রণপা পরে একটা মানুষকে খানিক সময়ের জন্য একটু উঁচুতে তুলে ধরানো যায়, কিন্তু রণপা লাগিয়ে মানুষের উচ্চতা বেড়ে যায় না। বিজেপি (BJP) এই সার সত্যটা বুঝলে একটু অন্য সুরে কথা বলতো। একটা রাজনৈতিক দল যারা গত ১২ বছর ধরে দেশের সরকার চালাচ্ছে, সেই দল কোন এমন হাতিয়ারটা বাদ রাখলো এবারে? কোন এমন উপায়কে কাজে লাগালো না? ভাতে মারার চেষ্টা করেছে, ভাতে মারলে যদি মানুষ ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে। মানুষ বোঝেনি। বর্গির মত হানা দিয়েছে ইডি (ED), সিবিআই (CBI), রেইড হয়েছে ৩০০ খানা, জেলে পোরা হয়েছে একগুচ্ছ নেতা মন্ত্রীকে, কিন্তু একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করা যায় নি, তারা একে একে জামিন পেয়ে বাইরে আসছে। দলকে আড়াআড়ি ভেঙে দু টুকরো করার অপারেশন লোটাস, একদিনও বন্ধ রাখা হয় নি, সারাক্ষণ ভয়, হুমকি আর প্রলোভনের গাজর ঝুলিয়ে দিয়েও সেরকম কোনও লাভ হয়নি, সেই ২০২১ এর পরে তেমন বিরাট কোনও ভাঙন তো নেই। এবারে এল ভোটার তালিকাটাকেই ঠিকঠাক করে সাজিয়ে নেওয়া, টার্গেট ছিল অনেক বড়, বিশাল সংখ্যক মুসলমান সংখ্যালঘু ভোটকে বাদ দেওয়া, সেটা করতে গিয়েও তেমন বিরাট সাফল্য আসেনি, সংখ্যালঘু ভোটার যা কমেছে তাতে কিছু আসনে মার্জিন কমার বেশি কিছু হচ্ছে না, উল্টোদিকে মতুয়া রাজবংশী সমাজে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে। সব মিলিয়ে এসআইআর উলটো দিকে গিয়েছে, কতটা? সেটা তো ভোটের রেজাল্ট আসার পরে বোঝা যাবে। তারপরে প্রশাসনকে কব্জা করা, বেধড়ক প্রশাসনিক রদবদল করার পরেও খুশি নন সাহেব। কিন্তু এসবের পরেও মানুষ তো দেবে ভোট। সেই তারা কোথায়? হ্যাঁ জনসভা ফাঁকা কেন? সেটাই বিষয় আজকে। বিজেপির মিটিং গুলোতে ফাঁকা মাঠ কোন খবর দিচ্ছে?
হ্যাঁ উত্তর থেকে দক্ষিণে বিজেপির বিভিন্ন জনসভাতে মানুষ নেই, বহু বাইরে থেকে আসা নেতা মন্ত্রীরা গিয়ে লোকজনের হাল দেখে সভা না করেই ফিরে যাচ্ছেন। এক অভিনেতা তো প্রেসার নেমে গেছে বলে হোটেলে ফিরে গেলেন। হ্যাঁ আপনি বলতেই পারেন যে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাতে তো দিব্যি লোক হচ্ছে, অমিত শাহের (Amit Shah) দু’চারটে বাদ দিলে লোকজন তো হচ্ছে। ঠিকই বলছেন, কিন্তু একবার ভাবুন, প্রধানমন্ত্রীর কাটোয়ার মন্ত্রীসভাতে লোক গেছে আসানশোল, ময়ুরেশ্বর, রামপুরহাট থেকে, হ্যাঁ সেন্ট্রাল র্যালিতে এরকম ভাবেই ভিড় দেখানো হয় হচ্ছেও, অমিত শাহের র্যালিতেও কম বেশি একই রকমের, তা কোনওভাবেই সমর্থনকে তুলে ধরে না, একটা রোড শোতে শ পাঁচেক লোক থাকলেই হয়, বাকিটা ওই ঢাক-ঢোল, পুলিশ আর পথচারীদের ধরেই সামাল দেওয়া যায়। বুঝতে হলে পাড়ার নুক্কড় সভাগুলোর দিকে তাকান, এলাকার মধ্যে বা আশে পাশের ছোট মাঠের সভাগুলোর দিকে তাকান, সেখানে ধু ধু করে জনমানব নাই, হ্যাঁ এরকম এক অবস্থা, সেখানে বক্তা যোগী আদিত্যনাথ-ই হোক আর সুকান্ত মজুমদার (Sukanta Majumdar), ধর্মেন্দ যাদব হন আর হিমন্ত বিশ্বশর্মা, লোক নেই, চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে। কেন ব্লুন তো? আসলে জেতার জন্য যা যা বিজেপি করেছে তার বেশিরভাগটাই করতে পেরেছে তারা সরকারে আছে বলে, টাকা আটকে রাখা থেকে ইডি সিবিআই বা এসআইআর করেছে। প্রচুর টাকা আছে বলে বিরাট বিরাট ব্যানার দেখা যাচ্ছে, বিশাল বিশাল র্যালি হচ্ছে, এমনকি পাশাপাশি জেলেই কেবল নয় রাজ্য থেকেও লোক আনা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া দেখলে মনে হবে ২৯৪ এ ৩৬০ টা আসন বিজেপিই পাবে। আর মিডিয়ার কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো, সেখানে অ্যাঙ্কর প্রশ্ন করছে আচ্ছা বলুন তো এবারের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে যাচ্ছেন কেন? কার বাবা তাঁকে এই খবর আগেই দিয়ে দিয়েছেন জানিনা কিন্তু কনফিডেন্স লেভেলটা দেখুন উনি জানেন মমতা হেরেই যাচ্ছেন, কেবল কারণটা জানার চেষ্টা চলছে। এটাই আপাতত গোদি মিডিয়া। ওদিকে ইডির কাছে নাকখৎ দিয়ে কেঁদে ককিয়ে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া বৃদ্ধ কথক দোলনা চেয়ারে দুলতে দুলতে বলছেন ভূমিকম্প আসছে, ভূমিকম্প আসছে। কিন্তু এসব করার জন্য তো চাই টাকা আর ক্ষমতা, কিন্তু পাড়ার মোড়ের জনসভা ভরাতে চাই মানুষ, ভোটের বুথে ভোট দেবার জন্য চাই মানুষ। সেই মানুষ কোথায়? এ সেই ছোট্ট বেলার কাগজের মোড়কের খেলা, মোড়কের পরে মোড়কের পরে মোড়ক খুলতে খুলতে ক্লান্ত হয়ে শেষ মোড়ক টা খোলার পরে দেখলাম লেখা আছে ধাপ্পা। হ্যাঁ আমরা মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিজেপির এত বিরাট প্রচার, এত হোর্ডিং, এত পোস্টার, সমাজ মাধ্যমে এত বিজ্ঞাপন, কিন্তু পারার মোড়ের সভাগুলোতে, ছোট ছোট মাঠের সভাগুলোতে চেয়ার ফাঁকা কেন? মানুষ নেই কেন? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আসলে এটাই সমস্যা, আপনি রণপা পরে হঠাৎ খানিক উঁচুতে উঠে যেতেই পারেন, আপনার উচ্চতা কিন্তু একই থাকে। বেলুনকে হাওয়া দিয়ে বিরাট বড় করাই যায়, কিন্তু হাওয়া কমে গেলে আবার সেই এইটুকু ছোট্ট হয়ে যাবেই, গরম হাওয়া পেটে নিয়ে ফানুস অনেক ওপরে উঠে যায়, কিন্তু তারপর আগুন নিভে গেলে টুক করে খসে পড়ে। বিজেপি এক বিরাট প্রচার যন্ত্রের সাহায্য নিয়েই এক প্রকান্ড বাঘের চেহারা নিয়েছে বটে কিন্তু সেই বাঘ কাগজের, সেই বাঘের থাবায় জোর নেই, মানুষ নেই বিজেপির সঙ্গে। আর হ্যাঁ এখনও অবদি আমাদের বাংলার নির্বাচনে মানুষ না চাইলে সরকারে এসে যাবে ততটা কায়দাবাজি দেখানো সম্ভব নয়।
