অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘‘৩০ হাজার ফর্ম-৬ জমা পড়েছে। কমিশনের নিয়ম মেনে ৩০ হাজার ফর্ম-৬ জমা পড়লে কমপক্ষে ৬০০ জনকে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়। আমরা ২৪ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনতে বলেছি কমিশনকে। তাহলেই তো সব স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কমিশন সদুত্তর দিতে পারেনি।’’ এই ‘ফর্ম সিক্স’টা ঠিক কী? দু’ধরণের ভোটারেরা তাঁদের নাম ভোটার তালিকাতে তোলার জন্য এই ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিতে পারেন- এক, যাঁরা প্রথম বারের মতো ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করছেন। দুই, যাঁরা এক সংসদীয় বা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে অন্য কোনও কেন্দ্রে স্থায়ীভাবে চলে গিয়েছেন। এক্ষেত্রে অভিযোগ খুব পরিস্কার, একজন মানুষ ৫০টার বেশি ফর্ম সিক্স জমা দিতে পারে না, এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে অনলাইনে নয়, সরাসরি ফর্ম সিক্স জমা করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন কমিশনের দরজায়, করিডোরে সিসিটিভি আছে, সেগুলো সামনে আনা হোক, কারণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, বিভিন্ন কেন্দ্রে এভাবেই প্রচুর ভুয়ো ভোটারকে ঢোকানো হচ্ছে, এনারা আবেদন করবেন, এনাদের নাম তালিকাভুক্ত হবে, ভোটার কার্ড থাকবে, আর এনারা সেই কেন্দ্রে ভোট দেবেন। তো এরকম এক সাংঘাতিক অভিযোগের সামনে নির্বাচন কমিশন তো বলতেই পারতো যে, বেশ তো এই দেখুন সিসিটিভি ফুটেজ, আপনি অসত্য কথা বলছেন, রাজ্যজুড়ে মিডিয়াতে সেই প্রচার চলত। এমন তো নয় যে, পাড়ার মোড়ের কোনও হরিদাস পাল এই অভিযোগ করেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, লোকসভাতে দলের নেতা এই অভিযোগ করছেন, না নির্বাচন কমিশন এখনও পর্যন্ত কোনও জবাব দিয়ে উঠতে পারেননি। সেটাই বিষয় আজকে। এবারে বাইরে থেকে ভোটার এনে ভোট করাবে নির্বাচন কমিশন।
এক্কেবারে শুরুতে কমিশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা বাংলা ভাষাতে করা হবে, আমরা একটু অবাকই হয়েছিলাম, ওনারা বলেছিলেন, এটা করা হচ্ছে যাতে সাধারণ মানুষের বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু পরে দেখা গেল, এই তথাকথিত ভাষাগত সারল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল প্রশাসনিক প্যাঁচালো জটিলতা, যা প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পুরো বিষয়টা আপাতত খুব সাধারণ নজরে দেখা হলে বলাই যায় যে, এটা ছিল একটা বরাত বা ‘কন্ট্রাক্ট’ কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যে, রাজ্য থেকে বর্তমান সরকারকে সরাতে হবে, যে কোনও মূল্যে, ওনারা মন দিয়ে সেই কাজটা করে চলেছেন, কিন্তু মজার কথা হল প্রতিটা পদক্ষেপে চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিচ্ছেন, যার ফলে ওনাদের আসল উদ্দদেশ্য, আসল চেহারাটা সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হবার আগে রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের খসড়া তালিকায় এই সংখ্যা কমে দাঁড়াল ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০-এ। মানে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার নাম স্রেফ খসড়া স্তরেই ছেঁটে ফেলা হয়। এরপরে দিল্লি বলল, ‘অ্যাইইইইইইই’, অমনি সামনে এল ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’, এর ফলে ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় ফেলে দেওয়া হল।
আরও পড়ুন: Aajke| মনোনয়ন দিলেন শুভেন্দু, সঙ্গে দিলীপ ঘোষ। জিতবেন?
এই বিচার প্রক্রিয়াটার মধ্যে মজার ব্যাপার হল সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশ, যে পশ্চিমবঙ্গের এই বিশাল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা থেকে বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করা হবে। প্রশ্ন ওঠা তো স্বাভাবিক যে, ওড়িশা বা ঝাড়খণ্ডের বিচারকরা কি বীরভূমের গ্রাম্য বাংলা বা মালদহের আঞ্চলিক টান আদৌ বুঝতে পারবেন? কোর্ট যুক্তি দিয়েছিল যে, ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি থাকা রাজ্য বলেই তারা কিছুটা বুঝতে পারবেন। এর পরে যা হবার তাই হয়েছে, ৪৮ লক্ষ বিচারাধীনের বিচার হয়েছে, তথ্য জানা যাচ্ছে, যে কমসম করে সেখানেও বাদ পড়েছেন ১৮ লক্ষ। কেবল নাম বাদ দিয়েই তো হবে না, ভোটটাও তো করাতে হবে তাই ১৫ মার্চ ২০২৬-এ ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার ক’ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের শীর্ষ আমলাদের সরিয়ে দেওয়া হল। তালিকায় ছিলেন মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশ প্রসাদ মিনা রাজ্য পুলিশের (ডিজিপি) পীযূষ পাণ্ডে। এর ক’দিন পরেই শুরু হয় জেলা স্তরের সাফাই অভিযান। একের পর এক জেলা শাসক পুলিশ সুপারদের সরিয়ে কমিশন তাদের পছন্দের আধিকারিকদের বসাতে থাকে। এবারে ওসিদের বদল চলছে, এবারে নিশ্চই হাবিলদারদের পালা আসবে। আসলে ওনারা বুঝতেই পারছেন না যে, ঠিক কী করলে মমতা হারছেই, তৃণমূল হারছেই এরকম একটা আবহাওয়া তৈরি করা যাবে, সেই হাওয়াটা তৈরি করা যাচ্ছে না। ওনারা রোজ ধ্যাড়াচ্ছেন, ফর্ম সিক্স দিয়ে সমস্ত হিসেব গুবলেট করার তালে ছিলেন, সেটাও ধেড়িয়েছেন। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা, বিচারাধীন রাখা, নো ম্যাপিংয়ের ফলে নাম কাটা, এবং শেষ মেষ ফর্ম সিক্স দিয়ে ভুয়ো ভোটার ঢুকিয়ে নির্বাচন কমিশন এই রাজ্য থেকে তৃণমূল তাড়ানোর চেষ্টা করছে। কতটা সফল হবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
সব চলছে সেই দিল্লি প্রভুদের ইচ্ছায়, তাদের নির্দেশেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, তাদের নির্দেসঝেই বিচারাধীন, তাদের নির্দেশেই ঢালাও বদলি, তাদের নির্দেশেই নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকেই রুট মার্চ, এবং তাকিয়ে দেখুন সেই পুরাতন অনুগত ভৃত্যের মতনই নির্বাচন কমিশন সেসব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন, কিন্তু সমস্যা হল মানুষকে নিয়ে, ভোটারকে নিয়ে, রাজ্যের ভোটারদের বাদ দিয়ে বাইরে থেকে ভোটার আমদানি করেই একমাত্র ওই দখলদারি সম্ভব, না হলে সম্ভব নয়। এবং আরও বড় সমস্যা হল, এবারে এত কিছু করার পরেও যখন দেখবেন সেই হিসেব মিলল না, তখন পরের নির্বাচনে করবেন টা কী? সব অস্ত্র তো বার করে ফেলেছেন, এর পরের বার প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে হবে।
দেখুন আরও খবর:

