আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশে থাকলে নির্বাচনের প্রচার করেন, আর বিদেশে থাকলে বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে হেঁ হেঁ গলা জড়াজড়ি ইত্যাদি। এটাই ওনার রুটিন। গত সাত-আট বছরে দেশের মানুষ বুঝে গিয়েছেন এখন উনি কোন মুখো হবেন, আর কোন ধরণের চুল কাটবেন, কোন ধরণের টুপি পরবেন, কোন কোন ভাষার দু-চারটে কবিতা মুখস্থ করবেন। আমাদের এসব জানা হয়ে গিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের পাগড়ি দেখেছেন? সেই ডোরাকাটা পাগড়ি। শোনা গেল, কীভাবে শোনা গেল? ওই যে দুষ্টু লোকজন জানলার সামনে এসে বলে গেল, “আমাদের অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ নাকি উনিজির মাথার সাইজের ওই পাগড়ি বানানোর কাজে মন দিয়েছেন”। গতবার সেজেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এবারে শোনা যাচ্ছে উনি বঙ্কিম’দা সেজে মাঠে নামবেন। নামুন, দয়া করে কোটি কোটি ভুজৈধৃতখরকরবালে ইত্যাদি ভালো করে প্রাকটিস করে আসবেন, নাহলে কীসে ভুজ্যম ইত্যাদি হবে, সে আরেক কেলেঙ্কারি। তো সেই উনিজি মার্চে ব্রিগেডে আসবেন, ‘সুনার বাংলা’ গড়ার শপথ নেবেন, এ রাজ্যে ডেমোগ্রাফিক মানচিত্র বদলে গিয়েছে বলে ঢপ দেবেন, দিন। আমরা শুনবো, কিন্তু আমাদের জানাতে হবে গুজরাতের আহমেদাবাদে বাংলা থেকে কাজ করতে যাওয়া সোনামণি বৈরাগ্যকে খুন করল কারা? কারা তাঁর দেহে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিল? কোন আইনশৃঙ্খলার কথা বলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী? সারা দেশ জুড়ে বাংলা বললে বাংলাদেশি, বাংলা বললে ‘পিটিয়ে মারো’, আর উনি এই বাংলাতে এসে ভোট চাইবেন? কোন মুখে? সেটাই বিষয় আজকে, ব্রিগেডে আসবেন মোদিজি, এসে জানান আহমেদাবাদে সোনামণি বৈরাগ্যকে খুন করল কারা?
শেফালী কর্মকারের মেয়ে সোনামণি বৈরাগ্যের মৃত্যুর খব পাঠানো হয় আহমেদাবাদ থেকে, যেখানে সে একটা ছোট হোতেলে কাজ করত। না, পুলিশ সেখানে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, সোনামণির মা চিঠি লিখে এফআইআর করেছেন। তাঁর চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘সোনামণি বৈরাগ্য (বয়স-৩৮ বছর) আমার মেয়ে। তাঁর স্বামী মিঠুন বৈরাগ্য, গ্রাম-ধোবা, পোস্ট-চড় মানিকনগর, থানা-নাদনঘাট। প্রায় ২০ বছর আগে হিন্দু শাস্ত্র মতে মিঠুনের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সংসারে অভাব থাকার কারণে, আমার মেয়ে গত দেড় বছর আগে গুজরাতের আহমেদাবাদে একটি রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজে গিয়েছিল। রেস্টুরেন্টের নাম ‘আন্ডার দ্য নিম ট্রিস’, যেটি সোলা থানার অন্তর্গত থালতেজ পুলিশ চৌকির অধীনে পড়ে। গত ১৩.০২.২০২৬ তারিখ ভোর ৪টে নাগাদ আমি ফোনে খবর পাই যে, আমার মেয়ে ওই রেস্টুরেন্টের ঘরের মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আমার মেয়ে নিজে থেকে আত্মহত্যা করতে পারে না। তাঁকে কেউ মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছে। তাই আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, দয়া করে বিষয়টি তদন্ত করে দেখুন এবং যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিন। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’
আরও পড়ুন: Aajke | ‘মমতা রাজ্যকে ভোগে পাঠিয়েছে!’ আসুন দেখি সত্যি নাকি
এক কন্যা হারানো মায়ের আকুতি মোদিজির কানে গিয়েছে? ভোট কেবল ভোট চাই? কেবল ক্ষমতা আর বিভেদের বিষ? আমরা জিজ্ঞেস করব না এই বহুরূপী প্রধানমন্ত্রীকে, কেন ওনার রাজ্যে এক বাঙালি কন্যার এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তও করে দেখা হচ্ছে না? কাকে লুকানোর জন্য, কাকে আড়াল করার জন্য এই ব্যবস্থা? সবচেয়ে বড় কথা হল, কেবল তো সোনামণি নয়, গত কয়েক মাসে পুরুলিয়ার সুখেন মাহাতোকে মহারাষ্ট্রে পিটিয়ে মারা হল, পুরুলিয়ার রমেশ মাঝিকে ওড়িশাতে মারা হল, বীরভূমের সোমনাথ দেবনাথকে মারা হল মহারাষ্ট্রতে, রাজস্থানে মালদহর হরিবোল ঘোষকে মারা হল, জলপাইগুড়ির দীপু দাসকে মহারাষ্ট্রের মারা হল, কোচবিহারের হিমঙ্কর পালকে অসমে পিটিয়ে মারা হল, মুর্শিদাবাদের জুয়েল রানাকে ওড়িশাতে, সাবির আলি মল্লিক দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার, পিটিয়ে মারা হল হরিয়ানাতে, হুগলির শেখ সৈদুল্লাকে ইউপিতে। খেয়াল করুন, কেবল মুসলমান নয়, হিন্দুদেরও একইভাবে পিটিয়ে মারা হচ্ছে, আর সেটা বেশিরভাগই হচ্ছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে। এদিকে ওনাদের মোড়ল উনিজি আসবেন এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, বাংলা কবিতা টেলিপ্রম্পটারে দেখেও ভুল উচ্চারণে পড়বেন, আর এসব সার্কাস যখন করবেন তখন বাঙালিরা প্রশ্ন তুলবে না, বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি পেটানো হচ্ছে কেন? আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন প্রচার করতে আসবেন, এদিকে দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো থেকে একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে, বাংলা বললেই বাংলাদেশি বলা আর পিটিয়ে মারার। ওনার কি এই বাংলার আইন শৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলার কোনও অধিকার আছে? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।
আসলে সারা দেশে দল হিসেবেই বিজেপি এক চুড়ান্ত বাংলা বিরোধিতা ছড়িয়েছে। বাঙালি মানে মাছ মাংস, বাঙালি মানেই বিজেপি বিরোধী, বাঙালি মানেই প্রতিবাদী, বাঙালি মানেই মোদি বিরোধী, বাঙালি মানেই ঘুসপেটিয়া। এই লাগাতার প্রচারের ফলেই দেশজুড়ে ওই অন্ধভক্তদের এক বড় অংশ সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো শুরু করেছে, তার ফল আমরা দেখছি। কেউ বাংলা বললেই সে ঘুসপেটিয়া, সে বাংলাদেশি, সে অপবিত্র, সে মোদিবিরোধী, অতএব তাঁকে পেটাও, তাঁকে তাড়িয়ে দাও। হ্যাঁ, বিশেষ করে ওই বৈসরন ভ্যালিতে জঙ্গীহানার পর থেকে এই ন্যারেটিভ আরও বড় করে ছড়ানো হয়েছে, আর ঠিক তখন থেকেই এই ন্যারেটিভগুলো বাজারে ঘুরছে। মজার কথা হল, রাষ্ট্রপ্রধানের বাচালতার কথা সবাই জানেন, কিন্তু এই বিষয়ে তিনি এখনও একটা কথাও বলেননি। সেই তিনি কোন মুখে বাঙালিদের ভোট চাইতে আসবেন?
দেখুন আরও খবর:
