১৯৪৬ সাল থেকে বিধানসভা ভোটে যা কখনও হয়নি, সেটাই এবার দেখতে হল বঙ্গে। বিধানসভায় রইলেন না একজনও বাম বিধায়ক। ভোট কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। দু’হাতে কংগ্রেস ও আইএসএফ-এর ক্রাচ নিয়ে পথ হাঁটার করুণ চেষ্টায় কর্মীরাই হতাশায় ডুবে। শুধু কর্মীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পরিত্রাণের আশা পর্যালোচনা রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে। সিপিআইএমের পর্যালোচনা রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০০৮ সাল থেকেই ভোটে অবাধ পতন চলছে। ২০০৮ সালে পঞ্চায়েত ভোটে বামফ্রন্ট পায় ৫২.26 শতাংশ ভোট। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনে আরও কমে যায় ভোট। সেবার বামফ্রন্টের সংগ্রহ ছিল ৪৩.৩০ শতাংশ। ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ৪১.৫ শতাংশ ভোট পায়। ২০১৩ জেলা পরিষদের নির্বাচন, বামফ্রন্ট ভোট পেল ৩৮.১১ শতাংশ। ২০১৪ লোকসভা ২৯.৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় বামফ্রন্টকে। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে ২৫.৯৯ শতাংশ ভোট পায় বাম দলগুলি। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, বামফ্রন্টের ভোট পৌঁছলো তলানিতে। সেবার বামফ্রন্ট ৭.৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এরপর ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট মাত্র ৫.৬৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট মিলিতভাবে ৩৯.৪৩ শতাংশ ভোট পেলেও ২০১৯ এ নির্মম ভাবে ভোট কমে যায়। ২০২১-এ বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ-এর জোট মাত্র ১০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে।
Read more : শূন্য এ বুকে একুশের জুনে…
দায়সারা ভাবে রাজ্য সম্পাদক মন্ডলী পরাজয়ের দায় স্বীকার করলেও, মূল প্রশ্নে মোটেই যায়নি সিপিআইএমের নেতারা। খুঁটিনাটি বিষয়ে বহু শব্দ ব্যয় করা হয়েছে। আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট সমর্থন করে বলা হয়েছে, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। রিপোর্ট বলছে আসন বন্টন প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লেগেছে। ২০১৯ সালে জোট না হওয়ার দায় চাপানো হয়েছে জাতীয় কংগ্রেসের ওপরে। যদিও সেই সময়ের ঘটনাবলী অন্য কথাই বলে। তরুণ প্রার্থীদের মানুষ ভালোভাবে নিয়েছে, এ কথা বলেও পরক্ষণেই বলা হয়েছে, ‘ব্যক্তি বা প্রার্থী এই নির্বাচনে বিচার্য হয়নি’। আর রাজনৈতিক প্রচার? সে ব্যাপারেও কেবলই বিভ্রান্তি। বিজেপি বিরোধী প্রচারের তীক্ষ্ণতা সর্বক্ষেত্রে রক্ষিত হয়নি। সমদূরত্বের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারে সমস্যা তৈরি করে। তৃণমূল বিরোধিতাই বেশি ছিল। এমন ফল হতে পারে তা নেতাদের ধারণাতেও ছিল না।
Read more : চতুর্থ স্তম্ভ: সিপিএমের ভণিতা
তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণকামী কাজকে ‘ডোল’ বলা ঠিক হয়নি। বাধ্য হয়ে রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে, মহিলা, সংখ্যালঘু, বাঙালি, তফশিলি জাতি ও আদিবাসীদের ভোট তৃণমূল প্রচুর পরিমাণে পেয়েছে। এদিকে দলের ক্ষেত মজুর সংগঠন গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে দলের নীতি নিয়েই। তারা বলেছে, কেন সিপিআইএম নিজস্ব শ্রেণী অর্থাৎ গরিব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এর কোন জবাব মিলছে না। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন বলছে শ্রমিক শ্রেণি এবং জনগণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা থেকে গেছে। সিপিআইএমের যুব সংগঠন জানিয়েছে, বিজেপির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিরুদ্ধে আক্রমণের তীব্রতা কম ছিল। নির্বাচনে নেতৃত্বকে তেমন দেখা যায়নি। কেন এসব হয়েছে বা হচ্ছে তার কোন জুতসই জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে রাজ্যের বৃহত্তম বাম দলটি। প্রশ্ন উঠছে, গরীবদের ওপর মোদি সরকারের একটানা আক্রমণের বিরুদ্ধে কি করেছে সিপিআইএম? কেন নয়া কৃষি আইন তথা শ্রম কোডের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হলো না? সাধারণ মানুষের মধ্যে নীরবে বিষ ছড়াচ্ছে আরএসএস, বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীরা। কেন সিপিআইএম চুপ থেকেছে? হে মহান নেতাগণ কর্মীদের চেতনার মানকে কটাক্ষ করে দলে বেঁচে যেতে পারেন, ইতিহাসের বিচারালয় বাঁচবেন তো? আজ যদি সিপিআইএম বুঝে থাকে বিজেপি প্রধান শত্রু, কেন সামনের ভোটে তৃণমূলের সঙ্গেও বিস্তৃত নির্বাচনী বোঝাপড়ার কথা বলবেন না বিমান-সূর্যরা? এসব তো কর্মীদের ঠিক করার বিষয় নয়। দিনের শেষে তাই প্রশ্ন ওঠে, এই নেতারা, এহেন কান্ডারিরা ভারতাত্মা রক্ষার এই বিশাল যুদ্ধে হাল ধরবার যোগ্য তো?