আর ক’টা দিন। হাঁকডাকে ভরে উঠেছে এই বাংলার ভোটের বাজার। এই মুহূর্তে সেই ভোটবাজারে একটা প্রশ্ন কিন্তু বারবার শোনা যাচ্ছে, হুমায়ুন কবীর কি এখানে চা খেতে এসেছিলেন? কিন্তু কেন এই প্রশ্ন ? ‘কেন’র আগে ‘কে’। হ্যাঁ হুমায়ুন কবীর কে? এটা যদি আগে একটু খোলসা হয়ে যায়, তাহলে উনি কোথায় কোথায় চা খেতে গিয়েছিলেন বা যেতে পারেন, সেটাও বোঝা আরও সহজ হবে।
হুমায়ুন কবীর। জন্ম ৩ জানুয়ারি ১৯৬৩। রাজনীতি করেন। ২০১১-তে রেজিনগর থেকে কংগ্রেসের হয়ে এমএলএ সিটে জয়লাভ এবং তারপর দলবদলু করে তৃণমূলে। ২০১৫-তে তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুনকে ছ’মাসের জন্য সাসপেন্ড করে। এরপর হুমায়ুন নিজের দল তৈরি করেন, তারপর বিজেপিতে যান। ফের ২০২১-এ তৃণমূলে ফেরেন এবং ভরতপুর থেকে তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক হন। কিন্তু বিধি বাম। ২০২৫-এ হুমায়ুন ক্ষেপে উঠলেন বাবরী মসজিদ বানাবেন বলে। সে নিয়েও আরেক গন্ডগোল। মসজিদ বানাবেন বলে উনি নাকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছিলেন, কিন্তু পরে শোনা যায়, তারা নাকি সবাই এলাকারই লোকজন, মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ বলে তাঁদের চালাচ্ছিলেন হুমায়ুন। কিন্তু এর থেকেও বড় কথা হল, বাবরি মসজিদ বানানোর জন্য হুমায়ুনের এই লাফালাফি মমতা ব্যানার্জি সহ্য করলেন না। হুমায়ুনকে তৃণমূল কংগ্রেস সিধে দল থেকে বের করে দিল। কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়বার পাত্র হুমায়ুন কবীর নন। গোটা কতক লোক জোগাড় করে, এই ধরুন পাঁচসাতজন, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বলতে শুরু করলেন, তিনি যে দলে থাকবেন, সেইদিকেই তিনি মুসলিম ভোট টেনে নেবার ক্ষমতা রাখেন।
আপনি, যিনি এই মুহূর্তে ‘আজকে’ দেখছেন, এই জায়গাটা মন দিয়ে ফলো করবেন, কেন না এখান থেকেই আসল গপ্পো শুরু। ২০২৬-এ, বাংলার ভোটবাজারে হুমায়ুন কবীরের একটা স্টিং ভিডিও ভাইরাল হল। সেখানে দেখা গেল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর জন্য হুমায়ুন কবীর বিজেপির সঙ্গে ডিল করছেন। কত টাকার ডিল? হাজার কোটি। এই ভিডিওতে হুমায়ুনের মুখে বারবার শোনা গেল শুভেন্দু অধিকারীর নাম। এছাড়াও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের নামও নাকি উঠে এসেছে হুমায়ুনের এই দরাদরিতে। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর জন্য এই হাজার কোটির রফা করছেন। আর কি হল? বিজেপি ও শুভেন্দু অধিকারীর সাথে গোপন আঁতাত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগে হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে সিউড়ি থানায় অভিযোগ জমা পড়ল। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ যেটা, তা হল- এই বিতর্কের জেরে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম, হুমায়ুনের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (AJUP) সাথে জোট ভেঙে দিয়ে বাংলায় একলা লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি, হুমায়ুনের দলের রাজ্য সভাপতি খোবায়েব আমিনও পদত্যাগ করেছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | কমিশন না কি বিজেপির ফাঁদে বাংলা?
