এই বাংলাতে বিজেপির সংগঠনকে ধরে রাখা আর বাড়িয়ে তোলার যাবতীয় কৃতিত্ব দুজনের বেশি তিনজন করতেই পারে না। প্রথমজন হলেন তপন সিকদার, সেই জনসঙ্ঘের আমল থেকে প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে থাকতেন ওই মুরলীধর লেনে। উনি অবশ্য তেমন হেক্কড়বাজ কেউ ছিলেন না, কিন্তু যেখানে যতটুকু পেরেছেন সংগঠন বাড়ানোর কাজ করেছেন আর মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পরে সামান্য জীবনযাপন বদলালেও শেষ পর্যন্ত সংগঠন বাড়িয়েছেন, বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, খুব বেশি না বাড়লেও অন্তত ধরে রেখেছিলেন। তাঁর পরের জন হলেন দিলীপ ঘোষ। অচানক এসে হাজির হলেন এবং সময়টাও ওনার পক্ষেই ছিল, সবেমাত্র মোদিজি এসেছেন, সিপিএমের তলার সারির ক্যাডার, কর্মীরা ঝাড় খেয়ে অতঃপর বিজেপিমুখো হচ্ছেন, সেই সময়ে উনি ভোকাল টনিক দিয়ে চাগিয়ে তুলেছিলেন সংগঠনকে। ইউটিউব দেখুন, দার্জিলিংয়ে গিয়ে সোজা বাংলায় মার খেয়েছেন, দৌড় করিয়েছে সেখানকার জনমুক্তি মোর্চার সমর্থকরা, কিন্তু দান ছাড়েননি। গলায় গামছা আর বাইকে চেপে দিলীপ ঘোষ সেখানেই হাজির হয়েছেন যেখানে ডাক পেয়েছেন, মারলে হাত ভেঙে দেব, একটা মারলে দশটা মারব, বুদ্ধিজীবীদের রগড়ে দেব, গরুর দুধে সোনা আছে, রামমন্দিরের ভূমিপূজন দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস, এরকম আরও কত কী। এবং ২০১৯, দুই থেকে ১৮, ১৬ জন সংসদ এনে দেওয়ার কৃতিত্বের ভাগীদার তো উনিই। সেই উনি এখন দলে অচ্ছুৎ, দলের সদর দফতরে গেলে বড় করে খবর হয়, দিলীপ ঘোষ এলেন সদর দফতরে। সেই দিলীপ ঘোষ এখন এমনকী কলকাতার উপকণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর সভায় ডাক পান না, সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, দিলীপ ঘোষ, চুপ করে বোস।
২০১৯-এ বিরাট এক সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি, আজ বসে তার হাজার একটা কারণ বলাই যায় কিন্তু বর্শামুখ ছিলেন দিলীপ ঘোষ, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না। এবার সেই দিলীপ ঘোষকেই সামনে রেখে ২০২১-এ বিধানসভা নির্বাচনে নামলে কি বিজেপি জিতেই যেত? মনে হয় না কিন্তু এরকম এক ছিন্নভিন্ন অবস্থাতে বিজেপি পড়ে থাকত না। দিল্লিওলাদের চিরটা কাল সোনার হাঁস কেটে খাওয়ার সাধ, তাঁরা ২০২১ এই গদি চাই আর তার জন্য ক’দিন আগেই চোরচোট্টা বলে দাগিয়ে দেওয়া শুভেন্দু থেকে রাজীব ইত্যাদিদের দলে এনে ঝোপ বুঝে কোপ মারার পরিকল্পনা করেছিল, ডিমও পাওয়া গেল না, হাঁসও মরেই গেল।
দলের লোকজনেদেরই চক্ষু চড়কগাছ, মাত্র এক দেড় বছর আগে যে শুভেন্দু জেলায় জেলায় তৃণমূলের হয়েই তাণ্ডব করে বেড়িয়েছেন, তিনি জয় শ্রীরাম বলে শুদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মুখ। হ্যাঁ দিলীপ ঘোষ ২০২১ জিতিয়ে দিতে হয়তো পারতেন না, কিন্তু দলের কর্মীদের মনোবল বজায় থাকত, পরের লড়াই লড়ার প্রস্তুতি নিত, কিন্তু এই নব্য তৃণমূলি বিজেপিদের দেখে তাঁরা দম হারালেন, অ্যাডভানটেজ তৃণমূল, তারা ঝোলা ভরে নিয়েই বাড়ি ফিরলো আর কেবল তাই নয়, ওই ২১-এর নির্বাচনের আগে যে বিষবৃক্ষ পোঁতা হয়েছিল রাজ্য বিজেপিতে, তা এখনও ফল দিয়েই যাচ্ছে। এক দুধুভাতু রাজ্য সভাপতি কেবল শক্তি চাটুজ্যের কবিতা পড়েই তা সামলে নেবেন সেটা ভাবা বোকামিই হবে। বাস্তবে সেটাই হচ্ছে। রাজ্য সভাপতির টেনিওরে সবচেয়ে বেশি সাংসদ, সবচেয়ে বেশি বিধায়ক দিতে পারা প্রাক্তন সভাপতিকে এখন মুখ লুকোতে দিল্লি মুম্বই চলে যেতে হচ্ছে। শিলিগুড়িতে এলেন প্রধানমন্ত্রী, উনি ডাক পাননি, টিভিতেই শুনলেন মোদিজির বক্তৃতা। দুর্গাপুরে ডাক পাননি দল এবং নিজের মুখ বাঁচাতে চলে গেলেন দিল্লি, ভাগ্যিস সেখানে নাড্ডাজি একটু সময় দিয়েছিলেন। এবার কলকাতার উপকণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা, এবারেও উনি ডাক পাননি, তো কী করবেন? হয় দিল্লি নয় নাগপুর যাবেন, সকাল বেলায় এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদের বলবেন দলের কাজেই বাইরে যেতে হচ্ছে এই তো। আসল সত্যিটা তো মানুষ জেনে গেছে। মোদি–শাহ নেতৃত্ব হেকেঁই বলে দিয়েছে, দিলীপ ঘোষ, চুপ করে বোস। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে দিলীপ ঘোষ যাঁর সভাপতিত্বের আমলে বিজেপি ১৮ জন সাংসদ, ৭৭ জন এমএলএ পেয়েছে, যা এক রেকর্ড, সেই প্রাক্তন সভাপতি এমন কী করলেন যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাতে সামান্য ডাক পর্যন্ত পাঠানো হচ্ছে না? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
দিলীপ ঘোষের চেহারা আর ওই হেক্কড়বাজির সঙ্গে দলবদলটা খাপ খায় না, হ্যাঁ এটা আমাদের এই অনুষ্ঠানে আমি বার কয়েক বলেছি। যখন ২১ জুলাইয়ের আগে সবাই বলছিলেন এবারে দল বদলাবেন দিলীপ, আমরা বলেছিলাম না, উনি বিজেপিতেই থাকছেন, দরকারে আবার আরএসএস-এ ফিরে যেতে পারেন, দলের কাজ করা বন্ধ করতে পারেন কিন্তু দল ছাড়বেন না। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সীমা থাকে। এরকম অপমান সহ্য করে সেই দলে কীভাবে টিকে থাকবেন এটা শুধু ওনার প্রশ্ন নয়, আমাদেরও প্রশ্ন। আর এখন তো মনেই হচ্ছে যে বিজেপির অন্তত এক অংশ মনেপ্রাণে চায় যে উনি তৃণমূলে চলে যান, উনি কি সেই ফাঁদেই পা দেবেন?

