বহুদিন আগে এক সিনেমার এক দৃশ্যে দেখেছিলাম, বেশ সম্পন্ন উচ্চবিত্ত ঘরের এক বাচ্চার জন্মদিনে কাজের মাসির মেয়েটাকে বাইরের বারান্দায় নামিয়ে ভেতরে গিয়েছে রান্না করতে, বার্থডে গার্ল আর তার বন্ধুরা গান চালিয়ে নাচছে, বারান্দায় সেই মেয়েটাও সেই তালে নাচছে, তার মা কাজের ফাঁকে একবার তাকে দেখতে এলে সে তার মাকে বলছে, ‘মা কী সুন্দর মাংসের গন্ধ!’ তার মা কেবল তাকিয়েছিল। বহু গুলি-গোলা, রক্তপাতের প্রবল ভায়োলেন্সের পাশে এই নিঃশব্দ ভায়োলেন্স অনেক প্রবল, অনেক সাংঘাতিক, অনেক বেশি কান্না জমায় গলায়। ঠিক সেই রকম যখন আজকের কাগজে রক্তপাতহীন, কোনও হিংসা ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হল, ‘গণতন্ত্রের মহোৎসবে মানুষ ভোট দিবস উদযাপন করলেন’ এমন সমস্ত হেডলাইন ছাপা হল তখন কারও পাশের বাড়ির সেই মহিলা, পুরুষ, বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখে দেখেছেন, যাঁরা দশ পুরুষের বাসিন্দা কিন্তু যাদের এই উৎসবে প্রবেশের অধিকারই নেই? যাঁরা ভোট দিতেই পারলেন না? ৩৫-৩৭ লক্ষ এমন ভোটারকে বাদ দিয়েই এই রক্তপাতহীন নির্বাচনের আয়োজনে বোমা ফাটলে, রক্ত ঝরলে তবেই হিংসা, নচেত নয়? আমার ৩৫-৩৭ লক্ষ সহনাগরিককে ভোট বৃত্তের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেই বলা হয়েছে, আজ কেবল নাম বাদ গিয়েছে, এর পরে, মানে ডিটেক্টের পরে ডিলিট করা হয়েছে, এরপরে ডিপোর্ট করা হবে। এর চেয়ে বড় ভায়োলেন্স কী হতে পারে? সেটাই বিষয় আজকে, সুষ্ঠু ভোট? শান্ত ভোট? হিংসা নেই?
ভায়োলেন্স কোন পর্যায়ে? রাষ্ট্র বলছে আপনাকে নির্বাচনের ডিউটিতে যেতেই হবে, নির্বাচন হল দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব, আপনি সরকারি কর্মচারী, আপনাকে সেই কাজে সহায়তা করতেই হবে, না হলে চাকরি যাবে। হ্যাঁ, এই আদেশ পালন করতে ভগবানগোলাতে শাহিদুল ইসলাম ভোট করাতে গেছেন, না গেলে পেটের ভাত কেড়ে নেবে সরকার বাহাদুর, অথচ তার নাম ভোটার তালিকাতেই নেই। হ্যাঁ, পেটের খাতিরে যিনি গণতন্ত্রের মহোৎসবে কাজ করার জন্য স্কুলে বেঞ্চিতে শুয়ে ভোর চারটে থেকে উঠে আপনার নির্বাচন কে সুষ্ঠু করার জন্য সারাদিন কাজ করলেন, সন্ধ্যের পর সমস্ত কিছু গুটিয়ে ইভিএম বয়ে কালেকশন অফিসে ফেরত দিয়ে মাঝরাতে ছাড়া পেয়ে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে ৪৮ ঘন্টা ৫২ ঘন্টা টানা ডিউটি করে ঘরে ফিরলেন তিনি নাগরিক কি না তা নিজেই জানেন না, রাষ্ট্র এবার তাকে ডিপোর্ট করলে তিনি কী করবেন জানেন না। এরকম কি একজন? স্বাতী মোল্লা ডোমকলে গিয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে, মানীকজন ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা নিয়ে তিনি নির্বাচনের কাজ করবেন, কিন্তু তাঁর নাম তালিকাতে নেই। তিনি ভোটারই নন। আজিজুল হক গিয়েছেন পালাশিপাড়াতে, ফিরোজ আলি গিয়েছেন সুতিতে প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে, একই ভাবে, তাঁরাও ভোটার নন। একবার নিজেকে তাঁদের জায়গাতে বসান, আর তারপরে বলুন শান্তিতে নিরুপদ্রবে, কোনও ভায়োলেন্স ছাড়াই ভোট হয়েছে, দেখবেন কেমন লাগে।
আরও পড়ুন: Aajke | আবার কবে এই বাংলায় আসবেন মোদি, অমিত শাহ?
এই ৩৫-৩৭ লক্ষ বাদ পড়া মানুষের তালিকাতে আছেন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কৃষক, আছেন এমন মানুষ যাঁরা গত ২০-২৫ বছর ধরে সরকার বাহাদুরকে ট্যাক্স গুনেছেন, আছেন এমন মানুষ যাঁরা বিভিন্নভাবে এই রাষ্ট্র নির্মাণের সোন্নগে জড়িত, আছেন শিক্ষক, ডাক্তার, শিল্পী। তাঁরা বাদ? চিহ্নিত তো হয়েই গিয়েছে, নামও বাদ পড়েছে, এবারে ডিপোর্ট করার পালা। তাঁদের অনেকে দিন গুনছেন, হঠাৎ মাঝরাতে শোনা যাবে বুটের শব্দ, আসবে প্রিজন ভ্যান, তাঁদের রাতের অন্ধকারে পাঠানো হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে, যেমনটা পাঠানো হয়েছিল সোনালি বিবি, সুইটি খাতুনদের। না না এগুলো তো হিংসা নয় মোটেই, এ তো চৈতন্যগান। আপনার জন্মভূমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেয় যাঁরা তাঁরা তো সব শান্তির প্রহরী, আপনিই ভুল দেশে জন্মেছেন। হাজারে হাজারে সেনা বাহিনী দিয়ে এক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াকে বলা হচ্ছে উৎসব, ৩৫-৩৭ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম কেটে নির্বাচন করানোকে বলা হচ্ছে শান্তিপূর্ণ। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আমাদের সহনাগরিক ৩৫-৩৭ লক্ষ মানুষের ভোট কেড়ে নিয়ে তাঁদেরই কাউকে কাউকে প্রিসাইডিং অফিসার করে নির্বাচন করাতে পাঠানো হল, সেই আদেশ না মানলে চাকরি খেয়ে নেবার কথাও বলা হল। এটা কি ভায়োলেন্স নয়? এটা কি গণতন্ত্রের সঙ্গে মানানসই? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আসলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে বাংলার নির্বাচনের বহু আগে থেকে, ২০২১-এর নির্বাচনে ৭ জন, ২০২৪-এর নির্বাচনে বাংলাতে ২০ জনের বেশি মারা গিয়েছেন। এবারে ২০০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন আতঙ্কে হার্টফেল করে, আত্মহত্যা করেছেন শঙ্কায় আর আজও লক্ষ্য মানুষ সেই ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তখন কেউ কেউ বড় মুখ করে বলতে এলেন, এবারের ভোট নাকি রক্তপাতহীন, শান্তিপূর্ণ হয়েছে, এর থেকে বড় তামাশা আর কিই বা হতে পারে।
দেখুন আরও খবর:
