অনেকেই জানেন যে, বিজেপি এমন একটা দল, যা টোয়েন্টি ফোর ইনটু থ্রি সিক্সটিফাইভ ইলেকশন মোডে থাকে। হ্যাঁ, একটা ভোট শেষ হলে তারা তার পরের ভোট নিয়ে ঘুটি সাজাতে থাকে। না, বিজেপি যে শুরু থেকেই এমনই ছিল, তা কিন্তু নয়, বিজেপি বা তারও আগে জনসংঘ থাকাকালীন নির্বাচনে গোহারান হেরেছে, কেবল তাই নয়, এমন এক ওয়েল প্ল্যান্ড ইলেকশন মেশিনারি তাদের মাথাতেও ছিল না। এমনকি প্রথমবার যখন এনডিএ-র সরকার তৈরি হল, তখনও ছিল না, যখন ইন্ডিয়া শাইনিং বলে ভোটে নেমেছিল, তখনও ছিল না। এই টোয়েন্টিফোর ইন্টু থ্রিসিক্সটিফাইভ মেশিনারির সূত্রপাত ২০১৪-তে, ওটাই বিজেপির এক বড় ডিপারচার, বিজেপি তার কোর ভ্যালুজ থেকে সরে এসে নির্বাচনে জিতে এক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের লক্ষে রওনা দিয়েছিল ওই ২০১৪ থেকে। আর সেই মেশিনারির প্রথম কথা হল, নির্বাচনের বহু আগে থেকে এক ইমেজ বিল্ডিং, মানুষের কাছে এক গুচ্ছ নতুন স্বপ্নকে তুলে ধরা, আর মানুষ মানে তারা কোনও হোমজেনিয়াস ধারনা মাথায় রাখেনি, মানুষকে ভাগ করেছে তাদের কাজ দিয়ে, লিঙ্গ দিয়ে, বেকারদের জন্য আলাদা স্বপ্ন, নারীদের জন্য আলাদা স্বপ্ন, আলাদা আলাদা স্বপ্ন দিয়ে প্রত্যেককে জুড়ে নেওয়ার এক পদ্ধতি আমরা বার বার দেখেছি, আর কোনও না কোনও একটা খাপে আপনি পড়ে যাবেন, আপনি আকৃষ্ট হবেন, আর সেই পথেই বিজেপি নির্বাচনের পরে নির্বাচন জিতবে। সেই জন্যেই পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়েছে ভোট গোনার পরের দিন নয়, ভোট শেষ হওয়ার দিন রাতে। হ্যাঁ, এটাও দেখেছি, কিন্তু এবারে ছবি আলাদা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ইজরায়েলের সঙ্গে গলাজড়াজড়ি, ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার পরেও চুপ করে থাকা, এসবের সঙ্গেই এসেছে পেট্রল ডিজেল গ্যাসের উর্ধগতি। হ্যাঁ, সরকার বাধ্য হয়েছেন গ্যাসের দাম বাড়াতে, সামনে চার রাজ্যের ভোট তা সত্ত্বেও ৬০ টাকা রান্নাঘরের উপরে কোপ। এক বিজেপি নেতা বললেন, ‘এরপরেও মানুষ ভোট দেবে?’ হ্যাঁ, সেটাই বিষয় আজকে, বিজেপির গ্যাসে আতঙ্ক, ‘গ্যাসাতঙ্ক’ও বলা যায়।
খেয়াল করে দেখুন ২০১৪-র প্রচারে মোদিজি প্রথমে বলেছেন, ‘একবার ক্ষমতায় আসতে দিন, তারপরে ১৫ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্কে চলে যাবে, ২ কোটি বেকারের চাকরি হবে, কৃষকের আয় দ্বিগুণ হবে’। ক্ষমতায় এসেই গোলপোস্টকে সরিয়ে দিলেন, বলতে শুরু করলেন অমৃতকালের কথা, সেই অমৃতকাল পেরিয়ে গেল, বলতে শুরু করলেন ২০২৭-এর কথা, এখন বলছেন ২০৪৭-এর কথা। মানে যাঁদের এসব বলে ২০১৪-তে ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁদের অর্ধেক মানুষ তো ততদিনে হয় কবরে নয় পুড়ে ছাই। কিন্তু যাই হোক, এটাই বিজেপি, ভোটের আগে নতুন স্বপ্ন আসছে তো আসছে, থামার প্রশ্নই নেই। কিন্তু এবারে এই মধ্য প্রাচ্যের যুদ্ধ সবটা ঘেঁটে দিয়েছে। একে তো অন্তত এই বাংলাতে এস আই আর আর লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে নাজেহাল এমনকি জ্ঞানেষ বাবুও, তার উপরে এক লাফে রান্নাঘরের সিলিন্ডারে ৬০ টাকা করে বাড়ানোটা এক্কেবারে বিজেপি সুলভ কাজ নয়। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই, এবং কেবল গ্যাসের দামেই থেমে থাকবে না।
আরও পড়ুন: Aajke | মামলা হল সুপ্রিম কোর্টে, নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এল আর গেল, ভোটার কী পেল?
ওদিকে রাশিয়া নাকি জানিয়ে দিয়েছে, আর ডিসকাউন্ট ইত্যাদি মিলিবে না। হ্যাঁ, ট্রাম্প সাহেবের অনুমতি পাবার পরে রাশিয়ার কাছে তেল কিনতে গিয়েছিলেন মোদিজি, রাশিয়া বলেছে, এই উঠতি বাজারে তারাও আর কোনও ডিসকাউন্ট দেবে না। মানে দাম চড়ছে, আরও চড়বে, সেই চড়া দামেই তেল কিনতে হবে, আর তার মানে হল আজ নয় কাল নয় পরশু তেলের দামও বাড়বে, সেটা বাড়লে প্রতিটা জিনিষের দাম বাড়বে। কিন্তু বিজেপির কাছে সেটাও ইস্যু নয়, বিজেপি ভক্তরা সাফ জানিয়ে দেবে, যুদ্ধ চলছে তাই দাম তো বাড়বেই, যে কথা মিঠুন চক্কোত্তি আগেই বলে রেখেছেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এই বাংলার ভোটের আগে গ্যাসের দাম বেড়েছে, তা নিয়ে সোমবারে মমতার মিছিল, তারপরে যদি আবার পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়ে তাহলে বিজেপি লড়াইয়ের মধ্যে থাকবে, এমন আশাও তারা নিজেরাই ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, নির্বাচনের দেড় মাস আগে আম জনতার রান্নাঘরে ৬০ টাকার কোপ কি বিজেপিকে বিপাকে ফেলবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
নির্বাচনের আগে বহু রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা হয়, এবারেও হচ্ছে। মাস ছ’য়েক আগেও যে বিজেপিকে উৎফুল্ল দেখেছি, বাদ যাবে মুসলমান, বাদ যাবে রোহিঙ্গা, তাঁদের সমস্ত উৎসাহ, জোশ ক্রমশ কমছে। এসআইআর-এর দীর্ঘ লাইন, মানুষের হয়রানি, মৃত্যুমিছিল, শেষে এসে এই লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি, মমতার সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল, সবকিছুই ক্রমশ মাঝারি, ছোট নেতাদের উৎসাহে ভাটা পড়ার কারণ। আর সেই সবের ওপরে খাঁড়ার ঘা হল- এই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি। একজন প্রার্থী হবার জন্য আঁকশি বাড়িয়েই বসেছিলেন, জানালেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারার কোনও ইচ্ছে নেই, সিলিন্ডারের দিকে তাকালেই আতঙ্ক হচ্ছে। জিজ্ঞেষ করেছিলাম, কী মনে হয় পেট্রল ডিজেলের দামও কি বাড়বে? তিনি কটাস, মানে ফোন কেটে দিয়েছেন।
দেখুন আরও খবর:
