4.8 C
New York

Fourth Pillar | আমেরিকা – ইজরায়েল – ইরান যুদ্ধ হচ্ছে, ভারতের বাজার ধসছে কেন? 

Must Read

২০২৬ তো সবে শুরু, এরই মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার আকাশ আগুনের শিখায় রাঙিয়ে উঠেছে, আর এক আশঙ্কা ঘিরে ধরছে আমাদেরকেও। গত কয়েকদিনে শেয়ার বাজারের ধস ছিল দেখার মত, আর টাকা সে তো ১০০ ছুঁল বলে। কিন্তু দেখুন আমাদের বিশ্বগুরুর মুখে রা নেই। উনি ইজরায়েল (Israel) গেলেন, ফেরার একদিনের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেইনি কে হত্যা করা হলো। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল আর তা ছড়িয়ে পড়লো মধ্য প্রাচ্যে।  যে যুদ্ধ মানচিত্র বদলে দিচ্ছে না, কিন্তু তার উত্তাপ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভারতের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে, হ্যাঁ দুয়ারে যুদ্ধ । মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র, এক কোটি ভারতীয়র রুটিরুজির যোগানদার, ভারতের আন্তর্জাতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসপিরেশনের প্রবেশদ্বার। আগেও যুদ্ধ হয়নি এ অঞ্চলে তা তো নয় কিন্তু এবারের সংঘাতের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক আর সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া । ইজরায়েল আমেরিকার যৌথ বাহিনী ইরানের ভেতরে প্রায় ২,০০০ টার্গেটে মিশাইল, বোমা ফেলেছে, বিশ্ব দেখেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর মৃত্যু, যা স্বাভাবিকভাবেই ইরানকে এক চরম প্রতিশোধমূলক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে । এর জবাবে ইরান কেবল ইজরায়েলকে লক্ষ্য করেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়েনি, বরং পারস্য উপসাগরের সেই সমস্ত দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি রয়েছে, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতার । খুব পরিস্কার হিসেব, এই সমস্ত ছোট ছোট দেশ আক্রান্ত হলে দুনিয়ার অর্থনীতি আক্রান্ত হবে, সবাই চাপ দেবে এক সমঝোতার জন্য। আর ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও কঠিন, কারণ প্রচুর হেঁহেঁ আর জড়াজড়ির পরে  সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) ইজরায়েল সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন, কাজেই এই সফরের সময়, মোদি সরকারের প্রকাশ্য ইজরায়েল-ঘনিষ্ঠতা এখন ভারতের এতদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে ।

ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেখানে কয়েক দশকের পুরনো এক সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ, সেখানে বর্তমান সরকারের এই অবস্থান ভারতকে তার প্রতিবেশী অঞ্চলে একা করে দেবে কি ? হ্যাঁ তা নিয়ে কথা উঠছে। এবারে ব্রিকস এর সম্মেলন তো ভারতে, ইরানকে তো ব্রিকস এ নেওয়া হয়েছিল, মোদিজী, যিনি নিজেই স্বঘোষিত বিশ্বগুরু, কী বলবেন? আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বারে ব্রিক্স সামিট, সেখানে কী বলবেন হেঁহেঁ বাবু? ওদিকে পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে । যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম এক ধাক্কায় ১২ শতাংশ বেড়ে গিয়ে প্রতি ব্যারেলে ৮২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ১২০ থেকে ১৩০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে । এখানেই শেষ নয় ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হল পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালী’র সম্ভাব্য বা আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল, বড় অংশের এলএনজি (LNG) এই পথ দিয়েই আসে যায়।  ভারত এর আমদানি করা তেলের ৫০ শতাংশ, এলএনজির ৫৪ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে। সে পথ এখন বন্ধের মুখে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ভারতে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন, যেখানে রাশিয়া বা আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকে তেল আসতে ২৫ থেকে ৪৫ দিন সময় লেগে যায় । ভারতের কাছে অপরিশোধিত তেলের কিছু সঞ্চয় থাকলেও এলপিজি (LPG) বা রান্নার গ্যাসের জন্য তেমন কোনও সঞ্চয় ব্যবস্থাই নেই, যা সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেটে প্রভাব ফেলবে । যুদ্ধের ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমা কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক কভার’ বা যুদ্ধকালীন বিমার প্রিমিয়াম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে । অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যেই এই অঞ্চল দিয়ে চলা জাহাজের ওপর থেকে বিমা সুবিধা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে । প্রভাব পড়ছে ভারতের আমদানি ও রপ্তানি খরচের ওপর। ভারত থেকে ইউরোপ বা আমেরিকায় পাঠানো পণ্যগুলোর পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে আর সময়ও লাগছে অনেক বেশি, কারণ জাহাজগুলোকে এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ ঘুরে যেতে হচ্ছে । এর ফলে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) যারা গালফ বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে রপ্তানি করে, তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | আদালতে প্রমাণিত, ইডি-সিবিআই বিজেপির হাতিয়ার

কেবল তাই নয়, যুদ্ধ ভারতের সাধারণ মানুষের খাবারের থালাতেও টান দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ভারতের বাজারে ডাল আর বেশ কিছু অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়া শুরু হয়ে গেছে । ভারত প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন টন ডাল আমদানি করে, যার মধ্যে অড়হর, মুগ এবং মসুর ডাল আছে। মিয়ানমার, কানাডা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এই ডাল ভারতে আসার পথে লজিস্টিক খরচ বাড়ার ফলে খুচরা বাজারে ডালের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে । অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার ফলে ডিটারজেন্ট, বিস্কুট, টুথপেস্ট বা রঙের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসের উৎপাদন খরচ, প্যাকেজিং খরচ বেড়ে যাচ্ছে । হ্যাঁ চাল সস্তা হবে, কারণ আমাদের চাল যেত এই অঞ্চলে, কিন্তু সেই বাসমতি চালের যোগান দেন যে কৃষকরা, তাঁদের ঘুম কেড়েছে এই যুদ্ধ। ভারতীয় প্রবাসীরা এই মধ্য প্রাচ্য থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠান, যা ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে ভরিয়ে দেয়, বিশেষ করে কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোর অর্থনীতিকে সচল রাখে, হ্যাঁ দক্ষিণের রাজ্যগুলোর জিএসডিপি আরও কমবে। ইরানের চাবাহার বন্দর ছিল ভারতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, হ্যাঁ মোদিজীইই এই কথা বলেছিলেন। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর আর চিনের প্রভাবকে  আটকাতে ভারত এই বন্দরে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে, এখন সব ভোগে, কেবল তাই নয়, যুদ্ধ থামলেও, যুদ্ধের আগে ভারতের ভূমিকা তো ইরান ভুলবে না, কাজেই চাবাহার বন্দর এর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। শোনা যাচ্ছে ইরানের নতুন নেতৃত্ব চাবাহার বন্দর নিয়ে করা ১০ বছরের চুক্তি বাতিল করতে পারে, ভারতকে এই প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিতে পারে । যদি ভারত চাবাহার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে মধ্য এশিয়ায় ভারতের সমস্ত প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাবে আর অঞ্চলটা পুরোপুরি চিন, পাকিস্তানের দখলে চলে যাবে । ওদিকে ভারত, ইরান রাশিয়া মিলে যে আইএনএসটিসি (INSTC) করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করেছিল, সেটাও এখন যুদ্ধের মেঘে ঢাকা। এই করিডোরটা ভারতের জন্য রাশিয়া ইউরোপের বাজারে পৌঁছানোর এক বিকল্প ও সস্তা পথ হয়ে উঠতে পারতো। ইরানের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন, ট্রাম্পের আদেশে রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করা বা ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার কারণে এই প্রকল্পটা এখন কার্যত অচল। জি-২০ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়েছিল ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ আইমেক (IMEC), ভারতের জন্য এক বিশাল স্বপ্ন। ভারতকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, জর্ডন, ইজরায়েলের সাহায্যে ইউরোপের সঙ্গে জুড়ে দেবার কথা ছিল। ইজরায়েল, আরব দেশগুলোর মধ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা আবার ফিরে আসে, তাহলে এই রেল বা সমুদ্রপথ তৈরি করা এক অসম্ভব কল্পনা হয়েই থেকে যাবে।

অন্যদিকে দেখুন, এই যুদ্ধে ভারতের ক্ষতি হলেও চিন রাশিয়া কিন্তু মোটামুটি ভালো অবস্থানেই রয়েছে। চিন ইরানকে উন্নত রাডার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করছে যাতে তারা আমেরিকান অস্ত্রশস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে পারে । রাশিয়া এই সংঘাত থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার তেল বা গ্যাস রপ্তানি থেকে আয় বাড়ছে, যা তাদের ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ জোগাতে সাহায্য করছে । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভারত যদি এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি ইজরায়েল আমেরিকার ব্লকে ঢুকে পড়ে, তাহলে রাশিয়া, ইরানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের যে ঐতিহাসিক নিরাপত্তা আর জ্বালানি সম্পর্ক ছিল, সেটা চিরতরের জন্যই শেষ হয়ে যাবে। মোদিজী তাঁর এপস্টিন ফাইলের চাপ এড়াতে, আদানি আম্বানির ব্যবসায়িক স্বার্থ বজায় রাখার জন্যই আমেরিকার সমস্ত শর্তে এখন রাজি, কিন্তু এই বিদেশনীতি একটা সময়ে ভারতকে তার প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে তলানিতে নামিয়েছে, এবারে মোদিজীর এই আমেরিকার কাছে মাথা নুইয়ে দেওয়ার ফলে ভারত হারাতে চলেছে তার বহুদিনের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে। দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রান্তে বসে একাকীত্বের যন্ত্রণা ভোগ করা ছাড়া এই বিদেশনীতি আর কোনও পথ দেখাবে না। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ আমেরিকার সঙ্গে একমত নয়, তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ তো দুরের কথা সাহায্যও করবে না। ব্রিটেন, স্পেন সে কথা বলেছে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইসলামিক দেশগুলো শেষমেষ একজোট হবেই, ওদিকে আমেরিকার সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে দেশ চলবে, এমনও সম্ভব নয়, আমেরিকা চায় ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে অবাধ প্রবেশের অধিকার, যা দিলে দেশের মধ্যের বিক্ষোভ সামাল দিতে পারবেন না মোদিজী। অন্যদিকে ট্রাম্প সাহেব আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ চায় একশ শতাংশ আনুগত্য, সেই শাঁখের কারাতে আটকেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, এখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। একসময় গোটা বিশ্বে ভারতের রাষ্ট্রপ্রধানের কথা, আমাদের জাতির জনকের কথা মানুষ জানতেন, শুনতেন, বলতেন। আজ এক বোবা ভিতু মানুষ রাষ্ট্রের মাথায়, যাকে একবার ইজরায়েল, একবার আমেরিকা আক্ষরিক অর্থেই মুরগি করছে। মাস তিন আগে ইরান আক্রমণের দিনক্ষণ  ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তারপরেই ইজরায়েল থেকে আমন্ত্রণ এলো, মোদিজী গিয়ে হেঁ হেঁ করলেন, জড়াজড়ি করলেন, ফিরে এসেই দেখলেন মিশাইলে নিহত আয়াতোল্লা খামেইনি, হ্যাঁ ওনাকে আক্ষরিক অর্থে কেবল জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে, ভারতের দায় থেকে গেল এই অন্যায় আক্রমণের।

Latest News

ভোটের আগে সাগরে অশান্তি! তৃণমূলের পতাকা-ফেস্টুন ছেঁড়ার অভিযোগে চাঞ্চল্য

দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Assembly Election 2026) প্রাক্কালে উত্তপ্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার (South 24...

More Articles Like This