Fourth Pillar | রথ চালিয়ে কোন অঙ্কে বাংলা দখল করবে বিজেপি?

0
34

রথযাত্রা শুরু হয়ে গেল, হ্যাঁ, উত্তেজনাও ছড়িয়েছে, আগামী ক’দিনে সেই উত্তেজনা আরও বড় আকার নিলে আমি অবাক হব না, রথযাত্রা তো করাই সেই জন্য, না হলে খামোখা রথে চড়ার মানেই বা কী? লালকৃষ্ণ আদবানির সেই রথযাত্রার দু’পাশে ছড়িয়ে থাকা লাশের কথা তো আমাদের ভোলার কথা নয়। তো সেই রথযাত্রার দু’দিনে কার্পেট বম্বিং, বিজেপি নেতাদের সব মাথারাই হাজির, অমিত শাহ, রাজনাথ সিং, জেপি নড্ডা, নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস, কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান। আর ঢালাও প্রতিশ্রুতি, কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন দফতরে ২০ শতাংশ বা তার বেশি শূন্যপদ পড়ে আছে, সে দিকে হুঁশ নেই, ওনারা এই বাংলাতে একটাও শূন্য পদ রাখবেন না, যদি ক্ষমতায় আসেন, হ্যাঁ, এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। আসলে বিজেপি তার শেষ দান খেলতে চলেছে, তারা জানে এবারেও দল ক্ষমতায় না এলে বাংলার সংগঠন ধরে রাখাটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এই বাংলার মত হাইলি পলিটিসাইজড রাজ্যে কেবল প্রচারেই কি খুব বেশি হেরফের সম্ভব? বাংলার মানুষ সারা বছর রাজনীতি করে, রাজনীতির মধ্যেই থাকে, এই বাংলার অধিকাংশ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রোজগারের সঙ্গে জুড়ে আছে দলীয় রাজনীতি। হ্যাঁ, এই জিনিস শুরু হয়েছিল বাম জামানাতে, আজ তা আরও বড় আকার ধারণ করেছে। সেই বাংলাতে ভোটের আগের ক’দিনের প্রচার খুব বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে আমার মনে হয় না। সি ভোটারের ট্রাকারও বলে বাংলার ভোট হাইলি পলিটিসাইজড, বহু আগে থেকেই এখানকার মানুষ নির্বাচনের জন্য তৈরি থাকে।

