নদীয়া: বাঙালির পারিবারিক উৎসবের তালিকায় জামাই ষষ্ঠীর (Jamai Sasthi 2026) গুরুত্ব বরাবরই আলাদা। তবে নদীয়ার শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী বড় গোস্বামী বাড়িতে এই উৎসবের রূপ একেবারেই ব্যতিক্রমী। এখানে জামাই ষষ্ঠীর কেন্দ্রবিন্দু কোনও রক্তমাংসের জামাই নন, বরং পরিবারের ‘জামাই’ হিসেবে পূজিত হন স্বয়ং শ্রীশ্রী রাধারমণ জিউ। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই প্রথা আজও সমান নিষ্ঠায় পালন করে চলেছেন গোস্বামী পরিবারের সদস্যরা।
বড় গোস্বামী বাড়ির সদস্য অদ্রিপ গোস্বামী জানান, এই বিশেষ উৎসবের পিছনে রয়েছে এক প্রাচীন ইতিহাস। বহু বছর আগে বাড়ির আরাধ্য রাধারমণ জিউ বিগ্রহটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। পরিবারের জ্যেষ্ঠা বধূ ও প্রবীণ মহিলারা কঠোর ব্রত ও প্রার্থনার মাধ্যমে সেই বিগ্রহ পুনরুদ্ধার করেন বলে বিশ্বাস।
পরবর্তীতে পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ভাগবত পুরাণ পাঠ করে উপলব্ধি করেন, শ্রী রাধিকার সান্নিধ্যের অভাবেই রাধারমণ জিউ যেন কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেই উপলব্ধি থেকেই অষ্টধাতুর শ্রী রাধিকা বিগ্রহ নির্মাণ করে রাধারমণের পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরিবারের বিশ্বাস, এর মাধ্যমেই সম্পূর্ণতা পায় তাঁদের আরাধ্য যুগলের মিলন।
অদ্রিপ গোস্বামীর কথায়, এই পূজা সাধারণ রাধাকৃষ্ণ পূজার থেকে আলাদা। পরিবারের সদস্যদের মতে, কলিযুগে তাঁরা যেন রাধাকৃষ্ণের বিবাহের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই কারণেই রাধারমণ জিউকে বাড়ির জামাই হিসেবেই গণ্য করা হয় এবং জামাই ষষ্ঠীর সমস্ত লৌকিক রীতি তাঁর জন্য পালন করা হয়।
উৎসবের দিনে পরিবারের সদস্যরা জামাইয়ের জন্য বিশেষভাবে হাতে পাখা তৈরি করেন এবং রাধারমণ জিউকে সেই পাখা দিয়ে হাওয়া করেন। জামাইয়ের জন্য থালা সাজিয়ে নানা প্রসাদ নিবেদন করার রীতিও বহু প্রাচীন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে পরিবেশ ও সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলেও বড় গোস্বামী বাড়ির এই জামাই ষষ্ঠী আজও স্থানীয় মানুষের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। ধর্মীয় আচার, পারিবারিক আবেগ এবং বৈষ্ণব সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধন এই উৎসবকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
অদ্রিপ গোস্বামীর মতে, “এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। আগামী দিনেও আমরা এই প্রথা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।”
