Fourth Pillar | শান্তিকুঞ্জের মেজখোকা পালটি খেলেন?

0
40

মেজোখোকা পালটি খেলেন? হ্যাঁ মেজোখোকা বলেছেন উনি আসলে বলেছিলেন যে মুসলমানেরা আমাদের ভোট দেয় না, আমি ওদের ভোট চাই না এই কথা নাকি মেজখোকা বলেন নি, আসলে ২০২১ এ ওই রকম ধাক্কার পরে সাময়িক স্থিতি, মানে মানসিক স্থিতি হারিয়ে সাইন্স সিটির অডিটোরিয়ামে যা বলেছিলেন তা উনি ভুলেই গেছেন, সেদিন সবাই কে বলেছিলেন সবকা সাথ সবকা বিকাশ আর চলবে না, যারা আমাদের সাথে আছে আমরা তাদেরই বিকাশ করবো, ওদের ভোট আমাদের দরকার নেই। আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন রাজ্যের ৩৪/৩৫% মানুষকে বাদ দিয়ে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন পূরণ কোনওদিনও হওয়ার নয় তাই লাইন বদলানোর চেষ্টা করছেন। বিজেপি সাম্প্রদায়িক, বিজেপি সংখ্যালঘু বিরোধী এ কথাগুলো আমরা প্রায় বলে থাকি, বামপন্থীরা কেন, আজকাল উদার গণতান্ত্রিক মানুষজন, দেশের বিজেপি বিরোধী দলগুলোর নেতারা এই একই কথা বলে থাকেন। এরমানে কি এই রকম যে, বিরোধীদলগুলো সংখ্যালঘুদের সমান চোখে দ্যাখে, তাদের কাছে এই সংখ্যালঘু মানুষজন এক ভোটব্যাঙ্কের মত ব্যবহার হয়ে আসছে, সেই কবে থেকে। স্বাধীনতার পরে সংখ্যালঘু মুসলমস্ন, খ্রিস্টান, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা ছিলেন কংগ্রেসের সংগে, কংগ্রেস এবং দেশের রাজনৈতিক মহল ধরেই নিয়েছিল, অন্তত মুসলমান ভোট, এন ব্লক যাবে কংগ্রেসের দিকে, গিয়েছেও।

দেশের অন্তত ৪০/৪৫ টা সংসদীয় আসন, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যাই নির্ণায়ক, সেখানে বার বার কংগ্রেস জিতেছে, তার বদলে কংগ্রেস নেতারা ইফতার পার্টি তে গেছেন, ভোট আসার আগে ইমামের সঙ্গে দেখা করেছেন, এই নেতাদের মধ্যে সব্বাই যে খুব সেকুলার ছিলেন, তাও নয়। মাঝে মধ্যে এনারা দাঙ্গার ইন্ধন জুগিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দাঙ্গা বাঁধিয়েওছে, কিন্তু মোটের ওপর মুসলমান জনগণ ৭৭ এর আগে পর্যন্ত, একনিষ্ঠভাবে কংগ্রেসের সংগে থেকেছে। জরুরি অবস্থার সময় থেকে, সংখ্যালঘু মানুষজন কংগ্রেসের থেকে দুরত্ব বাড়াতে শুরু করেন, তারপর তা ক্রমশ রাজ্যভিত্তিক অকংগ্রেসী, অবিজেপি দলের সংগেই থেকেছে। এ রাজ্যেই দেখুন না, সংখ্যালঘু ভোট চলে এসেছিল বামফ্রন্টের কাছে। না সিপিএম নেতাদের দাড়ি রাখতে হয় নি, ইমাম ভাতাও দিতে হয় নি, কেবল বিজেপির উথ্বানে, সারাদেশে নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে মুসলমান জনগণ মালদা, মুর্শিদাবাদের মত দু একটা পকেট বাদ দিলে সিপিএম, বামফ্রন্ট কে সমর্থন করেছেন। বাংলায় মুসলমান মানুষজনের বিরাট অংশ হল ছোট কৃষক, গ্রামের মানুষ। সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে কৃষকের জমি কেড়ে শিল্প হবে, এই একটা বিষয়েই এই মানুষেরা সিপিএম এর কাছ থেকে তৃণমূলে তাদের আস্থা রাখেন, এবং তৃণমূল ক্রমশ বাংলাতে তো বটেই, দেশেও বিজেপি বিরোধী এক শক্তিশালী মুখ হয়ে দাঁড়ানোর ফলে, সেই সংখ্যালঘু মানুষজন আরও বেশি করে তৃণমূলকে সমর্থন করতে থাকেন, এ ছবি সারা দেশের। ইউপিতে মুসলিম ভোট অখিলেশ যাদব এর সঙ্গে, বিহার এ তেজস্বী যাদবের সঙ্গে, অসম এ কংগ্রেসের সঙ্গে। মানে সারা দেশের সংখ্যালঘু মানুষজন বিজেপির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়, কেন? বিজেপি কেন সাম্প্রদায়িক? কোন কারণে তাদের সাম্প্রদায়িক বলা যায়? এমন কী তারা করেছে, বলেছে বা বিশ্বাস করে, যা অন্য দলগুলো করে না? কারণ মুখে বিজেপি, তাদের নেতা নরেন্দ্র মোদি সবকা সাথ সবকা বিকাশের কথা বলেন, তারা ইনক্লুসিভ পলিটিক্স এর কথা বলে, তারা বলে এমন কি সংখ্যালঘু উন্নয়নের কথাও, তারা দাবি করে যে অন্য দলগুলো যে অ্যাপিজমেন্ট, তুষ্টিকরণের রাজনীতি করে তা আসলে সংখ্যালঘু মানুষদের পক্ষে ক্ষতিকর, তা নাকি আসলে তাদের কে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। অতএব এটা পরিস্কার যে, অন্তত মুখে দেশের সব দলের মতনই বিজেপি ও মুসলমান

জনসংখ্যার কথা ভাবেন, তাদেরকে মূল ধারার রাজনীতি তে আনতে চান, সবকা সাথ সবকা বিকাশ তারা চান। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, বিজেপি তো কোনও স্বাধীন দলই নয়। অন্যান্য দল দেখুন, দল আছে, দলের বিভিন্ন গণসংগঠন আছে, কৃষকদের সংগঠন আছে, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ইত্যাদি আছে। উদাহরণ? কংগ্রেস দল, তার সেবাদল বলে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে, যুবক দের জন্য যুব কংগ্রেস আছে, শ্রমিকদের জন্য আই এন টি ইউ সি আছে। সিপিএম এর ও আছে, এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, সি আই টি ইউ ইত্যাদি ইত্যাদি। সব দলের আছে। মানে একটা স্বাধীন দল, তার মতামত নিয়ে সেই দলের গণসংগঠন কাজ করে। বিজেপির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো, তাদের মাথায় আছে আরএসএস, এক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিরকম নিয়ন্ত্রণ? এইরকম নিয়ন্ত্রণ, উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। এই আর এস এস ঠিক করে দেয় বিজেপির দিশা, দেশের একমাত্র দল, যেটা পরাধীন, পরাধীন এক সংগঠনের কাছে যার নাম আর এস এস, যে প্রত্যক্ষ রাজনীতি তে অংশ নেবেনা বলেও, পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে, যারা গান্ধী হত্যার পেছনে মাথা, যারা সংবিধান কে বদলে দিতে চায়, যারা দেশে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিজেপিইই হল তার এক অন্যতম ব্যতিক্রম যারা সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা মানে না, সহাবস্থানের কথা মানে না, তারা হিন্দু সুপ্রিমেসির জন্য এক হিন্দু রাষ্ট্রের কল্পনা করে আর সেই হিন্দু রাষ্ট্রের জন্য যে কোনও ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করে থাকে। দাঙ্গা আর এস এস – বিজেপির কাছে এক অক্সিজেন সিলিন্ডারের মত, যা থাকলে তারা বেড়ে ওঠে, কলেবরে বড় হয়ে ওঠে। তো সারা উত্তর ভারতের দখলদারি শেষ, এখন বাংলার দখল নেবার জন্য তাদের ঐ দাঙ্গা লাগানোর কৌশল নিয়েই মাঠে নেমেছে। মাত্র গতকাল পুরুলিয়া জেলায় রাম নবমী উপলক্ষে নির্বাচনকে সামনে রেখে অশান্তি তৈরির চেষ্টা চালিয়েছে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। একজায়গাতে হনুমানের মূর্তি ভাঙচুর করা হয়, এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু তা ধরা পড়ে গেছে, সেই গুন্ডাদের পুলিশ ধরেছে, গ্রেপ্তার যাঁরা হয়েছে তাদের পরিচয়টা দেখুন

1) গরু মাহাতো (বিজেপি সমর্থক) — মূল অভিযুক্ত, সরাসরি মূর্তি ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগ।
2) অবিনাশ মাহাতো (বিজেপি সমর্থক) — উসকানিদাতা (abetment) হিসেবে অভিযুক্ত।
3) কিরিটি মাহাতো — বিজেপির শক্তি প্রমুখ।
4) কৃপানাথ মাহাতো — বিজেপির প্রাক্তন বুথ সভাপতি।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজি দেশকে আবার এক পরাধীনতার দিকেই নিয়ে যাচ্ছেন

বিরাট কিছু হওয়ার আগেই থামানো গিয়েছে, আমরা রামনবমী দেখলাম, মিছিল হল, হনুমান বাহিনী অস্ত্র নিয়ে লাফঝাঁপ করলো, কিন্তু মানুষ সজাগ ছিল, প্রশাসনও। কাজেই খুব একটা কিছু না করতে পারেনি, কিন্তু চেষ্টা কি ছেড়ে দেবে? মনে আছে মুর্শিদাবাদের ঘটনা, ওয়াকফ বিলের প্রতিবাদের পেছনেই এক দাঙ্গার ব্লু প্রিন্ট ছিল, সেটা তো জানতো না ঐ অঞ্চলের মানুষজন। কিন্তু কত তাড়াতাড়ি সেই আগুন জ্বলে উঠলো, কত তাড়াতাড়ি কিছু হিন্দু মানুষের পলায়নের ছবি এলো, ঘি ঢালতে রাজ্যপাল ছুটে গেলেন, কিন্তু তা কদিনের মধ্যে সামলে নিল প্রশাসন, মানে প্রশাসনের মদত মিললো না। কিন্তু এখানেই কি থেমে থাকবে? আবার ধরুন চন্দন মালাকার আর প্রজ্ঞাজিৎ মন্ডল, নামেই পরিস্কার যে তাঁরা দুজনেই হিন্দু সন্তান, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। কেন? কারণ তারা বনগাঁর একটি অঞ্চলে পাকিস্তানি পতাকা টাঙিয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, হিন্দুস্তান মুর্দাবাদ’ লিখে একটা দাঙ্গা বাঁধানোর প্রায় নিখুত এক পরিকল্পনা প্রয়োগ করার আগেই ধরা পড়ে ঙ্গিয়েছিলেন। এলাকার মানুষ ধরে ফেলেছিল। তারা নিজেরাই জানিয়েছিল যে দুজনেই বিজেপির সদস্য, হ্যাঁ সেই বিজেপি যারা নাকি প্রবল জাতীয়তাবাদী, হিন্দু রাষ্ট্রের দাবি করে, তারাই রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাথায়, সেই তাদের দুজন পাকিস্তান জিন্দাবাদ, ভারত মুর্দাবাদ লিখে দিয়ে আসবেন দেওয়ালে, তারমধ্যে কয়েকটা দেওয়াল মুসলমানদের হবে, ব্যস, তারপর দাঙ্গা ঠেকায় কে? এই কলকাতায় বসে সেই দাঙ্গার ছবি দেখে ঘাড় নাড়িয়ে সুজন শতরূপেরা বলবে সরকার না চাইলে তো দাঙ্গা হয় না, এই দাঙ্গা তো সরকার চেয়েছে, তাই হচ্ছে। কিন্তু সত্যটা বলছেন না, বলছেন না যে আসলে দেশের মাথায় বসে থাকা সরকারি দল দাঙ্গা লাগাতে চাইছে, তাদেরও পেছনে আছে এক সঙ্ঘ, যারা এভাবে দাঙ্গা বাধাতে মদত দেয়। লক্ষ্য করে দেখুন সীমান্ত অঞ্চল বনগাঁ। একদা হিন্দু উদ্বাস্তুদের নিবিড় বসবাসের জায়গা। বেছে বেছে এগুলো করা হয়। অঞ্চল বেছে, বসবাসকারী লোকজন দেখে, সাজানো হয় এমন ঘটনা। মন্দিরে গোমাংস ফেলা থেকে মিছিলে ঢিল ছোড়া সবই এদের দাঙ্গা বাধানোর ফন্দী। যত দাঙ্গা যত সাম্প্রদায়িক বিভেদ তত ভোট, তত ক্ষমতায় আসার পথ পরিস্কার।

এবারে আটকানো গেছে, হয়তো ১০০ টাতে ৯৮ টাই আটকানো যাবে, দুখানা যাবে না আর সেই দুখানাই অক্সিজেন দেবে বিজেপি কে। খুব পরিস্কার যে রাজ্য জুড়েই বিজেপি এই দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছে, এটাই ২০২৬ এর আগে বিজেপির স্ট্রাটেজি। তাদের লক্ষ এ রাজ্যের ৭০% হিন্দু ভোটের ৭০% পাওয়া, মানে সেই ৪৯% ভোট পেয়েই এক বিপুল আর স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারা রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে চায়। সমস্যা দুটো, ১) কোনওভাবেই হিন্দুদের ৫০/৫৫% এর বেশি ভোট তারা পাবে না, কারণ এ রাজ্যে হিন্দুদের এক বড় অংশই বিজেপির ঐ উগ্র হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসই করে না। ২) রাজ্যের প্রায় ৩২/৩৩% মুসলমান মানুষজনকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার এই প্রচেষ্টা আগামী দিনে এক বিরাট সমস্যার দিকে রাজ্যকে ঠেলে দেবে যা রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের মাথায় ঢুকছে না। হ্যাঁ দাঙ্গার আগুন লাগিয়েই হিন্দু ভোট জড় করে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, আর তারা আসার পরে দেখবেন, মিলিয়ে নেবেন, আজকের যে বিপ্লবী আসফাকুল্লা নাইয়া, মিলিয়ে নেবেন সেদিন ভ্যানিস হয়ে যাবেন, আজকের যে ন্যায়ের কথা বলে তৃনমূল সরকার বিরোধিতার ঝান্ডা তুলে সংখ্যালঘু স্বাধীন স্বর সেদিন এঁদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেদিন এই হিন্দুত্ববাদীদের বুলডোজার আর দমন পীড়নের মুখে সাধারণ মানুষেরও দম বন্ধ হবে। তাকিয়ে দেখুন উত্তর প্রদেশের দিকে, মধ্য প্রদেশ বা রাজস্থানের দিকে, কে কী খাবে, কে কী পরবে, কে কোন কবিতা পড়বে সেটাও ঠিক করে দিচ্ছে এই গুন্ডার দল। একটা মিছিল করলে বুলডোজার হাজির হচ্ছে দোরগোড়াতে, প্রতিবাদীদের ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে এঁরা সরকারি চাকরি পাবে না। বাম আমলে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলন হয়েছে, তৃণমূল আমলে ভাঙড়ের আন্দোলন, নোনাডাঙা বস্তি উচ্ছেদের আন্দোলন হয়েছে, দেউচা পাচামির আন্দোলন হয়েছে, চাকরি দূর্নীতীর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, আর জি কর ধর্ষণ মৃত্যুর পরে রাজপথ জুড়ে মিছিল অবস্থান, একজনের ঘরের সামনে বুলডোজার গেছে? একজনকেও কি বলা হয়েছে মিছিল করেছো বলে সরকারি চাকরির পরীক্ষাতেই বসতে পারবে না? না হয় নি। হয় নি কারণ ন্যুনতম গণতান্ত্রিক অধিকার অন্য যে কোনও সরকারের আমলে ছিল, আছে, যা বিজেপির আমলে নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here