এবারে বাংলার ভোটে নির্বাচনী চিহ্ন ছাড়াই এক পার্টি তার সর্বশক্তি নিয়ে নেমে পড়েছে, সাংঘাতিকভাবে। এক অত্যন্ত মধ্যবিত্ত, সরকারি কেরানি, ছয় জনের সংসার, দিন চলে যায়, সাতে পাঁচে বা রুদ্রনীলে থাকেন না, কিন্তু সন্ধ্যে হলে গলায় দুপাত্তর ঢালেন, তাঁর রোজকার অভ্যেস, আর তা গলায় পড়লেই, না গালাগালি নয়, রাজনীতি নয়, কোনও অভাব অভিযোগের কথাও নয়, কেবল শ্যামল মিত্রের গান বের হয়, আপন মনে রাত দশটা সাড়ে দশটাতে তিনি বাড়ি ফেরেন, একেকদিন এক এক গান, আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, সাত সাগরের পারে গাইতে গাইতে ফেরা সেই নিরীহ ভদ্রলোক গতকাল বিজেপির গুষ্টির তুষ্টি করতে করতে ফিরছেন। সমস্যা হল, বলা নেই কওয়া নেই মদায়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ওই নির্বাচন কমিশন এবং এই সাতে পাঁচে এবং রুদ্রনীলে না থাকা ভদ্রলোকটিও জানেন যে নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি একই দল। তাঁর সার বক্তব্য হচ্ছে, এটুকু গণতান্ত্রিক অধিকারও যদি না বলে কয়ে কেড়ে নেওয়া হয়, তালে কীসের ভোট, কীসের নির্বাচন? গত পনের-কুড়ি বছর পরে বা সম্ভবত এই প্রথম তিনি প্রতিবাদ জানাতেই ভোট দিতে যাবেন। হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশন যা যা করছে তা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। এরকম আমরা কেন আমাদের বাবা কাকা জ্যাঠারাও এর আগে কখনও দেখেনি। আমরা জানতাম, দেশ চালান আইএএস, আইপিএস-রা, এখন জানা গেল, এমনকি রাজ্যের মুখ্য সচিব পদে কাজ করা আইএএস অফিসারও বিশ্বাসযোগ্য নয়, কলকাতা মহনগরের একজন পুলিশ কমিশনারও বিশ্বাসযোগ্য নয়, নির্বাচন কমিশন মনে করছেন তাঁদের পদে বসিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন করানো সম্ভব নয়। না, এরকম এক একচোখো নির্বাচন কমিশন আমরা এর আগে দেখিনি, সেটাই বিষয় আজকে, একচোখো ইলেকশন কমিশনের ভরসা এখন সাজোঁয়া গাড়ি।
নির্বাচনের আগে সাংবাদিক হিসেবে আমরা কিছু ছবি বহুবার দেখেছি, দেখেছি সিআরপিএফ-এর আসা, রুট মার্চ, নির্বাচনের দু-তিন দিন আগে আমলা, পুলিশ কর্তাদের নিয়ে একটা বড়সড় বৈঠক, যেখানে মূল বিষয়গুলোকে আবার বলে নেওয়া হত। এবারে ছবিটা দেখুন, রাস্তাতে সাঁজোয়া গাড়ি ঘুরছে, হ্যাঁ, সাঁজোয়া গাড়ি। মণিপুরে কুকি জো বিদ্রোহীরা রকেট ছুঁড়ছে, জবাবে মেইতেই সশস্ত্র গোষ্ঠী গ্রেনেড ছুঁড়ছে, হ্যাঁ, সেখানেও সাজোঁয়া গাড়ি ঘুরছে, বাংলাতেও ঘুরছে, তফাৎ হল তারই মধ্যে এ রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাচ্ছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পোস্ত দিয়ে রুটি খাচ্ছেন, আদিত্য নাথ যোগী বিবেকানন্দের মুখে নেতাজির বাণী বসিয়ে খোরাক হচ্ছেন, ওখানে সেই আগুন-গুলি-বোমা বন্দুকের সামনে কেবল সৈনিকেরা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সময় কই, তিনি তো বাংলাতেই ১৫ দিন কাটাবেন, মণিপুর যায়ে ভাঁড় মে। আমরা দেখছি নির্বাচনের আগে দু-আড়াইশ সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীর কর্তারা নির্বাচন বৈঠকে বসেছেন, হ্যাঁ, তাঁরাই নাকি এবারে নির্বাচন চালনা করবেন। সেই হাল্লা চলেছে যুদ্ধের মতো এক আবহে গণতন্ত্রের মহত্তম উৎসবে মাতবো আমরা, নির্বাচন কমিশন তার ব্যবস্থা করছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | ঝালমুড়ি খেয়েছেন? চা খেয়েছেন? এবারে আসুন
অনেক চেষ্টা করেই প্রভুর নির্দেশ মতোই নির্বাচন কমিশন বাদ দিয়েছেন ৯১ লক্ষ মানুষের নাম, এই মুহুর্তে খুব পরিস্কার যে কম করেও এই ৯১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৩৫-৩৭ লক্ষ জীবিত, বৈধ ভোটার, তাঁদের বাদ দিয়েই নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন হুমকি দিয়ে রেখেছেন এমনকি থানার ওসি আই সিকেও, ঘটনা ঘটলেই তাঁদের চাকরি নট। এতটা ট্রাস্ট দেফিসিট, এই চরম অবিশ্বাস নিয়ে এতবড় একটা কাজ হয়ে যাবে? এই বিরাট আয়োজনে কত শত ছোট ছোট খুটি নাটি ব্যাপার থাকে, সবটা ওই সাজোঁয়া গাড়ি আর মিলিটারি বুট দিয়ে সামলানো যাবে তো? সেই সন্দেহের কথা শুনছি নির্বাচন কমিশনের কর্মচারীদের মুখে, তাঁদের অনেকের বক্তব্য হল বহু গুরুত্বপূর্ণ ছোটখাটো ব্যাপার নাকি ধর্তব্যের মধ্যেও আনেনি এই নির্বাচন কমিশন, তার মধ্যে চলছে দেদার লুটপাট, এক প্যাকেট বিস্কুট, একটা ছোট ফ্রুট ড্রিঙ্কসের প্যাকেট, ভুজিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে মোট ৭০-৭৫ টাকার জিনিস কেনা হচ্ছে ২৫০-৩০০-৩৫০ টাকায়, মানে কামিয়ে নে কামিয়ে নে। গাড়ির তেল আর খুচরো খরচের টাকা নিয়ে চলছে একই নরক গুলজার। এখনও পর্যন্ত জানাই নেই যে, কত বুথে কানেকটিভিটি সিকিওর করা গিয়েছে, আর সব কিছু নিয়ে এক প্রবল অবিশ্বাস বিষয়গুলোকে আরও ঘোরালো করে তুলছে, যা নাকি নির্বাচনের দিনে দেখা যাবে। জানি না, এই খবরের কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে, কিন্তু এটা জানি যে, নির্বাচন যাঁরা করাচ্ছেন আর যাঁরা মাথায় বসে হুকুমবাজি করছেন তাদের মধ্যে বিস্তর অবিশ্বাস আছে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, বাংলার মানুষ কি এই নির্বাচন কমিশনকে বিজেপিরই এক অংশ বলে মনে করে? নাকি এই নির্বাচন কমিশন সত্যিই এক নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই ভোট করাবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
সত্যিই ভাবতে লজ্জাও হয় যে, এই নির্বাচন কমিশনের মাথায় ছিলেন টিএন শেসনের মতো লোকজন, এই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও মেনে চলতে হয়েছে, নির্বাচন চলাকালীন একজন প্রধানমন্ত্রীকেও সরকারি প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। সেই নির্বাচন কমিশন আজ চুপ করে দেখছে জাতির প্রতি ভাষণের নামে এক নির্লজ্জ প্রচার চালালেন দেশের প্রধানমন্ত্রী আর সঙ্ঘি জ্ঞানেশ কুমার চুপ করে বসে তাই শুনলেন। আমাদের দেশেই একজন প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন খারিজ হয়ে গিয়েছিল, কেন? কারণ তাঁর নির্বাচনী সভার আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন একজন সরকারি আমলা। প্রধানমন্ত্রীর নাম ছিল ইন্দিরা গান্ধী। আর আজ, নির্বাচন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী জাতীয় টিভি চ্যানেলে আধঘন্টা ধরে নির্ভেজাল নির্বাচনী প্রচার করলেন, জ্ঞানেশ কুমার সেই সময়ে সম্ভবত ঘুমোচ্ছিলেন।
দেখুন আরও খবর:
