সত্যি বলছি, মাসখানেক এসেছেন ‘লাটসাহেব’, নয়া রাজ্যপাল, কিন্তু এখনও কেন বিজেপির হয়ে ব্যাট ধরছেন না, এই নিয়ে একটা লেখা লিখব লিখব করছি, ঠিক সেই সময়ে প্রত্যাশা মতোই নয়া লাটসাহেবের বাঁট এক্কেবারে দিনক্ষণ দেখেই পয়লা বৈশাখ থেকে বিজেপির হয়ে কাছা খুলে প্রচারে নেমে পড়লেন। এক সভায় উনি পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ‘এ কাল এবং সে কাল’-নিয়ে কথা বলার সময়ে জানালেন স্বাধীনতার সময়ে আর পরবর্তী দশকগুলিতে দেশের সেরা তিন অর্থনীতির মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। “৬০-এর দশকে দেশের মোট জিডিপি-র ১০ শতাংশেরও বেশি আসত পশ্চিমবঙ্গ থেকে। তামিলনাড়ু, কর্নাটক বা গুজরাত থেকে নয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে। এই মাটি ছিল শিল্পের মাটি। এই মাটি ছিল সাংস্কৃতিক আর বৌদ্ধিক ভাবে প্রাণবন্ত। ১৯৮০-র দশকের আগে গোটা দেশে মাত্র চারটি রাজ্যের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ ১৫টা রাজ্যের লোকের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে ঢের বেশি। কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছি আমরা। যে রাজ্য গোটা দেশকে প্রগতিতে পথ দেখাত, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজ পরিস্থিতি খুব খারাপ।” এসব বলেই থামেননি, পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন, বলেছেন এই মাটি মা দুর্গার মাটি। পশ্চিমবঙ্গ যে নিজের গৌরব ফিরে পাবে, তা নিয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। মানে খুব পরিস্কার বাংলাতে পরিবর্তন আনুন, কেবল ওই পদ্মফুল চিহ্নে ভোট দিন এই কথাটুকু বলা ছাড়া লাটসাহেব যগুলো অর্ধসত্য বলা সম্ভব সবই বলেছেন। সেটাই বিষয় আজকে। নববর্ষ থেকেই বিজেপিকে জেতাতে মাঠে রাজ্যপাল।
লাটসাহেব মাঠে নেমে পড়েছেন, প্রথম বক্তব্য কেন মহারাষ্ট্রের জিডিপি, গুজরাতের জিডিপি বেড়ে গেল? সত্যিই তো, কেন বেড়ে গেল? লাটসাহেব কি সেটা বলেছেন? বললেই কিন্তু সত্যিটা বেরিয়ে আসবে, আর ঝোলা থেকে সাপ বেরিয়ে কামড়াবে, তাই কেবল ‘অশ্বথ্বমা হত’টা বললেন, ‘ইতি গজ’টা আর বললেন না। বললেন না যে স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আমাদের এই পূর্বাঞ্চলের ওপরে লাগু ছিল মাসুল সমীকরণ নীতি, আমাদের কয়লা কমদামে পেত মহারাষ্ট্র, গুজরাত, কিন্তু আমরা তুলো কিনতাম বেশি দামে। একবারও বললেন না যে, দেশ ভাগের সময়ে বাংলার সবথেকে বড় জুট ইন্ডাস্ট্রির কাঁচা মাল চলে গিয়েছিল পূর্ববঙ্গে, আমাদের দিকে পড়েছিল কারখানাগুলো, বললেন না তার পরেও কাঁচামালের যোগান আসার পরে কেন্দ্র সরকার পরিবেশ বিরোধী প্ল্যাস্টিকের বস্তা কিনতে শুরু করল, জুট শীল্প বসে বসে মার খেলো। ওই লাটসাহেব বললেন না যে, কেবল ৮০ সাল থেকে আজ অবধি এই বাংলার থেকে কেন্দ্র সরকারের, বা রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের বড় বড় ২৭টা দফতরের হেড কোয়ার্টার সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেশের অন্যান্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে।
আরও পড়ুন: Aajke | হাজার কোটি চাইলেন হুমায়ুন, ইডি কেন চুপ?
লাটের বাঁটের জানাই নেই যে, কলকাতার এই মুহূর্তে জিডিপি ১২.৪৫ লক্ষ কোটি, বেঙ্গালুরুরু ১০.৯ লক্ষ কোটি। কলকাতার জায়গা এই মুহুর্তে তিন নম্বরে মুম্বই আর দিল্লির তলায়। লাটের বাঁটের জানাই নেই যে, যদি গুজরাতের জিডিপি থেকে আম্বানি আর আদানির সম্পদ অকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে গুজরাত দেশের সবথেকে কম সম্পদশালী রাজ্যের একটা, ওই লাট সাহেবের জানাই নেই যে, এই মুহুর্তে বেঙ্গালুরু অঞ্চলকে কর্ণাটক থেকে বাদ দিলে গোটা কর্ণাটকের পার ক্যাপিটা ইনকাম বাংলার থেকেও অনেক কম। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পর থেকে এক ধারাবাহিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে বাংলাকে, কিন্তু তারপরেও বাংলা এখনও মাথা উঁচু করে চলেছে, এখানে গত ৪৫-৫০ বছরে কোনও বড় দাঙ্গা হয়নি। এই লাটসাহেব যদি এতটুকুও সত্যি বলতেন তাহলে ওনার বলা উচিত ছিল যে ধর্ষণের স্ট্যাটিসটিক্স বলছে এই মুহূর্তে বিজেপি শাসিত, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার তালিকার সবথেকে উপরে থাকা পাঁচটা রাজ্য, কই সেখানকার রাজ্যপাল কি একবারের জন্যও এই নিয়ে একটা কথাও বলেছেন? আমরা আমাদের দর্শকদের প্রশ্ন করেছিলাম, রাজ্যপাল খুল্লম-খুল্লা বিজেপির প্রচারে নেমেছেন, বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইছেন, বাংলা কত পিছিয়ে তার মিথ্যে তথ্য দিয়ে আর্ধসত্য বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন, ওনার কি রাজ্যপালের পদে বসে নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রচারে নামা উচিত? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
সত্যিই বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তিত রাজ্যপাল? যদি তাই হত উনি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর জন্য আর ক’টা দিন অপেক্ষা করতেন, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে আসার পরে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করে জানাতেন তাঁর মতামত, তা না করে প্রকাশ্যে রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা আর সমস্যা নিয়ে অর্ধসত্য আর মিথ্যে বলে এক নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়লেন। বাংলার মাটি ওনার জানা নেই, এই বাংলাতে পদ্মফুলের চাষ আজ নয়, কোনওদিনও হবে না, সেই হাওয়াই চটির সঙ্গেই কাটাতে হবে অনেকটা সময়। বরং এই সুযোগে আপনি গত দুই রাজ্যপাল, তাঁদের কাঠিবাজী আর শেষমেষ পরিণতি নিয়ে খানিক পড়াশুনো করুন। কাজে দেবে। আর অন্য পথ তো খোলা, লাটসাহেবের বাগান থেকে বের হয়ে গেরুয়া পরে আরএসএস–বিজেপির প্রচার করুন, ‘ঘোমটার তলায় খ্যামটা নাচা’টা এ বঙ্গের মানুষ খুব ভালোভাবে নেয় না।
দেখুন আরও খবর:
