Fourth Pillar | আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ, পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে, মোদিজি আঙুল চুষছে

0
25

পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত তো কেবল একটা আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এই সংঘাত বিশ্বব্যবস্থায় এক বিরাট অদলবদল এনে দেবে। সেই বদলে যাওয়া ছবির প্রথম বাঁক হল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, আমেরিকা ইজরায়েলের যৌথ বাহিনীর ইরানের উপর হানাদারি, তারপর থেকেই দ্রুত বদলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বিশেষ করে এই আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু এক অপূরণীয় শূন্যতা আর প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা চট করে মিটবে না। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জোট, পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো, এমনকি ন্যাটোর অনেক সদস্য দেশও যেখানে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, সেখানে ‘বিশ্বগুরু’ মোদিজির নেতৃত্বে ভারতের হিরণ্ময় নীরবতা লজ্জার, চোখে পড়ার মতো এক বিচ্যুতি। ভারতের এই তথাকথিত ‘কৌশলগত নীরবতা’ বা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের অবস্থান ভারতকে এক হাস্যকর জায়গায় নিয়ে গিয়েছে, আর আন্তর্জাতিক মহলে এক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে, যার জের বহুদিন থাকবে। এমনকি জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমেয়ারও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, আমেরিকার এই যুদ্ধের সপক্ষে দেওয়া কোনও যুক্তিই ধোপে টেকে না, এটা আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। মিশরের বিদেশমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এক কূটনৈতিক মিশন নিয়ে নেমে পড়েছিলেন, যার লক্ষ্যই ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে এক সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষা করা। তিনি জর্ডান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ওমান, তুরস্ক, পাকিস্তান, ফ্রান্স এবং সাইপ্রাসের মতো দেশের বিদেশমন্ত্রীদের সাথে একের পর এক বৈঠক ও ফোনে আলোচনা করেন। মিশরের এই তৎপরতার মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকা ইরানের মধ্যে সরাসরি সংলাপের পথটা খুলে দেওয়া আর দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। আশ্চর্যের বিষয় হল, মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তানের মতো দেশগুলো, যারা ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদার, তারা কিন্তু এই যুদ্ধে আমেরিকার পাশে দাঁড়ায়নি। বরং তারা এই আক্রমণকে ইরানের সার্বভৌমত্বের উপর এক ‘নগ্ন আগ্রাসন’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন’ হিসেবে কেবল দেখেছে নয়, সে কথা জোর গলায় বলেছে। তারা কেবল মৌখিক নিন্দা করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং কূটনৈতিক প্রটোকল মেনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে খামেনেইয়ের মৃত্যুতে সরকারি শোকবার্তাও পাঠিয়েছে। এই দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগের কারণ ছিল অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। তারা ভালো করেই জানে যে, ইরানের সাথে এই সংঘাত চলতে থাকলে লোহিত সাগর আর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য সম্পূর্ণ থমকে যাবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সরাসরি আমেরিকার এই অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করে। তারা মনে করে যে, ইরানের উপর এই ধরণের আক্রমণ সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেবে। ওমান, এমনকি সুইৎজারল্যান্ডও এই সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ওমানের রাজধানী মাসকাট, সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে আমেরিকা ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে পর্দার আড়ালে বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনাগুলোর মূল বিষয় ছিল কীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা যায়, পারস্য উপসাগরে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।

সাধারণত মনে করা হয় যে, আমেরিকার যেকোনো সামরিক অভিযানে ন্যাটো-র (NATO) ৩২টা দেশ একজোট হয়ে সমর্থন দেবে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। ন্যাটো-র অনেক সদস্য দেশ এই যুদ্ধকে ‘অপ্রয়োজনীয় অবৈধ’ বলে বিবৃতি দিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে এক ‘বিরাট ভুল’ বলেছেন। সানচেজ তাঁর দেশে ‘No to War”’ বা “’যুদ্ধের বিরুদ্ধে না’ স্লোগানটাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমেরিকা যখন স্পেনের কাছে তাদের সামরিক ঘাঁটি, রোটা আর মোরন, ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল, সানচেজ সরাসরি তা নাকচ করে দেন। এর ফলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রেগে বোম, কিন্তু সানচেজ মুখের উপরে বলে দিলেন, কোনও নেতারই কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলার অধিকার নেই। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ যদিও ইরানের নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তিনিও স্বীকার করেছেন যে বার্লিনের সাথে আগে আলোচনা করা হলে তারা এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিত। কিন্তু যেখানে অধিকাংশ মুসলিম দেশ আর ন্যাটোর প্রভাবশালী সদস্যরা যুদ্ধের নিন্দা করেছে, সেখানে ভারত সরকার এক অদ্ভুত উলটো পথে হেঁটেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের দেওয়া বিবৃতিগুলোতে ‘আগ্রাসন’ বা ‘হামলা’-এসব শব্দ নেই, আছে ‘গভীর উদ্বেগ’ (deep concern) বা ‘পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির বিবর্তন’ (evolution of situation in West Asia)-এর মতো গোলাগোলা কথাবার্তা। এমন তো নয় যে, এর আগে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ থামাতে মোদিজি যাননি, তিনি তো গিয়েছিলেন ইউক্রেনে, তাঁর শান্তি দৌত্য নিয়ে প্রচুর কথা বলা হয়েছিল, মনে আছে তো সেই ‘ওয়ার রুকুয়া দিয়া পাপা!’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেইয়ের মৃত্যুতে অধিকাংশ দেশ যেখানে সরকারি শোকবার্তা পাঠিয়েছে, সেখানে ভারত সরকার প্রথম কয়েক দিন একটা কথাও বলেনি। এমনকি ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও যখন শোক জানাচ্ছিল, তখনও নয়াদিল্লি চুপ করে ছিল। শুধুমাত্র বিরোধী দলগুলোর কড়া সমালোচনা আর ঘরোয়া রাজনীতির চাপের মুখে পড়ে ৫ মার্চ ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরিকে ইরানের দূতাবাসে পাঠানো হয় শোক বইতে স্বাক্ষর করার জন্য। এতা স্রেফ ‘চাপের মুখে নেওয়া ভণ্ডামি’।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | শান্তিকুঞ্জের মেজখোকা পালটি খেলেন?