আসুন একটি হিসেবে নামা যাক, ২০২১-এ তৃণমূল ২১৫ আর বিজেপি ৭৭। অঙ্ক বলছে, বিজেপিকে আরও ৭০টা আসন পেতে হবে, ৭৭ যোগ ৭০ ইজ ইকুয়াল টু ১৪৭। তবে তো ক্ষমতা দখল? সেটা কি সম্ভব? হতেই পারে, নির্বাচনী পাটিগণিতে সব সম্ভাবনাই লুকিয়ে থাকে, কিন্তু তার শর্ত আছে। বিজেপি ১ শতাংশ ইউনিফর্ম সুইং, সুইং মানে? স্যুইং মানে হল ভোট ঘুরে যাওয়া, একদিক থেকে অন্যদিকে চলে যাওয়া। তো ধরে নিলাম সব জায়গাতে একই ভাবে ভোট ঘুরল, যা হয় না, ভোট সুইং অমন সোজা হিসেবে হয় না, তবুও বোঝার জন্য বলছি, ১ শতাংশ সুইংয়ে ৭৭ থেকে ৮৭ হবে, ২ শতাংশ সুইংয়ে ১০২ খানা আসন পাবে, ৩ শতাংশ সুইং হলে ১২০-তে পৌঁছে যাবে, ৪ শতাংশ সুইং করাতে পারলে ১৩৮ আর ৫ শতাংশ সুইং করাতে পারলে ১৫২টা আসন পাবে। তো এই সুইং কোন দিক থেকে কোনদিকে? অন্য কোনও দিক থেকে হলে হবে না, তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে হতে হবে। মানে তৃণমূলের ৫ শতাংশ ভোট কমল আর বিজেপির দিকে সেই ৫ শতাংশ ভোট গেল, তবে গিয়ে বিজেপি ১৫২টা আসন পাবে। মানে এমন একটা অবস্থা যে তৃণমূলের উপরে তৃণমূলের ভোটারেরা রেগে ৫ শতাংশ চলে গেলেন বিজেপিতে, তা হলে এক পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু আমাদের বাংলার ভোটের প্যাটার্ন কী বলছে? ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, বিজেপি পেয়েছিল ১০.১৬ শতাংশ। ২০১৯ লোকসভাতে সেই ‘আগে রাম পরে বাম’-এর গল্প, বামেদের প্রায় সব ভোট গিয়ে পড়ল বিজেপির বাক্সে, সেবারের নির্বাচনে তৃণমূল পেল ৪৩.৩ শতাংশ, বিজেপি ১০ থেকে বেড়ে ৪০.৭ শতাংশ ভোট পেল। খেয়াল করে দেখুন, ওই প্রবল বিজেপির বৃদ্ধির পরেও তৃণমূলের মাত্র ১.৬ শতাংশ ভোট কমেছিল। আবার এই হিসেবটাও মাথায় রাখতে হবে, লোকসভা ভোটে মোদিজি একটা ফ্যাক্টর, মোদিজির বিকল্প নেই, কাজেই সেখানে অন্যান্য রাজ্যের হিসেবে বিজেপি দল লোকসভাতে বিধানসভার চেয়ে ৪-৫ শতাংশ ভোট বেশি পায়। এখানে কিন্তু তেমনটা হয়নি। এবারে এল ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন, তৃণমূল আগের বিধানসভার চেয়ে ঠিক ৩ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে ফেলে ৪৭.৯৪ শতাংশ ভোট পেল, আর বিজেপি লোকসভার ৪৪ শতাংশ থেকে কমে ৩৮.১ শতাংশে এসে ঠেকল। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২০১৯-এর লোকসভার থেকে ৩ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে ৪৬.১৬ শতাংশ ভোট পেল, আর বিজেপির ভোট ১ শতাংশ কমে ৩৯.০৮ শতাংশ হল। তার মানে বাংলাতে তৃণমূলের থেকে বিজেপির দিকে ভোট সরাসরি সুইং হওয়া কঠিন, আর ৫ শতাংশ স্যুইং আরও কঠিন ব্যাপার।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | আমেরিকা – ইজরায়েল – ইরান যুদ্ধ হচ্ছে, ভারতের বাজার ধসছে কেন? 

এবারে আসুন দেখে নিই, বিজেপি যে ৭৭ টা আসনে জিতেছিল, সেগুলোর অবস্থা কেমন ছিল? মানে কতটা ক্লোজ ফাইট ছিল বা মার্জিন কেমন ছিল। ২০২১ সালে বিজেপি ০–৫ শতাংশ ভোটের মার্জিনে ৩২টা আসন জিতেছিল, মানে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট কমলেই, আমি নির্দিষ্ট কোনও দিকে সুইংয়ের কথা বলছি না, ধরুন ওই ৫ শতাংশ বামেদের দিকে চলে গেল, তাহলেই বিজেপি কিন্তু ৭৭ থেকে ৪৫ হয়ে যাবে। মানে হিসেব কিন্তু পরিষ্কার বলছে যে, বামেরা ভোট বাড়াতে পারলে বিজেপি কমবে। হ্যাঁ, হিসেব বলছে তৃণমূলের এখনকার ভোট ব্যাঙ্কে বামেরা হাতও দিতে পারছে না। আবার ওই বিজেপির ভোট যদি ২.৫ শতাংশ ও তৃণমূলের দিকে আসে, তা হলেও বিজেপি ৪৫-এ নেমে যাবে। হ্যাঁ, বিজেপি তলানিতে ঠেকলে তখন আবার বাইনারিটা ঘুরে তৃণমূল আর বাম হতে পারে। যদি আমরা জেলাভিত্তিক ফলাফলের দিকে নজর দিই তাহলে দেখব, রাজ্যের রাজনৈতিক ম্যাপ ‘হোমোজিনিয়াস’ নয়, মানে সবজায়গাতে একই প্যাটার্নে ভোট পড়ে না, জেলার হিসেবে বিজেপি বা তৃণমূলের যাকে বলে ঘামাসান লড়াই, সেটা কোথায় কোথায় হবে? ধরে নিলাম সেই আসনগুলো যেখানে, দুই দলই জিতেছে ৫ শতাংশ বা তার কম ভোটে। সেগুলো কোথায়? বর্ধমানে সেরকম আসন ২টো আছে বিজেপির, কিন্তু ৮টা আছে তৃণমূলের, পূর্ব মেদিনীপুরে ৩টা আছে বিজেপির, ৬টা তৃণমূলের। পশ্চিম মেদিনীপুরে ২টো আছে বিজেপির, ৩টা আছে তৃণমূলের। বাঁকুড়াতে ৪টে আছে বিজেপির, ২টো তৃণমূলের। উত্তর ২৪ পরগনাতে ৩টে আছে বিজেপির, ২টো তৃণমূলের, পুরুলিয়াতে ৫টা আসন বিজেপির আছে, যেগুলো কিন্তু ব্যাটলগ্রাউন্ড আসন, মানে সবকটা আসনেই বিজেপি জিতেছিল ৫ শতাংশ বা তার কম ভোটে। বীরভূমে ১টা বিজেপির, ৩ টে তৃণমূলের, হুগলিতে দু’দলেরই এরকম ২টো করে আসন আছে, কোচবিহারে বিজেপির ২টো আসন, ১টা তৃণমূলের, নদিয়াতে ১টা আসন বিজেপির, ২ টো আসন তৃণমূলের, দক্ষিণ দিনাজপুর সুকান্ত মজুমদারের জেলা, ২টা আসন এমন আছে, যেখানে ৫ শতাংশ বা তার কম ভোটে বিজেপি জিতেছিল। হাওড়াতে ২টো আসন আছে তৃণমূলের, যেখানে তারা ৫ শতাংশ বা তার কম ভোটে জিতেছিল। রইল বাকি বামেদের ভোট, প্রায় ৭ শতাংশ, তো সেটারও হিসেব কষেছি, বামেদের ভোট ইউনিফর্ম সুইং হলে, যা হবার চান্স নেই, কারণ বামেদের ভোট ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আর বামেদের মাত্র ৬২টা আসন আছে, যেখানে তারা ১০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেয়েছে, ১১টা আসন এমন আছে, যেখানে তারা ২০ শতাংশের বেশি আসন পেয়েছে। তবুও যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, বামেদের ৫ শতাংশ ভোট বিজেপির দিকে গেল, তাহলেও বিজেপি ১১৪-তে আটকে থাকবে, তৃণমূল ১৭৯–১৮০ টা আসন পাবে।

জানি পাটিগণিতের হিসেবে নির্বাচন হয় না। কিন্তু আগের ভোটগুলোকে এক্কেবারে অগ্রাহ্য করে পশ্চিম বাংলাতে কোনও পরিবর্তন হয়েছে তার উদাহরণ নেই। লোকসভার নির্বাচনে ভেঁপুটা বাজে, তার রিফ্লেকশন দেখা যায় বিধানসভায়। কেউ এখানে ২০১৯-এর উদাহরণ দেবেন, খেয়াল করে দেখুন, সেদিনে এক প্রবল হাওয়াকে রুখেই তৃণমূল ২২টা আসন পেয়েছিল, ১৮টা পেয়েছিল বিজেপি, ২টো কংগ্রেস। কিন্তু সেই ফলাফল তার নির্ধারিত গতিপথ পাবার আগেই বিজেপি নামল দলভাঙার খেলায়, এক ভিকটিম গেমে নামার সুযোগ এসে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে, বাংলার মেয়েকে জোর করে হারানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু ওসবের পরেও ৩ থেকে বিজেপির ৭৭-এ যাওয়াটা তো কম কথা নয়। কিন্তু সেই ৭৭-এ গিয়েও একটা দল গত ৫ বছর ধরে বাংলার পথে ঘাটে মাঠে এমন কোনও সাড়া জাগাতে পারেনি, যার ফলে তৃণমূলের ভোট কমে যাবে। সেটাই তৃণমূলকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে। এক্স ফ্যাক্টর? আছে, তবে তা নিয়ে আলোচনা আজ নয় আরও পরে। প্রার্থী, বিদ্রোহী প্রার্থী, গোঁজ প্রার্থী, তিনকোনা লড়াই – সব হিসেব নিকেশের পরে আবার হিসেব করা যাবে ওই এক্স ফ্যাক্টরের। কিন্তু তার আগে বলি, রথ নামছে কিন্তু অঙ্ক বিজেপির পক্ষে নেই, সেখানে অন্য হাওয়া বইছে।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here