Aajke | কমিশন না কি বিজেপির ফাঁদে বাংলা?

0
30

আজ শুরু করব একটা কবিতা দিয়ে। যিনি আমাদের দুঃখে সুখে, প্রতিবাদে বিদ্রোহে, কান্নায় আনন্দে পাশে থাকেন, সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘ভারত তীর্থ’, তারই একটু অংশ আপনাদের শোনাচ্ছি।

এসো হে আর্য এসো অনার্য হিন্দু-মুসলমান

এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খ্রিস্টান

মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা, মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে

আজি ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।

বোঝাই যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের ভারত হল সেই দেশ যা কি না হিন্দু-মুসলমান প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলনভূমি। কিন্তু সেই স্বপ্নের বদলে আজ কী টের পাচ্ছি আমরা? ভয়। হ্যাঁ, ভয়ের কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে এই বাংলায়। আর তার পাশাপাশি ইউপিওয়ালা জাত পাতের দুর্গন্ধে ভরে উঠছে বাংলার বাতাস।

একটু পিছিয়ে যাই। বেশি দিনের কথা নয়, বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এক কোটি নাম বাদ যাবে। এখন কথা হল জ্যোতিষ বা গণৎকার হিসেবে শমীকবাবুর তেমন কোনও নামডাক আছে বলে তো আমরা জানি না। তাহলে প্রশ্ন এই, সংখ্যাটা প্রায় মিলে গেল কী করে? বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনে এখনও পর্যন্ত বাদ পড়েছে মোটামুটি ৯১ লক্ষ নাম। হাহাকার উঠছে দিকে দিকে। চিন্তিত, ক্লান্ত, অবসন্ন মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পাবার জন্য এক টানা লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এই বাংলায়। আছে বৃদ্ধ আর অসুস্থ, আছে গর্ভবতী আর সদ্য প্রসূতি সবাই। কী হবে এঁদের? শমীকবাবু আপনাকেই বলছি, কী হবে এঁদের ভবিষ্যৎ? ফিরব এই প্রসঙ্গে। তার আগে আসুন, এসআইআর-এর হিসেবটা চট করে একবার দেখে নেওয়া যাক।

  • SIR এর এখনও অবধি হিসেব বলছে, মোট বাদ ৯০,৮৩,৩৪৫ নাম
  • SIR এর আগে নাম ছিল সবমিলিয়ে ৭,৬৬,৩৭,৫২৯
  • অর্থাৎ বৈধ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াল ৬,৭৭,২০,৭২৮-এ
  • আন্ডার অ্যাজুডিকেশন তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ২৭,১৬,৩৯৩ নাম

হ্যাঁ, প্রায় ১১.৬৩৫ শতাংশ নাম বাদ। এর ভিতরে একটা অংশ জুড়ে আছে মৃত ভোটারেরা। এসব নাম বাদ গেছে ঠিকই আছে। এর ফলে ভোটে কারচুপি করার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু এরই পাশাপাশি বাদ গিয়েছে বহু জীবিত ও বৈধ ভোটারের নাম। মীরজাফর থেকে নন্দলাল বসুর বংশধর, হরিপদ কেরানি থেকে হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি, এরা সবাই বাদ। আর কারা বাদ গিয়েছেন? একটা বড় অংশের অসবর্ণ বাঙালি, সোজা কথায়, নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলিম, যাঁদের অনেকেই অনলাইনে আবেদন করতে জানেন না, যাঁদের অনেকেই আন্ডার অ্যাজুডিকেশন বা লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বলতে ঠিক কী বোঝায়, তার মাথামুণ্ডু জানেন না, তাঁরা খালি এটুকুই জানেন যে, এবার আর ভোট দেওয়া হবে না।

কিন্তু কি করে হল এমনটা? টেকনিক্যালি বললে, এর জন্য অনেকটাই দায়ী এআই। নাম যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এআই কিন্তু ব্যর্থ। বাংলা নামের উচ্চারণ এবং তার ফারাক কোথায় হচ্ছে, এই সেটা ধরতেই পারেনি। ধরুন ‘অলি’, এই নামটাকে এআই ‘ওলি’ বা ‘আলি’ও বলতে পারে, একইভাবে ‘অরিজিৎ’ হয়ে যেতে পারে ‘আরিজিত’। আর তার ফলে, আগের নামের সঙ্গে এই নাম মিলল না এবং এরা কিন্তু সবাই তখন  লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির আওতায় চলে এল। এখন এই গন্ডগোলটা কে পাকাল? আর কেউ নয় খোদ কমিশনের জেনারেট করা অ্যাপ। আর তার ফলে দফতরে দফতরে ঘুরে হয়রান হল সাধারণ মানুষ। তারপর কি হল? বিচারের নামে প্রহসন? সুপ্রিম কোর্ট অর্ডার দিল ট্রাইব্যুনালের। সেও শুরু হতে দেরি হল, কেন না, বিচারকেরা যে বসবেন, সেই টেবিল চেয়ার কোথায়? সেটাপ তৈরি হয়নি বলে দেরিতে শুরু হল ট্রাইবুনাল। আর তারপর বিচারের কী ফল, সে তো দেখাই যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: Aajke | বাংলাদেশের বর্ডারে নদী নালায় কুমির, সাপ ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা অমিত শাহের

মোদি সরকার বলছে এ সবই নাকি দেশের মঙ্গলের জন্য করা হচ্ছে। বেশ কথা। তবে তার পাশাপাশি যাকে মোদিজি ‘বঙ্কিমদা’ বলেছিলেন, সেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা লেখার খানিকটা আপনাদের শোনানো যাক- ‘এই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটি কথা জিজ্ঞাসার আছে, কাহার এত মঙ্গল? হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাথায়, খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্থিচর্মবিশিষ্ট বলদে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চষিতেছে, উহাদের কী মঙ্গল হইয়াছে?’

যে নিম্নবর্গের হিন্দু আর মুসলিমদের কথা একটু আগেই আপনাদেরকে বলেছি, যাঁদের একটা বিশাল অংশের নাম কাটা গিয়েছে, দেখুন, সেই কতদিন আগে বঙ্কিমচন্দ্র কিন্তু তাঁদেরই কথা বলে গিয়েছেন। হ্যাঁ, এরাই তো মার খায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সভ্যতার প্রদীপটা এরাই দুহাতে ধরে থাকে, আর তেল কালি গড়িয়ে নামে এঁদেরই গা বেয়ে। ঠিক যেমন এখন এসআইআর-এর কালিঝুলি এদেরই একটা বড় অংশের গায়ে এসে লেগেছে।

এই কথা এখন শোনা যাচ্ছে যে, এসআইআর আসলে হিন্দি প্রাদেশিকতার হাতিয়ার। সোজা কথায় হিন্দিওয়ালারা বাংলা দখল করতে চায়। কারণ একটাই, বাঙালি অন্তত ১০০ বছরে এগিয়ে আছে। তাঁরা জাতপাত, এঁটোকাঁটা কিছুই মানে না। তার ফলে নাকি হিন্দু ধর্ম উচ্ছন্নে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কটুক্তি করেছেন। এই কিছুদিন আগেও শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার অপরাধে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে, জেলে যেতে হয়েছে। আর হ্যাঁ, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ। বিজেপির সেই মুকুটে এখন নতুন পালক যোগ হল, যার নাম এসআইআর। বাঙালি কীভাবে দেখবে একে? চারদিকে কিন্তু এই কানাঘুষো চলছে যে, বাংলার মানুষেরই হয়রানির জন্য বিজেপিই দায়ী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভিএমে এর প্রভাব পড়তে পারে। আর সাধারণ মানুষ কি বলছেন? আসুন, দেখে নেওয়া যাক।

ফিরব বলেছিলাম, ফিরে এলাম বিজেপির রাজ্য সভাপতির প্রসঙ্গে। শমীকবাবু, বাংলার মানুষের কী হবে এই নিয়ে কোন ভবিষ্যৎ বাণী করবেন কি? নাকি এই বাংলায় বিজেপির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই নিয়ে কিছু বলবেন। আপনাদের মতো নেতারা, যাঁদের বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক বলতেন, সেই মতুতারা আপনাদের সম্পর্কে কী ভাবছে জানেন? এসআইআর–এ নিউ টাউনের প্রায় ছ’হাজার মতুয়ার নাম বাতিলের খাতায়। কী হল তার ফলে? পাঁচ বছর আগে যার বাড়িতে বসে, ধোকলা থেকে শুরু করে  নলেন গুড়ের পায়েস দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরেছিলেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ,  মতুয়া সংঘের মুখ সেই নবীন বিশ্বাস এবার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তাপস চ্যাটার্জির হয়ে ভোট চাইছেন মানুষের কাছে। নবীন বাবু সাফ জানিয়েছেন, ‘‘বিজেপির খপ্পরে পড়ে মতুয়াদের জীবন এখন বিপর্যস্ত”। হ্যাঁ, প্রতিশোধের ভোট দেবেন মতুয়ারা। এমনই তো শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মতুয়া ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর। আর খালি মতুয়ারাই নন। গল্প আরও বাকি আছে। শমীক বাবু আপনি তো কবিতা ভালবাসেন, সেই লাইনটা মনে আছে তো– ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here