গতবারে ছিলেন ডেইলি প্যাসেঞ্জার, এবারে হলেন ভাড়াটে। হ্যাঁ, অমিত শাহ জানিয়েছেন, তিনি নাকি এই বঙ্গালে এখন দিন ১৫ ঘাঁটি গেঁড়ে বসে থাকবেন। মনে পড়ে যাচ্ছে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযানের কথা। এমনিতেই সঠিক ইতিহাস আরএসএস–বিজেপি জানে না, জানার চেষ্টাও করে না, তাই ওনাদের এবং আপনাদের ওই অভিযান নিয়ে কটা কথা জানিয়ে রাখি। অভিযানের লক্ষ্য: দাক্ষিণাত্যের শিয়া সুলতানি বিজাপুর, গোলকোন্ডা ধ্বংস করা, মারাঠা নেতা শিবাজি আর তাঁর বংশধরদের দমন করা এবং অবশ্যই মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানো। তো ১৬৮৬ সালে বিজাপুর, আর ১৬৮৭ সালে গোলকোন্ডা জয় করলেন আওরঙ্গজেব, কিন্তু স্থানীয় জমিদার, ছোট ফৌজের সেনাপতি ইত্যাদিদের অসহোযোগিতায় রাজত্ব চালাতে পারেননি, ফলে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওদিকে শিবাজির মৃত্যুর পর মারাঠারা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়, যা মুঘল বাহিনীকে ক্লান্ত, বিপর্যস্ত করে তোলে। আর প্রায় আড়াই দশক ধরে যুদ্ধের ফলে মুঘল রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়, শাসনকার্যে অবহেলা দেখা দেয়, ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলাফল: ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দাক্ষিণাত্যে মুঘল নিয়ন্ত্রণ এক্কেবারে মায়ের ভোগে, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথ প্রশস্ত করে। হ্যাঁ, আমরা অনেকেই এই ইতিহাস আমাদের মাধ্যমিকেই পড়েছি। সেই দাক্ষিণাত্য অভিযানের সময়ে আওওরঙ্গজেব নিজেই গিয়েছিলেন, কেন? কারণ ওনার মনে হয়েছিল ওনার সেনাপতিরা ঠিকঠাক লড়াই দিতেই পারছে না, গেলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি, উনি দিল্লিতে ফিরেই অসুস্থ হলেন, আর মারা গেলেন। হ্যাঁ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হতাশাও ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। তো অমিত শাহের এই ১৫ দিনের ঘাঁটি গেঁড়ে বসা শুনেই প্রথমে ওই আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযানের কথাই মনে পড়ল। সেটাই আজ বিষয় আজকে, ভোটের আগে ১৫ দিন, ভোটের পরে কতদিন থাকবেন অমিত শাহ?
মনে পড়ছে সুকুমার রায়ের কবিতা, ‘বিদ্যে বুদ্ধি’? ‘বলছি মশাই— / ধন্যি ছেলের অধ্যবসায় ! / উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে / ঘায়েল হয়ে থামল শেষে’। ২০১৯-এ শুরু করেছিলেন অমিত শাহ তাঁর বঙ্গ বিজয় অভিযান, কড়া-নাকাড়া, ঢোল-বাদ্য নিয়ে বলেছিলেন ‘অবকি বার মোদি সরকার’, বিশাল আওয়াজের পরে বামের ভোট রামে যাওয়ার জন্যেই ১৮টা আসনও পেয়েছিলেন। তার পর থেকে ক্ষয়, ২০২১-এ বলেছিলেন ২০০ পার, সে কি লম্ফঝম্প! সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মুরলিধর লেনে মন্ত্রিসভার মুখ, মুখ্যমন্ত্রী মুখ নিয়ে কত্ত আলোচনা, উনি সেবারও বার বার এসেছিলেন, আলুপোস্ত দিয়ে যার বাড়িতে রুটি খেয়েছেন, সেখানে পরে আর যাননি, শেষমেষ ৭৭-এ ব্রেক কষেছে ওনার হুঙ্কার। ২০২৪-এ আবার অন্য কোনওখানে, ‘অবকি বার মোদি কি সরকার চারশো পার’, কিন্তু সেসব করার পরে তার আগের বারে ১৮ ধরে রাখতে পারলেন না, কমে ১২ হয়ে গেল। ২০১৯-এ তৃণমূল ৪৩ শতাংশ, বিজেপি ৪০ শতাংশ, ২০২১-এর বিধানসভাতে তৃণমূল ৪৮ শতাংশ, বিজেপি ৩৮ শতাংশ, ২০২৪-এ তৃণমূল ৪৫.৮ শতাংশ, বিজেপি ৩৮.৭ শতাংশ। কেবল এই রাজ্যে নয়, কেন্দ্রে মোদিজি আসার পরে প্রত্যেক রাজ্যের বিধানসভার তুলনায় লোকসভায় বেশি ভোট পেয়েছে।
আরও পড়ুন: Aajke | বিজেপি যে খেলায় নেমেছে, তা ভয়ঙ্কর
তো সেই তৃণমূল যারা ২০২১-এ ৪৮ শতাংশ ভোট পেল, ২০২৪-এও যারা ৪৫ শতাংশ ভোট পেল, তাদের ভোট এই দেড় বছরে কমার মতো কোন এমন ঘটনা ঘটেছে? অন্যদিকে ২০২১-এ যে বিজেপি ৩৮ শতাংশ ভোট পেল, ২০২৪-এ যারা ৩৮ শতাংশ ভোট পেল, তারা হঠাৎ করে তাদের ভোট বিশাল বাড়িয়ে নেবার মত কী করেছে? রাজ্যে এমন কী হয়েছে, যাতে শাসক দলের ভোট অনেকটা কমবে বা বিরোধী দলের ভোট অনেকটা বাড়বে? উনিজি এসে ‘ঘুসপেটিয়া’ বলে চেল্লাবেন, অমিতবাবু এসে ১৫ দিন আশ্রম খুলে বসে থাকবেন, তাতেই হয়ে যাবে? আপনাদের বলছি, হ্যাঁ আপনাদেরই বলছি, চোখ বুজে একবার ভাবুন তো, গত পাঁচ বছরে বিজেপি রাস্তায় নেমে কোন আন্দোলনটা করেছে? এই পুরো পাঁচ বছর ধরে তারা ইডি পাঠিয়েছে, সিবিআই পাঠিয়েছে, নেতা-মন্ত্রীদের জেলে পুরেছে, তার পরে জামিন দিয়েছে, একটা মামলাতেও এই রাজ্য সরকারের মাথাকে জেলে নিয়ে যাবার মত কোনও অবস্থাও কি তৈরি করা গিয়েছে? উলটে ইডি রেইড চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী গটগট করে ঢুকেছেন কাগজ নিয়ে চলে গিয়েছেন, ওপেন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন, ‘কী করবি কর’। এই অমিত শাহের বাহিনীর সাধ্য হয়নি কিছু করার, ওনারা আবার মামলাই করেছেন। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আগের বার অমিত শাহ এই বাংলাতে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন, ৭৭-এ থেমেছিলেন, এবারে বলছেন ১৫ দিন বাংলাতেই থাকব, তাতে কি খুব একটা লাভ হবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আওরঙ্গজেব তাঁর শেষ জীবনে এত হতাশ কেন হয়েছিলেন? ঐতিহাসিকরা বলছেন, মূলত দু’টো কারণে- (১) আসলে তিনি তাঁর আশেপাশের সেনা প্রধানদের উপরে আর ভরসা রাখতে পারছিলেন না, কারণ বারবার অভিযান থেমে যাচ্ছিল, প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছিল, কিন্তু দখল তো দুরের ব্যাপার, দখল করা রাজ্যও হাত থেকে চলে যাচ্ছিল। হ্যাঁ, বাংলাও সেই তালিকাতেই ছিল। (২) তাঁর উত্তরাধিকারিরা ছিল আয়েসি, ফুর্তিবাজ, লম্পট আর দায়িত্বজ্ঞানহীন। কাজেই কার হাতে দিয়ে যাবেন এই সাম্রাজ্য, সেটা ভেবেই তিনি হতাশায় ডুবে যেতেন। অমিত শাহের বাহিনী এই বাংলাতে এসে প্রথমেই বলেছেন, ‘ফ্লাগ চান? ফেস্টুন চান? ব্যানার চান? দেবো, ক্যাশ টাকা দেবো না’, এটা শুনেই নাকি বহু প্রার্থী বলেছেন, ‘তাহলে মরতে লড়বটা কেন?’ কিন্তু সেসব তো ওনাদের দলের ব্যাপার। আমাদের প্রশ্ন হল, ভোটের আগে ১৫ দিন থাকতে আসছেন স্বাগত, আমরা অতিথি সৎকার করতে জানি, কিন্তু ভোটের পরে ক’দিন থাকবেন না? এক্কেবারে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখেই ফিরলে কেমন হত?
দেখুন আরও খবর:

