১২, ১৬ এবং ১৮ হাতের দেবীমূর্তিরও একাধিক নিদর্শন রয়েছে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আজকের দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে পুরাণের বর্ণনা সবসময় এক নয়। মহিষাসুরবধের কাহিনিতেও অস্ত্র ব্যবহারের বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও দেবীর বর্শার আঘাত এবং পরে তরবারি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আবার মহাভারতের বর্ণনায় মহিষাসুরকে কার্তিকেয় বা স্কন্দ বধ করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
পুরাণবিশারদদের ব্যাখ্যায়, দেবীর বহু হাত আসলে তাঁর অসীম শক্তির প্রতীক। হাত যত বেশি, অস্ত্রের প্রকাশও তত বেশি—অর্থাৎ শক্তির বহুমাত্রিক রূপকে মূর্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা। সেই কারণেই হাতের সংখ্যা ২ থেকে ৩২ কিংবা সহস্র হলেও মূল ভাবনায় বদল আসে না। তবে বাংলায় দশভুজা দুর্গাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শাস্ত্রের রণচণ্ডী রূপের সঙ্গে বাঙালির কল্পনায় যুক্ত হয়েছে সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসা মায়ের আবেগ। তাই বাংলার দুর্গাপ্রতিমা শুধু একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সংস্কৃতি, অনুভূতি এবং উৎসবের নিজস্ব পরিচয়।
