“পুশব্যাকের রাতটা ভয়ংকর। বিএসএফের মারে পড়ে রয়েছি সীমান্তে। বিএসএফ বলছে আমরা ভারতীয় নই, আর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা বলছে, এগোলেই গুলি করবে বা জেলে ভরবে। কেঁদে কূল পাচ্ছিলাম না।”
হ্যাঁ, তিনজন বাঙালির দোষ তাঁরা বাংলাভাষায় কথা বলেন, তাঁদেরকে আনা হয় মেখলিগঞ্জে, সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় নো ম্যানস ল্যান্ড-এ। এবার এদিকে বিএসএফ, ওদিকে বিজিবি, হাতে উদ্যত বন্দুক। একবার নয়, বারবার আমরা দেখেছি, একসময় বিজেপি শাসিত কর্নাটকে দেখেছি বাঙালিদের ঘর দোকান উজাড় করে দিতে, কিছুদিন আগেই গুজরাটে দেখেছি কীভাবে কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাই তাদের গরুগাধার মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটানো হয়েছে, ঘরদোর ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। আমরা একই ঘটনা দেখেছি দিল্লিতে, সেখানেও বাংলায় কথা বললে তাদের রোহিঙ্গা বলা হচ্ছে, ধরে এনে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। আমাদের সংবিধানে ২২টা ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, বাংলা ভাষা তারমধ্যে অন্যতম। সেই বাংলা ভাষাতেই রবিঠাকুরের লেখা গান আজ জাতীয় সঙ্গীত। সেই বাংলা ভাষাতেই লিখে সাহিত্যে একমাত্র নোবেল। সেই রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতনে পড়া অমর্ত্য সেন পেয়েছেন অর্থনীতিতে নোবেল, সেই বাংলাভাষী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন অর্থনীতিতে নোবেল। সেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আপাতত দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। সেই বাংলা ভাষা বলাটা আজ পাপ? সেই বাংলা ভাষায় কথা বললে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ড-এ পাঠিয়ে দেওয়া হবে? হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রী তীব্র নিন্দা করেছেন, হ্যাঁ বাম, কংগ্রেস থেকে এই ঘটনাগুলোর নিন্দে করা হচ্ছে, কিন্তু আশ্চর্য, আমাদের বিরোধী দলনেতা চুপ, আমাদের রাজ্যের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা চুপ, নির্বাচিত বিজেপি সাংসদ বিধায়কদের একজনও প্রতিবাদ করেননি। তাঁরা কি বাঙালি নন? সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, কাঁথির খোকাবাবু, বিরোধী দলনেতা, শুভেন্দু অধিকারী কি বাঙালি নন?
আরও পড়ুন: Aajke | সন্দেশখালি, নির্বাচনের আগে রেখা পাত্রও কি তৃণমূলে চলে আসতে পারেন?
সদ্য মুক্তির স্বাদ পাওয়া ওঁরা চারজন, এখনও ভুলতে পারছেন না সেই রাতের কথা। যাঁরা মুম্বইয়ে স্রেফ বাংলায় কথা বলার জন্য সেখানকার পুলিশের কাছে ‘বাংলাদেশি’ চিহ্নিত হয়ে পুশব্যাকের শিকার হয়েছিলেন। বিএসএফের মদতেই। শেষে রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে ঘরে ফিরছেন সকলেই। ভগবানগোলা থানার হোসেননগর পূর্বপাড়ার মেহবুব শেখ ফিরছেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ হয়ে। আর বাকিরা কোচবিহার পুলিশের সাহায্যে তাদের ঘরে ফিরেছেন। মেখলিগঞ্জ থানার বাইরে এসেই পুশব্যাকের সেই ভয়ঙ্কর রাতের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। মুর্শিদাবাদ জেলার হরিহরপাড়া থানা এলাকার নাজিমুদ্দিন মণ্ডল, বেলডাঙার মিনারুল শেখ, পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বর থানার মুস্তফা কামাল ভেবেছিলেন, এবার সারাজীবন বাংলাদেশের জেলে পচেই মরতে হবে। আর ভগবানগোলার বাসিন্দা মেহবুব বলেন, “পুশব্যাকের রাতটার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। বিএসএফের মারে সারা শরীরে ব্যথা। পড়ে রয়েছি সীমান্তে। বিএসএফ বলছে আমরা ভারতীয় নই, আর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা বলছে, একটু এগোলেই গুলি করবে বা জেলে ভরবে। কেঁদে কূল পাচ্ছিলাম না। ভাগ্যিস মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবেদন জানানো আমাদের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল।” তাঁরা জানান, “ভাগ্যিস কোচবিহার জেলা পুলিশ এবং মেখলিগঞ্জ থানার পুলিশ এসে হাজির হয়, তাদের জন্য বাড়িতে ফিরেছি। মুম্বইয়ে এখন চলছে বাংলাদেশিদের ধরো অভিযান, তো কীভাবে বুঝবেন যে সে বাংলাদেশি? বহু আগে কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলেছিলেন সাতসকালে চিঁড়ে খেলেই জানবেন সে বাংলাদেশি, আর আপাতত একমাত্র ক্রাইটেরিয়া হল এই লোকটা বাংলায় কথা বলে এবং মুসলমান, আর সে মুম্বই, আমেদাবাদ, দিল্লি বা রায়পুরে থাকে। তো সেইরকম এক অভিযানের ধরপাকড়ের সময় ওই তিনজনকেও আটক করা হয়। তাঁরা কিন্তু ভারতীয় নাগরিকত্বের সব প্রমাণ দেখিয়েছিলেন, তাতে কী? তাঁদেরকে বাংলাদেশিদের সঙ্গেও পুশব্যাক করার জন্য প্রথমে পুনেতে বিএসএফের দফতরে তারপর সোজা আগরতলা নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর সেখান থেকে ওই তিনজনকে কোচবিহারের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশব্যাকের চেষ্টা হয়। কিন্তু বিজিবি বাধা দিলে তাঁর সীমান্তে আটকে থাকেন ‘না ঘর কা, না ঘাট কা’ হয়ে। এটাই প্রথম তো নয়, এর আগেও এমনটা বহুবার হয়েছে। ক’দিন আগেই, ২০২৫ সালের মে এবং জুন মাসে, অসম সরকার ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বেশ কিছু ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে, যাকে ‘পুশব্যাক’ বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের দেশে ঢুকতে দিতে অস্বীকার করলে, এই মানুষগুলো দুই দেশের সীমান্ত চৌকির মধ্যবর্তী ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’-এ আটকে পড়ে। অসমের করিমগঞ্জ, দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের মতো বিভিন্ন এলাকা দিয়ে একাধিক দফায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বেশ কয়েকটি দলকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ব্যক্তিরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশকারী বাংলাদেশি নাগরিক। তারা প্রত্যেকে অসমে ২০-২৫-৩০ বছর ধরে বাস করে, সরকারি চাকরি করে, তাদের কাছে তাদের ভ্যালিড পরিচয় পত্র আছে। কিন্তু সমস্যা হল বাংলাতে কথা বলা সেই মানুষগুলো মুসলমানও বটে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কেবল বাংলায় কথা বলে আর তারা মুসলমান বলেই তাদেরকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে মোদি সরকারের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। আর এ ব্যাপারে একটাও কথা বলছেন না এ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। আপনারা কী বলছেন? শুনুন মানুষজনের কথা।
আসলে বিজেপি আদতে এক হিন্দিভাষী, তীব্র মুসলমান বিরোধী দল। তাদের দল বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ঘৃণা করে, বাংলার মাছ মাংস খাওয়াকে ঘৃণা করে, বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করে। এক হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থান স্লোগান নিয়ে বেড়ে ওঠা দল বাংলার এই কমপোজিট কালচার, এই বহুস্বর, এই সম্প্রীতি কোনটার সঙ্গেই পরিচিত নয়। তার উপরে সারা দেশের তাদের বিজয়রথের ঘোড়া বার বার আটকে যাচ্ছে এই বাংলাতে এসে, সেখান থেকেও এক রাগ জন্ম নিয়েছে যা গোটা দলটাকেই বাংলাবিরোধী, বাঙালি বিরোধী করে তুলেছে। শুভেন্দু অধিকারী তার ব্যতিক্রম নয়।
