ছন্নছাড়া বললে বোধ হয় কম বলা হয়। নিজেদের দুনিয়ার সর্ববৃহৎ দল হিসেবে জাহির করে বিজেপি। অথচ দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে ভোটে হেরে বস্তুত দিশেহারা। কেউ রাজ্য সভাপতিকে গাল দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। কেউ দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই নিজের মতামত জনসমক্ষে প্রচার করেছিলেন, তাঁকে পুরস্কার স্বরূপ মন্ত্রিত্ব দেওয়া হচ্ছে। যা থেকে স্পষ্ট দলীয় অনুশাসন নিয়ে তাদের সমস্ত ঠাট-বাট বড়াই ক্রমে ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: নিশীথ প্রতিমন্ত্রী হতেই বিদ্রোহ ঘোষণা যুব মোর্চার জেলা সভাপতির
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রদবদলে তাঁর ঠাঁই না হওয়ায় বেজায় চটেছিলেন বিষ্ণুপুরের সাংসদ সৌমিত্র খাঁ। যুব মোর্চার সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার হুমকি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা দেন তিনি।
কেন ইস্তফা ?
নাঃ, মন্ত্রিসভার বিষয়ে কিছু বলেননি সৌমিত্র। তবে বলেছেন বিস্তর। রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষকে এমন খুললাম খুল্লা আক্রমণ করেছেন। রাজ্য সভাপতিকে বস্তুত স্বৈরাচারী বলেছেন। বলে টিকেও রয়েছেন দলে। নজিরবিহীন ঘটনা। পাশাপাশি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুকেও জোর একহাত নিয়েছেন । সোশ্যাল মিডিয়ায় দলের এক শাখা সংগঠনের নেতার এহেন বিস্ফোরণ, অথচ তা নিয়ে কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন বিজেপি নেতৃত্ব। দুপুর বিদ্রোহ, সন্ধ্যায় শেষ। একশো আশি ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে সৌমিত্র নাকি ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁর ইস্তফা। দলের কেন্দ্রীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ম্যানেজ করেছেন বলে শোনা গিয়েছে। আর দিলীপ ঘোষরা হাত কচলিয়ে চলেছেন। মুখ বুজে সব হজম করে যাওয়া ছাড়া তাঁর কোনো উপায় নেই।
আরও পড়ুন: জন বার্লাকে নিয়ে বিড়ম্বনায় শুভেন্দু
পুরো ঘটনাক্রম বলে দিচ্ছে, বিজেপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। তা নাহলে দলের রাজ্য সভাপতিকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করার পরেও কেউ তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারলো না। উল্টে তাঁকে তোয়াজ করে ফের যুব সভাপতির পদে থেকে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন বিজেপির কেন্দ্রীয় এক নেতা। শীর্ষ নেতার নামে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেও শাস্তি নয়। এমনকি সাংগঠনিক স্তরে তাঁকে সতর্ক করা দূরে থাক উল্টে বাবা বাছা করে ধরে রাখা হলো। ভোটের আগেই সৌমিত্রর স্ত্রী সুজাতা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তিনি প্রায়শই বলে থাকেন, স্বামীও তাঁর মতো বিজেপি ছাড়বেন। সেই দাবির বাস্তবতা কতটুকু তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে। কিন্তু ঘরপোড়া বিজেপি, কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। সম্ভবত, তাই সৌমিত্রকে তোয়াজ করা ছাড়া উপায় নেই কেন্দ্রের শাসক দলের।
গত বিধানসভা ভোটে গো-হারা হারার পর থেকেই সংগঠনে চিড় ধরতে শুরু করেছে গেরুয়া শিবিরে। দলের সর্ব ভারতীয় সহ-সভাপতি মুকুল রায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সেই চিড় ক্রমে ফাটলে পরিণত হতে চলেছে। ভোটের মুখে দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে যাঁরা প্রার্থী হয়েও জিততে ব্যর্থ হয়েছেন,তাঁরা লাইন দিয়েছেন তৃণমূলে ফেরার জন্য। এমনকি বিধায়কদের একাংশ দল ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়ার জন্যে গোপনে তৎপরতা শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে স্নায়ুর চাপ বাড়ছে বিজেপির।
তাই ‘যেমন খুশি তেমন সাজো (পড়ুন বলো)’ র মতো সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এখন শিকেয় উঠেছে। সৌমিত্র যেমন মন্ত্রী হতে না পেরে নেতাদের নামে ঝাল ঝাড়লেন, তেমনই বাবুল সুপ্রিয় মন্ত্রিত্ব খুইয়ে তাঁর তির্যক মন্তব্য পোস্ট করে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু আলিপুর দুয়ারের সাংসদ জন বারলার মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তির ঘটনা বেশ চমকপ্রদ। কয়েক সপ্তাহ আগে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিকে নিয়ে আলাদা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবি করে বসেছিলেন বারলা। বঙ্গভঙ্গের উস্কানির বিরুদ্ধে জনরব তৈরি হচ্ছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানিয়ে দিলেন, ওটা বারলার ব্যক্তিগত মতামত। দলের অবস্থান নয়। ব্যাস ওইটুকুই। বারলা বহাল তবিয়তে। দলের অবস্থানের বিরুদ্ধে এমন স্পর্শকাতর মন্তব্য করার পরেও রাজ্য নেতৃত্ব তাঁর টিকি ছুঁতে পারলো না। উল্টে মোদি তাঁকে প্রতিমন্ত্রী করে দিলেন। তাহলে বুঝে নিতে হবে, বারলা যা বলেছেন, তা নিয়ে দিলীপ সাময়িক ড্যামেজ কন্ট্রোল করলেন। অর্থাৎ দলের গোপন এজেন্ডা বাংলা ভাগ। সৎ সাহস নেই তা প্রকাশ্যে বলে ফেলার। একটা সর্বভারতীয় দল যারা দেশ শাসন করছে, তাদের এই রাজনৈতিক ভন্ডামী আজ প্রকট। না হলে বারলাকে দলের লাইন লঙ্ঘনের দায় নিতে হল না, উল্টে প্রথম সাংসদ হয়ে কেন্দ্রের প্রতিমন্ত্রী হয়ে গেলেন। সব মিলিয়ে চরম ছন্নছাড়া অবস্থা বাংলা বিজেপিতে।