কিন্তু এগুলো কেন? দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির জন্য? উচ্চ-প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব ‘প্যাক্স সিলিকা’র জন্য?। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের দেখানো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নের জন্য? যদি তাও হয়, তাহলেও এই নীরবতার ফল হবে হিতে বিপরীত। তাকিয়ে দেখুন ওই ওয়াশিংটন আজ ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক আলোচনায় ভারতকে প্রায় বাতিলের খাতায় নামিয়ে দিয়েছে; অথচ পাকিস্তান, মিশর, ওমানের মতো দেশগুলো সেখানে বড় ভূমিকা পালন করছে। আমাদের বিদেশ নীতির সবচেয়ে দুর্বল দিকটা সামনে এল ৪ মার্চ ২০২৬, সেদিন ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায়, শ্রীলঙ্কার গাল বন্দর থেকে মাত্র ১৯ থেকে ৪৪ নটিক্যাল মাইল দূরে আমেরিকার একটা পারমাণবিক সাবমেরিন ‘ইউএসএস শার্লট’ ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’কে টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেয়। এই ইরানি জাহাজটা ভারতের বিশাখাপত্তনমে অনুষ্ঠিত ‘মিলন ২০২৬’ নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে স্বদেশের পথে ফিরছিল। মিলন মহড়া ছিল ভারতের নৌ-কূটনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ যেখানে ৭৪টা দেশ অংশ নিয়েছিল। এই মহড়াতে থাকা ওই জাহাজের মৃত নাবিকেরা কদিন আগেই তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে, ভারত মহাসাগরে ভারতের এই ‘অতিথি’ জাহাজটাকে যখন আমেরিকা আক্রমণ করে, তখন তাতে ৮৭ জন ইরানি নাবিক মারা যান। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন যে, ডেনা ছিল ভারতের নৌবাহিনীর অতিথি, যাকে ভারতের ঘরের চৌকাঠে মেরে ফেলা হল। বিরাট প্রতিক্রিয়া খুব স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর ভারতের নৌবাহিনী কেবল একটা ছোট বিবৃতি দিয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তার কথা জানায়। আমেরিকা ভারতের এই নীরবতাকে ভারতের দুর্বলতা হিসেবে ধরে নিয়েছে। আমেরিকার এই পদক্ষেপ ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং ভারত মহাসাগরে ভারতের নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার (Net Security Provider) ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। অথচ তাকিয়ে দেখুন কিছুদিন আগেই ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে যে মোদিজি নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁর মুখে একটাও কথা নেই।

এদিকে ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ, ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম তো বেড়েছেই, কিন্তু ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি-র অভাব। ভারতের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, আর এর পুরো অংশটাই ওই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মার্চ ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে দেখা যায় যে, এলপিজি-র সরবরাহ প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। এর ফলে ভারতের দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট ইতিমধ্যেই দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না, আর গ্যাসের সিলিন্ডারপিছু দাম আকাশ ছুঁয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভারত সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে আমেরিকা থেকে এলপিজি আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে, আর রাশিয়া থেকে তেল কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এতেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে একটি এলপিজি জাহাজ ভারতে আসতে সময় লাগত মাত্র ৭-৮ দিন, যেখানে আমেরিকা থেকে আসতে সময় লাগছে প্রায় ৪৫ দিন। এই দীর্ঘ লজিস্টিক সমস্যার কারণে ভারতে জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ভারত যদি প্রথম থেকেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিত এবং ওমান বা মিশরের মতো মধ্যস্থতায় অংশ নিত, তবে হয়তো নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেক বেশি সুনিশ্চিত করতে পারত। ভারত দীর্ঘ সময় ধরে তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর (Strategic Autonomy) জন্য গর্ব করে এসেছে। মানে কোনও পরাশক্তির চাপে না পড়ে নিজের জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সংকট দেখিয়ে দিল যে, বর্তমান সরকার সেই স্বায়ত্তশাসন থেকে সরে ‘হেঁ হেঁ বাবু’ হয়ে গিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের খুশি রাখতে গিয়ে ভারত তার দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বিসর্জন দিচ্ছে। ভারত আজ এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন। এক দিকে আমেরিকা তার প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার, অন্য দিকে ইরান তার জ্বালানি আর চাবাহার বন্দরের মতো কৌশলগত প্রকল্পের জন্য অপরিহার্য। চাবাহার বন্দরে ভারত কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যাতে পাকিস্তান বাদে আফগানিস্তানের সাথে বাণিজ্য করা যায়। কিন্তু আমেরিকা এখন ভারতকে চাবাহার থেকে সরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে, আর ইরানের সাথে ব্যবসা করার অপরাধে ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্কের হুমকি দিচ্ছে। ভারতের এই ‘মিউটেড রিঅ্যাকশন’ স্বাভাবিকভাবেই ওয়াশিংটনকে আরও সাহসী করে তুলেছে। মাথা যত নিচু করবে, ততই প্রতিপক্ষ মাথা আরও নিচু করার নির্দেশ দেবে। এই যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, কোনও দেশেরই তার মৌলিক নীতি বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও এই যুদ্ধের নিন্দা করার সাহস দেখিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, তোষণ নয়, বরং নিজের অবস্থানে অটল থাকাই প্রকৃত কূটনীতি। অন্যদিকে, ভারত নীরব থেকে কেবল আমেরিকার সুনজর পাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বদলে পেয়েছে অপমান আর অর্থনৈতিক ক্ষতি। আমেরিকা ভারতকে এক ধরণের আল্টিমেটাম দিয়েছে যে, হয় তারা চাবাহারে কাজ করবে, না হয় তারা আমেরিকার ‘প্যাক্স সিলিকা’ অংশীদারিত্ব পাবে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের নীরবতা ইরানের কাছে একটা নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। ইরান ভারতকে সবসময়ই এক নন-অ্যালাইনড বা জোটনিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে বিশ্বাস করত। কিন্তু আইআরআইএস ডেনা-র ডুবে যাওয়া বা ভারতের দুর্বল প্রতিক্রিয়া তেহরানকে ভারতের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করছে। যদি ইরান চাবাহার বন্দর থেকে ভারতকে সরিয়ে দেয়, আর সেখানে চীনের মতো কোনও দেশের প্রবেশ ঘটে, তবে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর কাছে ভারতের আবেদন ছিল তার নৈতিক অবস্থান, উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব। কিন্তু যখন এক বন্ধু রাষ্ট্র আক্রান্ত হয়, তার রাষ্ট্রপ্রধান, তার নেতাদের হত্যা করা হয়, তখন ভারত যদি চুপ থাকে, তবে সেই বন্ধুত্বের কোনও মূল্য থাকে না। ভারতের এই ‘কৌশলগত নীরবতা’ ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়াকেও ভাবিয়ে তুলছে, যারা এই যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করেছে।

আমাদের দু’টো কথা খুব পরিস্কার করে বুঝতে হবে- (১) কোনও দেশকে তোষণ করা বা অন্ধভাবে সমর্থন করা কখনোই জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। (২) আন্তর্জাতিক আইন আর সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা না বললে বিশ্বমঞ্চে নিজের সম্মান বজায় রাখা কঠিন। আমেরিকা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা ভারতের ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই ভারতের ঘরের ভেতর অপারেশন চালাতে পারে। আগামী দিনে ভারতকে তার বিদেশ নীতি আবার পর্যালোচনা করতেই হবে। কেবল ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করাটাই কূটনীতি নয়। ভারতকে প্রমাণ করতে হবে যে, সে কেবল একটা বড় বাজার নয়, বরং একটা নীতিভিত্তিক বিশ্বশক্তি। বর্তমান সংকট ভারতের জন্য একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল, ভারত হতেই পারত শান্তির দূত, পারত নিজেদেরকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার, কিন্তু ভারত সেই সুযোগ হারিয়েছে। হ্যাঁ, মোদিজির বোঝা উচিত, ট্রাম্পের মতো এক আত্মকেন্দ্রিক, নেতানিয়াহুর মতো এক আন্তর্জাতিক নিয়মভঙ্গকারী নেতাদের তোষণ করা কখনোই দীর্ঘমেয়াদী লাভ এনে দেয় না।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here