‘শীতল শীতল পরের কথা…’ মানুষ মাত্রেই মনের জানলা খুলে রেখে দেয়, কখন পড়শির অন্দর মহলের কথা নিজের শোওয়ার ঘরে সিঁদ কেটে ঢুকে পড়ে। তা না হলে দুই বা তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নিয়ে কাদা চটকাচটকিতে আমরা কেন উৎসাহী হব! অথচ, তাই চলছে, আর আমাদের সেই পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহ শুনতে বা দেখতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে, আমরা চরিত্রগতভাবে কেচ্ছা শুনতে-দেখতে ভালোবাসি। বিশেষত তাতে যদি কাঁচামিঠে আমের মতো নারীচরিত্র ‘পরকীয়া’ সঙ্গত দেয়, তাহলে তো জিভ দিয়ে লালা ঝরবেই। দেশের আইন-পুঁথিগুলো যাই বলুক না কেন, আমরা তখন প্রগতিশীলতা, উত্তর আধুনিকতা, শিক্ষার উদগ্র অহম, সবই ভুলে যাই। মস্তিষ্কের তলদেশ থেকে দাঁতনখ দেখিয়ে যা উলঙ্গরূপে বেরিয়ে আসে, তার নাম পুরুষতান্ত্রিকতা। সে কারণেই সীতাকে সতিত্বের প্রমাণস্বরূপ অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। দ্রৌপদীকে পাঁচ স্বামীর স্ত্রী হিসেবে কৌরবসভায় গালিগালাজ শুনতে হয়েছে। রাধার চরিত্রে কলঙ্ক লাগলেও ‘লীলাময়’ দৈবমহিমা লাভ করেছেন।
কেচ্ছা শব্দটির মধ্যে একটা অশ্লীল ইঙ্গিত থাকলেও, মূল শব্দটি ‘কিসসা’ অর্থাৎ কাহিনি থেকে। কথিত যে, আরব অথবা পারস্যে শাহজাদাদের বিকৃত মনোরঞ্জনের জন্য হারেম মহলে এই কিসসার জন্ম। যার সবগুলিই যৌনতা নির্ভর কাহিনি। যা আজকের ‘কেচ্ছা’ রূপে খ্যাত, ইংরেজিতে বলে স্ক্যান্ডাল। এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, ডাবর থেকে সাজা পানের খিলি বার করে মুখে ঠুসে পরবাড়ির গপ্পো ভাজতে একমাত্র আমরাই খেলোয়াড়। অতীতে পুকুর পাড়ে, অধুনা মোবাইল ফোনে দুঃশাসনের মতো সতিত্বের কাপড় ধরে টানাটানিতে আমরাই ‘উড়ন্ত বাঙালি’। গোরাসাহেবরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই। কয়েকটা বড় মানুষের উদাহরণও মনে পড়ছে। যেমন— মেরিলিন মনরো, যুবরানি ডায়ানা, বিল ক্লিনটন ও মনিকা লিউইনস্কি।
আরও পড়ুন:প্রভাসের ছবির মোটা টাকার ডিজিটাল স্বত্ত্ব
মনরোর জীবন, সম্পর্ক, হতাশা-বেদনা-বিষাদ ও আত্মহত্যার কারণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যত কাটাছেঁড়া হয়েছে, সত্যি যদি সেই ময়না তদন্ত হতো, তাহলে তাঁর শরীরের সব কোষ আলাদা করা সম্ভব হতো। তেমনই আর এক নারী ডায়ানা। সম্ভবত মনরোর থেকেও বেশি চর্চিত। বিল-মনিকার যৌন জীবন নিয়ে সেই আমলে ঘটা করে সারা দুনিয়ার সংবাদ মাধ্যমে ঢাক বাজিয়ে খবর হতো। ফলে, কেচ্ছা নিয়ে কচলানি বাঙালির একচেটিয়া মালিকানা নয়। ইউরোপ, আমেরিকাও কেচ্ছা-চর্চায় মোটেই নাবালক নয়। জ্ঞানের পুস্তকের ওজন যতই বাড়ুক না কেন, কেচ্ছা সংক্রান্ত জ্ঞানের পিপাসা তৃতীয় মলাটের মতোই সেঁটে আছে আমাদের জীবনে।
এদেশেও কেচ্ছার কালি থেকে কেউ রেহাই পাননি। সুভাষচন্দ্র, গান্ধী, নেহরু, গিরিশ ঘোষ থেকে মায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্রও বাদ পড়েননি কেচ্ছাপ্রেমীদের সুনজর থেকে। উত্তমকুমার, রাজ কাপুর থেকে শুধু বিখ্যাত মানুষরাই শিকার হয়েছেন তাই নয়, সারদা মামলার অব্যবহিত পরে সুদীপ্ত-দেবযানিকে নিয়েও বাঙালি কম মাথা ঘামায়নি। স্বামীকে খুনে দোষী সাব্যস্ত মনুয়া মজুমদারের পরকীয়া সম্পর্ক নিয়েও ভেতো বাঙালি বেশ কিছুদিন মশগুল ছিল। সব মিলিয়ে আমাদের মনের অবদমিত কামের ব্যর্থ সংরাগের ইচ্ছাই হল অপরের কেচ্ছার প্রতি আসক্তি। সাহস, সামর্থ্য ও যোগ্যতার অভাবে যা আমার দ্বারা করা অসাধ্য, তা অন্য কেউ করলে ঢি-ঢি ফেলে দেওয়াই মনুষ্য-চরিত্র। যেন সমাজ, সংসার সব গোল্লায় গেছে। মধ্যযুগীয় আধাপশু সভ্যতায় অবৈধ বা পরকীয়া সম্পর্কের জন্য যেসব শাস্তি বরাদ্দ ছিল, আজও গ্রামেগঞ্জে তা চালু আছে। যাঁরা ততদূর এগোতে সাহস পান না, তাঁরা কেচ্ছার (সাধুভাষায় লোকলজ্জা) ভয়ে আত্মহত্যাও করেন।
এমনটা তো হওয়ার নয়। বন্দিমৃত্যু, শিশুশ্রম, ভুয়ো সংঘর্ষ নিয়ে যদি মানবাধিকারের প্রশ্ন ওঠে সুশীল সমাজের মনে, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-মহিলার দৈহিক হোক বা মানসিক সম্পর্ক নিয়ে আমরা উদ্বেল হয়ে উঠি কেন? কারণ অবচেতনে নিজের ব্যর্থতার নরম দেওয়ালে নখের আঁচড় কাটে অন্যের কেচ্ছা। মুখে ছিঃ ছিঃ করে মনের ঘায়ে মলম মাখানোর চেষ্টা করি আমরা। সেই ছোটবেলার মতো— একই কোম্পানির দুটো লজেন্স। কিন্তু, ভাইয়েরটা দেখে মনে হতো ওর লজেন্সটা বড়। এখনও সেই ঐতিহ্য বয়ে বেড়াচ্ছি। সবটাই সেই প্রবাদের মতো— ঘোমটার আড়ালে খেমটা নাচ!
আর কবে সাবালক হবো আমরা?