এবার একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি। খবরটা অনেকে নিশ্চয়ই জানেন তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ফের সক্রিয় ইডি। শনিবার সকালে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাকতলার বাড়িতে হানা দেয় কেন্দ্রীয় সংস্থা। সঙ্গে ছিল বিপুল কেন্দ্রীয় বাহিনী। এদিনই ফের তলব করা হয়েছে রাজ্যের মন্ত্রী সুজিত বসুকেও। যদিও তিনি নিজে হাজির না হয়ে ছেলেকে পাঠিয়ে দেন। সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন ধরেই পার্থকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হচ্ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি হাজিরা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। সেই জন্যই বাড়িতে এসে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ইডি। রাজনৈতিক মহলে ইডির এই হানা কিন্তু নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে। এখন কথা হল হাজার কোটির অভিযোগ, তাও এমন একটা সময়ে, যখন গণতন্ত্রের সুরক্ষা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু ইডির তরফে বিন্দুমাত্র কোন হেলদোল নেই। বিহারের ভোটেও কিন্তু ঠিক এরকমটাই হয়েছিল। হুমায়ুন কবীর যদিও দাবি করেছেন ভাইরাল ওই ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু আজকের দিনে কোন ভিডিও এআই কিনা, সেটা তো কয়েক ঘন্টায় জানা যেতে পারে। বিশেষ করে বিজেপি সরকার যখন দেশে এআই নিয়ে সম্মেলন করছে, সে সময় এরকম একটা ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা কি খুব বড় কিছু?
না, এরকম কিন্তু এখনও কিছু হয়নি। হবে কি? আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি বিরোধীরা কিন্তু বারবার অভিযোগ করেছেন, ভয় দেখানোর জন্য, প্রতিহিংসার রাজনীতি করার জন্য ইডি আর সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে মোদি সরকার ব্যবহার করে থাকে। মুকুল রায়ের ব্যাপারটাই দেখুন না। সারদা নারদা চিটফান্ড, এসব নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল। কি হল? মুকুল রায় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন। এবং তারপর কিন্তু আর কোন তদন্ত নেই! এই কারণেই তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে ‘ওয়াশিং মেশিন’ বলেছিলেন। যত ময়লাই থাকুক বিজেপিতে ঢুকলেই সব সাফ। এ যেন শোলের জয়, ওরফে অমিতাভ বচ্চনকে বলা মউসির সেই ডায়লগ- ‘তুমহারা দোস্ত জুয়াড়ি হো, সরাবি হো, লেকিন উসকা কোই দোষ নেহি’। এসবই বিজেপির লীলা। আসুন, এবার এই ওয়াশিং মেশিন কালচার নিয়ে মানুষ কী বলছে, একটু দেখে নেওয়া যাক।
এই তো অবস্থা। এর মাঝখানে আরও একটা বিষয়ে আপনাদেরকে লক্ষ্য রাখতে বলছি। দেখবেন, ভোট এলেই বিজেপির বিরোধী দলের ভেতর থেকে কোনও না কোনও প্রতিবাদী দেখা দেয়। যে বা যারা বলতে থাকেন, বিরোধীদের এই খারাপ, ওইখানে দুর্নীতি, সেইখানে নোংরা। পাশাপাশি আর কী বলেন? বলেন, মোদিজি সাক্ষাৎ ভগবান। এসবের পিছনে যে নগদ কড়ির ঝনঝনানি রয়েছে, সেটা বুঝতে বোধহয় খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। হ্যাঁ, এটাই বিজেপির প্যাটার্ন। কিনে নেওয়া, খরিদ করা। যেখানে সেটা সম্ভব নয়, সেখানে হাত মেলানো, গাটবন্ধন তৈরি করা। তারপর, সেই সহযোগী ছোট দলকে পুরোপুরি গিলে নিয়ে, পুরো ক্ষমতাটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়া। কিন্তু মুশকিল হল, এই ছকটা এবার মানুষের চোখে ধরা পড়ে যাচ্ছে। সাথে ইডি সিবিআই, হবে জয়- এই দিয়ে কি আর বাজার দখল করা যাবে? ২৬-এর ভোটেই তার উত্তর মিলবে।
দেখুন আরও খবর:
