ওয়েব ডেস্ক: নস্টালজিয়ার (Nostalgia) নাকি আজকাল আর আগের মতো টান নেই। সময় দ্রুত বদলাচ্ছে, আর ফিকে হচ্ছে স্মৃতি। তবু বলিউডের (Bollywood) ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যাঁদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যাঁদের কথা বারবার ফিরে ফিরে আসে। আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) সেই বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর গান যেমন বহুরূপী, তেমনই তাঁর জীবনও এক অনবরত লড়াইয়ের কাহিনি। সঙ্গীত বিশারদ রাজু ভরতের বিশ্লেষণে উঠে আসে সেই অন্য ইতিহাস, যেখানে ‘প্রথম’ না হয়েও একজন শিল্পী হয়ে ওঠেন অনন্য।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আশা ভোঁসলে ছিলেন প্রান্তিক। লতা মঙ্গেশকর ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ শীর্ষে উঠছেন, গীতা দত্ত ও শমশাদ বেগমের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সেই ভিড়ে আশার নাম ছিল প্রায় শেষের দিকে। ‘সেকেন্ড বেস্ট’ তো দূরের কথা, তিনি যেন তালিকার বাইরেই। উপরন্তু, ব্যক্তিগত জীবনেও টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে পথ মোটেই মসৃণ ছিল না।
আরও পড়ুন: সঙ্গীত জগতে নক্ষত্র পতন! না ফেরার দেশে আশা ভোঁসলে
এই সময়েই আসে মোড়। ও. পি. নয়্যার বুঝতে পারেন আশার কণ্ঠের আলাদা জোর, লোয়ার রেজিস্টারের দৃঢ়তা। তাঁর সুরে আশা পান এক নতুন পরিচয়। ‘আইয়ে মেহেরবান’ বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’ এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, তৈরি করেছে এক আলাদা ইমেজ। যদিও সেই ‘সেন্সুয়াস’ তকমা পরবর্তীকালে বাধাও হয়ে দাঁড়ায়। গুরুগম্ভীর বা শাস্ত্রীয় ধারার গানে তাঁকে ভাবতে চাননি অনেকেই।
এস. ডি. বর্মন সেই জায়গাতেই খানিক ভাঙন ধরান। আশাকে সুযোগ দিতে শুরু করেন অন্যধারার গান গুলিতে। ‘সুজাতা’ বা ‘বন্দিনী’-র গানগুলোয় ধরা পড়ে আশার অন্য সুর। কিন্তু আশার গলার আসল রূপান্তর আসে আর. ডি. বর্মনের হাত ধরে। সত্তরের দশকে তিনি আশার কণ্ঠকে শুধু ব্যবহারই করেননি, এক নতুন ধারায় গড়ে তুলেছিলেন। ‘তিসরি মঞ্জিল’ থেকে ‘ইজাজত’। আশা হয়ে ওঠেন সেই সময়কার সময়ের ভাষা।
লতার সঙ্গে তুলনা অবশ্যম্ভাবী। একজন নিখুঁত, শাস্ত্রীয় পরিশীলনে ভরা। অন্য জন পরীক্ষামুখী, পরিবর্তনে বিশ্বাসী। রাজু ভরতনের মতে, লতা যেখানে উচ্চস্বরের শুদ্ধতায় অদ্বিতীয়া, আশা সেখানে নিম্নস্বরের গভীরতায় অনন্য। কিন্তু এই তুলনার মধ্যেই ধরা পড়ে আসল গল্প একজন শুরু থেকেই শীর্ষে, অন্যজন সেই শিখরে পৌঁছতে লড়েছেন দীর্ঘদিন।
এই লড়াইটাই আশাকে আলাদা করে। তিনি শুধু সুরকারের নির্দেশ মেনে গান গাইতেন না, প্রস্তাব দিতেন, বদল আনতেন, পরীক্ষা করতেন। ৩০০-রও বেশি সুরকারের সঙ্গে কাজ করে তিনি নিজের কণ্ঠকে বারবার নতুন করে গড়েছেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলানোর এই ক্ষমতাই তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। পপ হোক বা গজল, স্টেজ পারফরম্যান্স হোক বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
‘সেকেন্ড বেস্ট’ শব্দটা সাধারণত আপস বা অপূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আশা ভোঁসলের ক্ষেত্রে তা একেবারেই ভিন্ন। এখানে ‘দ্বিতীয়’ হওয়া মানে বিকল্প পথ বেছে নেওয়া, নিজের জায়গা তৈরি করা। হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ‘দ্বিতীয়’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন, কিন্তু সেই জায়গা থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা আর থাকে না…কে প্রথম, কে দ্বিতীয়। বরং সামনে আসে এক শিল্পীর অবিরত পরিশ্রম, যেখানে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে আছে নতুন আবিষ্কার। আশা ভোঁসলের কণ্ঠে তাই শুধু সুর নয়, শোনা যায় এক জীবনের গল্প। যেখানে ‘দ্বিতীয়’ হয়েও জয় সম্ভব, যদি থাকে নিজস্বতার সাহস।
