Aajke | শুভেন্দু অধিকারীর ‘রামরাজ্য’, এনকাউন্টার, বুলডোজার আর ঘৃণার পাহাড়

0
26

ভবানীপুরে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘হিন্দু বিরোধী, সনাতন বিরোধীদের বিনাশ চাই। বাংলায় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’ ওনার মুখে এই সনাতন সনাতন কথাটা শুনতে শুনতে কান পচে গিয়েছে, বহুবার বলেছি, কিন্তু ওনার বোধে চিন্তায় সে কথা ঢোকেনি, ঢোকার কথাও নয়। হিন্দু ধর্মাচরণে কোনও শৃঙ্খলা ছিল না, এমনকি ঘোষিত নাস্তিক চার্বাক হয়েছিলেন মহর্শি চার্বাক, বেদ পাঠে কোনও মানা ছিল না, সমাজে নারীরা ছিল স্বাধীন, হ্যাঁ, কেবল উচ্চ বর্ণের নয় নিম্ন বর্ণের নারীরাও তাঁদের স্বামীকে বেছে নেবার কথা প্রকাশ্যেই বলতে পারতেন, শুদ্র বা ব্রাহ্মণ বিভাজনে ভিত্তি ছিল তাঁদের কাজ। কিন্তু মধ্যযুগে এসে এক ব্রাহ্মণ্যবাদ দখল নেয় ধর্মের পরিসরকে, বংশানুক্রমিক বর্ণ প্রথা চালু হয়, আর সেই ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বজাধারীদেরই সনাতন বলা হত, তাঁদের তৈরি করা আইন-কানুন, রীতি-নীতির বিরোধীদের সনাতন বিরোধী বলে চিহ্নিত করা শুরু হয়, সেই জন্যই রামমোহন রায় থেকে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে মাইকেল বা রবি ঠাকুর- ক্রমশ সনাতন বিরোধী হয়ে ওঠেন। কারণ ধর্মের ওই জাল না কেটে মুক্ত জ্ঞান চর্চার বাইরে থেকে মানুষের বিকাশ সম্ভব নয়, এটা তাঁরা বুঝেছিলেন। হ্যাঁ, তারপর থেকে বাঙালির ইতিহাস সনাতন বিরোধীতার, এক কৈবর্তের মন্দিরের পূজারি হয়ে যা ভেঙেছিলেন রামকৃষ্ণ, এক কায়স্থ সন্তান হয়ে পুজ্য হয়ে উঠেছিলেন বিবেকানন্দ। কিন্তু আমাদের শুভেন্দুবাবু মানে কাঁথির মেজখোকা সনাতন হয়েই থাকতে চান, যে সনাতনীরা স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত সহমরণে যাওয়াটাকেই পূণ্য অর্জনের পথ বলেছিলেন। সেই তিনি আবার সেই সনাতনের কথা বললেন, বললেন রামরাজ্যের কথা, সেটাই বিষয় আজকে, শুভেন্দু অধিকারীর রামরাজ্য, এনকাউন্টার, বুলডোজার আর ঘৃণার পাহাড়।

এই ‘রামরাজ্য’ কথাটা এল কোথা থেকে? ১৯২৫-এ আরএসএস পথ চলা শুরু করেছিল, কোথাও কি আছে ‘রামরাজ্য’-এর কথা? কোত্থাও নেই। তাহলে এল কোথা থেকে? এসেছে গান্ধীর হাত ধরে, ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারী রাজত্বের বদলে এক ন্যায়ের প্রতীক রামকে সামনে রেখে গান্ধীজি বলেছিলেন ‘রামরাজ্য’-এর কথা, যদিও যত স্বাধীনতা এগিয়ে এসেছে, ততই তাঁর মুখে আমরা ‘জনস্বরাজ’-এর কথা শুনেছি। সে কথা থাক, এই রামরাজ্যের কল্পনা গান্ধীজির হাত ধরে এসেছিল, যে রামকে কিন্তু গান্ধীজি নিজে এক ঐতিহাসিক চরিত্র বলে মনেই করতেন না। ১৯২৯ সালে তিনি ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’য় পরিষ্কার লিখেছিলেন যে, তাঁর কল্পনার রাম কোনও রক্তমাংসের মানুষ বা অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র হতে পারেন, আবার নাও পারেন। তাঁর কাছে রাম ছিল সত্য আর ন্যায়পরায়ণতার একটি প্রতীকী নাম। তিনি তো বলেই দিয়েছিলেন, “আমার কাছে রাম আর রহিম একই দেবতা।” হ্যাঁ, ‘ইশ্বর আল্লা তেরো নাম সবকো সন্মতি দে ভগবান’।

আরও পড়ুন: Aajke | অমিত শাহের অংক কষতে গিয়ে বিরাট ভুল হয়ে গেছে

কিন্তু এই আরএসএস–বিজেপির রাম নাকি এক ঐতিহাসিক চরিত্র। ১৯২৫ সালে যখন ডঃ হেডগেওয়ার আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজকে সুশৃঙ্খল করা। সঙ্ঘের কাছে ‘রামরাজ্য’ মানে হল ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’। অর্থাৎ, ভারতবর্ষের মাটি আর সংস্কৃতি যেহেতু হিন্দু ঐতিহ্যে গড়া, তাই এদেশের শাসন ব্যবস্থাও হতেই হবে হিন্দু ভাবধারায় পুষ্ট। আর বিজেপি এই ধারণাটাকে রাজনীতির ময়দানে এনে হাজির করেছে, দুর্দান্তভাবে কাজে লাগিয়েছে। তাদের কাছে রামমন্দির এক ‘জাতীয় চেতনার প্রতীক’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ২০২৪ সালে রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলেন, তখন বিজেপির রেজোলিউশনে বলা হল যে, এর মাধ্যমেই নাকি আগামী ১০০০ বছরের জন্য রামরাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল। গান্ধী যেখানে রামের বিনয় আর ত্যাগের কথা বলতেন, সঙ্ঘ সেখানে রামের ধনুক আর বীরত্বের কথা বলে যাতে হিন্দুরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হল, সঙ্ঘের এই দর্শনে ‘রামরাজ্য’ আর ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের সাফ বক্তব্য, যারা এই সংস্কৃতি মানে না, তারা আসলে এদেশের কেউ নয়, এখানেই গান্ধীর সাথে তাঁদের আসল ফারাক। গান্ধীজী রামরাজ্য বলতে চেয়েছিলেন ‘সবার জন্য স্বর্গীয় রাজত্ব’, আর সঙ্ঘের রামরাজ্য ‘একচেটিয়া হিন্দুদের জয়যাত্রা’। শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে এসে ঠিক সেই কথাগুলোই বলে গেলেন। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘রামরাজ্য’ মানে কি এক ন্যায় ব্যবস্থা, সর্ব ধর্ম সমন্বয় নাকি রামরাজ্য মানে কেবল এক হিন্দু রাষ্ট্র যেখানে অন্য ধর্মের মানুষজনেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।

‘রামরাজ্য’ শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে এক প্রাচীন মহাকাব্যের দৃশ্য ভেসে ওঠে, প্রজারাই শেষ কথা, রাজা রামচন্দ্র যেখানে ত্যাগের প্রতীক। মহাত্মা গান্ধী যখন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তখন তাঁর কাছে স্বরাজ মানেই ছিল রামরাজ্য। তিনি জানতেন, এখানে কেবল বন্দুক দিয়ে বা সংবিধানের ধারা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যাবে না; দরকার এমন এক নৈতিক ভিত্তি যা সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারে। রামায়ণের সেই আদর্শ সমাজই ছিল তাঁর তুরুপের তাস। কিন্তু সময়ের ফেরে সেই তাস এখন ধুরন্ধর খেলোয়াড়দের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। আরএসএস-বিজেপি যখন রামরাজ্যের কথা বলতে শুরু করল, তখন তার সুর লয় ছন্দ সব বদলে গেল। তাঁদের কাছে ‘রামরাজ্য’ মানে হল ‘হিন্দু পুনর্জাগরণ’। এই দুই ধারণার লড়াইটাই এই সময়ের ভারতের রাজনীতির আসল নাটক। একদিকে গান্ধীর ‘রাম’ যিনি হৃদয়ে বাস করেন, অন্যদিকে সঙ্ঘের ‘রাম’ যাঁকে অযোধ্যার মন্দিরে বসিয়ে রেখে এক ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার সংকল্প নেওয়া হয়েছে।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here