পূর্ব বর্ধমান- দারিদ্র্যকে (poverty) হার মানিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে (High Secondary) রাজ্যের নবম (9th) সাগর (Sagar Mondal), জীবিকার তাগিদে এখন গুজরাটে হোটেল কর্মী। দারিদ্র্য, অভাব আর প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের নবম স্থান অর্জন করল পূর্ব বর্ধমানের (East Burdwan) কালনা (Kalna) মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সাগর মণ্ডল। নৃসিংহপুরের মেঠডাঙ্গা বড়ডাঙ্গা পাড়ার বাসিন্দা সাগরের এই সাফল্যের গল্প এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে বহু ছাত্রছাত্রীর কাছে।
উচ্চমাধ্যমিকে সাগরের প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮। কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের কাহিনি। সাগরের বাবা গুজরাটের একটি হোটেলে ঝাড়ু-পোঁছার কাজ করেন। মা হাসপাতালের সাফাইকর্মী। সংসারের অভাবের কারণে মাধ্যমিকের পর থেকেই গ্রামের বাড়িতে একাই থাকত সাগর। নিজে রান্না করে, পড়াশোনা সামলে এগিয়ে গিয়েছে সে।
মাধ্যমিকে ৬৪৬ নম্বর পেয়ে কালনা মহারাজা স্কুলে ভর্তি হয় সাগর। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করলেও টিউশনের খরচ জোগানোর সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। সেই সময় পাশে দাঁড়ান স্কুলের শিক্ষকরা। কেউ কম ফিতে, কেউ আবার অর্ধেক মাইনেতে পড়িয়েছেন তাকে।
আরও পড়ুন- উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম আদৃত পালকে ফোনে শুভেচ্ছা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, দেওয়া হবে সংবর্ধনা
বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর সাগর রয়েছে গুজরাটে। ভবিষ্যতে আইএএস হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দিল্লিতে কোচিং করার ইচ্ছা থাকলেও অর্থাভাব এখন বড় বাধা। তাই বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে একটি হোটেলে কাজ করছে সে। মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করে ভবিষ্যতের পড়াশোনার জন্য টাকা জমাচ্ছে।
সাগর মণ্ডলের বক্তব্য।
“আমি সাগর মণ্ডল। কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এ বছর উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের মধ্যে নবম স্থান অর্জন করেছি। বাড়িতে আমি একাই থাকতাম। মা-বাবা কর্মসূত্রে গুজরাটে থাকেন।
আমি নিজে রান্না করে খেয়ে পড়াশোনা চালিয়েছি। প্রতিদিন ৭-৮ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতাম। বাড়ি ফিরে রান্না করতাম, তারপর টিউশন ও স্কুল সামলে যতটা সময় পেতাম পড়াশোনা করতাম। অন্য কোনো দিকে মন দিইনি। নিয়মিত শরীরচর্চাও করতাম।
এই ফল পেয়ে আমি খুব খুশি। পরিবারও খুশি হয়েছে। এখন গুজরাটে আছি। আগামী দিনে আইএএস হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।”
প্রধান শিক্ষক স্কুলের প্রধান শিক্ষকমিলন মান্ডি বলেন, “এটা ছাত্রদের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফল। আমাদের স্কুলের সুনামের কারণে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালো ছাত্ররা এখানে ভর্তি হয়। শিক্ষকদের নিষ্ঠা ও ছাত্রদের পরিশ্রম মিলিয়েই এই সাফল্য এসেছে।”
সাগরের আর্থিক সমস্যার প্রসঙ্গে তিনি জানান, “ওর অদম্য জেদই ওকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে। দারিদ্র্য কখনও সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না, যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে। স্কুলের প্রাক্তনী সংগঠন, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষকরা মিলে আর্থিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।”
এছাড়াও তিনি বলেন, “একসময় মনে করা হত শুধু বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই বড় রেজাল্ট করা যায়। এখন কলাবিভাগ থেকেও পূর্ণ নম্বর পাওয়া সম্ভব। সাগর তারই বড় উদাহরণ।”
এ বছর স্কুল থেকে ২১৫ জন পরীক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক দেয় এবং সকলেই উত্তীর্ণ হয়েছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক। তাঁর কথায়, “অবিভক্ত বর্ধমান জেলার মধ্যে এই রেজাল্ট আমাদের কাছে গর্বের বিষয়।”
একদিকে রাজ্যের মেধাতালিকায় নাম, অন্যদিকে জীবিকার জন্য হোটেলে কাজ— সাগর মণ্ডলের এই সংগ্রামী জীবনই আজ বাংলার অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর কাছে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার এক বাস্তব অনুপ্রেরণা।
