আজ ১২ই এপ্রিল ২০২৬ সন্ধে সাতটা বেজে এক মিনিটে, বিবিসি লাইভ জানাল, ইরানের ডেপুটি স্পিকার বলেছেন, হরমুজ প্রণালী পার করতে গেলে টোল দিতে হবে। ছোট্ট একটা কথা, ‘টোল দিতে হবে’। কিন্তু এর মানে হল, ইরান-মার্কিন যুদ্ধ কোথায় গড়াবে, তা নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হল না। হ্যাঁ, ঠিক এটাই হয়েছে। ২১ ঘন্টা টানা বৈঠক। মানে প্রায় গোটা একটা দিন। কিন্তু তার পরেও কোন সিদ্ধান্ত নেই। অথচ বৈঠকে রওনা হবার সময়, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে কিন্তু যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল। ভান্স জানিয়েছিলেন তিনি ইরানকে রেড লাইন দিতে চাইছেন। আমরা ট্রাফিকের রেড লাইট জানি, কমিউনিস্ট পার্টির ‘রেডবুক’-এর কথা জানি, কিন্তু ‘রেড লাইন’? না, সেটা সম্ভবত ভান্সই জানেন। কিন্তু ভান্সের সেই রেড লাইন কোন কাজেই আসেনি। সোজা বাংলায় আমেরিকার সামনে ঘাড় নোয়ায়নি ইরান।
কিন্তু কি চেয়েছিল আমেরিকা? আমেরিকার শর্ত ছিল, ইরানকে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। হরমুজ প্রণালী মুক্ত করে পন্যবাহী নৌচলাচল নিশ্চিত করতে হবে। আমেরিকার দাবি, এর থেকে ভালো শর্ত আর হতে পারে না। সে তো বটেই। বাবুমশাইরা ব্যবসা করবেন, হাত খুলে ব্যবসা করবেন, এবং তাতে কোনও রকমের বাধা পড়বে না, এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? দাঁড়ান, হয়তো ঠিক বোঝাতে পারলাম না। খুলে বলি। আমি কিন্তু হরমুজ প্রণালীর কথা বলছি না। এই হরমুজ দিয়েই ইরান থেকে তেল আসে ভারতে, চীনেও। কিন্তু এসব ছোটখাটো ব্যবসা নয়। কোনও কোনও মহলের বক্তব্য, আমেরিকা আসলে যেটা চাইছে, সেটা হচ্ছে ইরানের ইউরেনিয়াম ভান্ডার। পাল্টা কী বলছে ইরান? ইরানের শর্ত, যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানের সার্বভৌমত্ব, অধিকারকে প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। এছাড়াও তারা জানিয়েছে, আমেরিকার দাবিগুলোকে ইরান একতরফা ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলেই মনে করেছে।
বোঝাই যাচ্ছে যে যুদ্ধবিরতি গোটা দুনিয়াকে শান্তি দিয়েছিল, খবরের কাগজে হেডলাইন হয়েছিল, ‘অল কোয়াইট ইন দ্যা মিডল ইস্টার্ন ফ্রন্ট’। গ্যাসের ঝামেলা মিটবে বলে হাঁফ ছেড়েছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি- সেই সমস্যাটা শেষ হতে হতেও হল না। ঠিক কি হল তবে? ইসলামাবাদে একুশ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক থেকে কোনও সমাধান মেলেনি। আমেরিকা বলেছে শর্তে রাজি হয়নি ইরান। ইরানের দাবি, একটু বেশি কিছুই চাইছে আমেরিকা। বৈঠকের শেষে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স বলেছেন, যা হল, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ইরানেরই বেশি ক্ষতি হবার সম্ভাবনা। সোজা কথায় হুমকি?
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | যুদ্ধবিরতি, মুখ পুড়ল ট্রাম্প, মোদির
আসুন, একটা ছোট সফর করি। ধরে নিন হাতের কাছেই একটা টাইম মেশিন আছে। সেটাই উঠে পড়ি চলুন, শুরু করি টাইমট্রাভেল বা সময় সফর। কোথায় যাব? থুড়ি, কোন সময়ে যাব? ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এবার মনে করুন আমরা সেই সময়ে এসে গিয়েছি। কী দেখছেন? ওই যে, হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে আলেকজান্ডার ঢুকছেন ভারতে। ইতিহাস বলছে, এই এলাকার বিভিন্ন জাতি ও পার্বত্য উপজাতিরা দুদ্ধর্ষ যোদ্ধা এবং অত্যন্ত স্বাধীনতাপ্রিয়। কারা? এর মধ্যে পড়ছে আফগানিস্তান, পাকিস্তানের কিছুটা এবং ইরানও কিন্তু হিন্দুকুশের খুব কাছেই। দ্বিগবিজয়ী আলেকজান্ডারও এদেরকে দমিয়ে দিতে পারেননি। এরা গ্রিকবাহিনীর সঙ্গে সমানতালে যুদ্ধ করে গেছে। কারন একটাই, স্বাধীনতা। আমেরিকাও নাকি স্বাধীনতার দেশ। কিন্তু কী বলছে তাদের ইতিহাস? কোথায় গেল রেড ইন্ডিয়ানরা? কোথায় গেল তাদের জমি জায়গা? ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সেই ইতিহাস জানেন? ইরানের সঙ্গেও কি এরকমই কিছু একটা করতে চাইছে মার্কিন সরকার? ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সে কথা মানেন? নাকি বিশ্বের সামনে শান্তির দূত হয়ে দেখা দিতে চাইছেন?
শান্তির কথাই যখন উঠল, তাহলে বলি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতিতে, এবং তার পরেও ইসলামাবাদের বৈঠকে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে কিন্তু দুনিয়া জুড়ে প্রশংসার কথাই শোনা যাচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি? এর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু সেখানে পাকিস্তানের নাম উচ্চারণ করা হয়নি। পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিল, সেই সময় থেকেই কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেছিল বিরোধীরা। তারা একে সরাসরি ‘কূটনৈতিক আঘাত’ বলে আখ্যাও দিয়েছিল। অন্যদিকে, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন ভারত ‘ব্রোকার নেশন’, সোজা বাংলায় দালালি করে এমন দেশ বা মিডলম্যান হতে চায় না। শুধু বিরোধী দলেরাই নয়। মুখ খুলেছেন কিন্তু আরও অনেকেই। যেমন প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরূপমা মেনন রাও। এক্স-এ তিনি জানিয়েছেন, ভারতের নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার।’ পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন, “ভারতের উচিত সুস্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানানো। উত্তেজনা প্রশমনকে সমর্থন করা, সমুদ্রপথে নেভিগেশনকে রক্ষা করা।…. এটা নীরব থাকার মুহূর্ত নয়।’
কিন্তু চুপ করে থাকতে চাইলেই কি থাকা যায়? আমেরিকা চাইছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে, তাহলে টান পড়বে ভারত আর চীনের তেলে। মার্কিন কূটনৈতিক চাল হল, এবার ভারত আর চীনকে দিয়ে ইরানের উপর চাপ তৈরি করা। কিন্তু সে চেষ্টা কতদূর সফল হবে বলা যায় না। কেন না ইসলামাবাদের বৈঠক সিদ্ধান্তহীন ভাবে শেষ হবার পরেই, রাশিয়ার তরফে আসরে নেমেছেন খোদ ভাদিমির পুতিন। হ্যাঁ, পুতিনও শান্তি চান। বড় মাপের খেলা সন্দেহ নেই। কী হবে তারপর? এখনও আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু মোদিজি যে বিশ্বগুরু হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থ এ কথা সকলেরই মোটামুটি জানা হয়ে গেল।
দেখুন আরও খবর:
