Fourth Pillar | নির্বাচন কমিশন এত কষ্ট না করে মুখ্যমন্ত্রীকেই ট্রান্সফার করে দিন না?

0
34

নির্বাচন কমিশনের আপাতত কাজ হল, রাজ্যের পুলিশ আর সাধারণ প্রশাসনকে প্রভুদের আদেশ মতো সাজিয়ে দেওয়া। রবিবার ইসি ভোট ঘোষণার পর থেকে ৭২ ঘণ্টায় ৪৩ জন শীর্ষ আমলা–পুলিশকর্তাকে সরানো হল, যা সাম্প্রতিক অতীতে নজিরবিহীন। এর মধ্যে আবার এদিনই বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মাকে তামিলনাড়ুর বিধানসভা ভোটে পুলিশ অবজার্ভার করে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর জায়গায় তা হলে বিধাননগরের সিপির দায়িত্ব কে সামলাবেন, তা এখনও জানা নেই। রাজ্যের আরও ১৪ আইপিএস-কেও পুলিশ পর্যবেক্ষক করা হচ্ছে ভিন রাজ্যে। বদলি হওয়া ১৩ জন জেলাশাসকের তালিকায় জলপাইগুড়ি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ারের ডিএম-এর পাশাপাশি রয়েছেন কলকাতা উত্তর ও কলকাতা দক্ষিণের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকও। রাজ্য পুলিশের রায়গঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, জলপাইগুড়ি ও প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের ডিআইজি–কেও সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। এক্কেবারে বিজেপির উচ্ছৃষ্টে লালিত পালিত কিছু সাংবাদিক জানালেন, আগামীকাল আরও উইকেট পড়বে, তো দেখলাম ডিজি, কলকাতা পুলিশ কমিশনার, এডিজি আইন শৃঙ্খলাতে নতুন অফিসারেরা এলেন, নির্বাচন কমিশনের আদেশে। ওই দালালেরাই জানাচ্ছেন, এঁরা নাকি সব মিডল অর্ডারের ছিলেন, এর পরে টেল এন্ডারসদের বদলানো হবে। এই দালালদের অনেকেই আবার এসএফআই ছিলেন, সিপিএম ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে নামানোর জন্য যা যা করা হবে, সে যত অনৈতিক হোক, যত অসাংবিধানিক হোক, এনারা চিয়ার লিডার, ঝিন চ্যাক মিউজিক বাজবে, এনারা নাচবেন, নাচার জন্য পয়সা পান তো, স্বাভাবিক। তো আমি বলি এসব না করে একজন নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে বসিয়ে দেওয়া হোক, ল্যাটা চুকে যায়। দরকার কি এত ঝামেলার? বিজেপির বাংলা চাই, ব্যস, পিরিয়ড!

এমনিতে সেই কবে ভারতের পন্ডিত জ্ঞানী গুণি মানুষজন বহু আলোচনা, বহু তর্কের পরে, বহু দলিল দস্তাবেজকে সামনে রেখে এক সংবিধান তৈরি করেছিলেন যা বার বার লঙ্ঘিত হয়েছে, সংবিধানকে তাকে রেখেই বহুবার নির্বাচিত সরকারকে ভাঙা হয়েছে, আর সেসব মানুষের সামনে তো আছে, আছে তো জরুরি অবস্থা, যা সংবিধানের সমস্ত ধারণার বিপরীতে ছিল। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, সেই সমস্ত কাজ ইতিমধ্যেই সংবিধান বিরোধী হিসেবেই চিহ্নিত, এমনকি কংগ্রেসের একজন নেতাও জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করতে পারবেন না। একজন কংগ্রেস নেতাও অগণতান্ত্রিকভাবে কেরলের প্রথম বাম সরকারকে ফেলে দেওয়াটা ঠিক হয়েছিল, একথা আর বলেন না। কিন্তু ২০১৪ থেকে যা শুরু হয়েছে তার চেহারাটাই আলাদা। সংবিধান যাঁরা করেছিলেন, সেই প্রাজ্ঞ মানুষজনের ধারনাতেও ছিল না যে সেই শয়তানেরা, যাঁরা সেদিন স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে, যাঁরা সংবিধান, জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে, তারা এই সংবিধানের হাজার একটা সাধারণ ধারাকে ব্যবহার করে এই সংবিধানের মূল ধারণাকে জুতোর তলায় ফেলে রগড়াবে। না, সেই কথা নেহেরু, প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, আবুল কালাম আজাদ, এঁরা কেউই বোঝেননি। ওনারা সভ্য স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, উদার মানুষজনের জন্য এক সংবিধান লিখেছিলেন, যা আজ অসভ্য, বর্বর, সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক এক ফাসিস্টদের হাতে গিয়ে পড়েছে। ২০১৪-তে এই মোদি-শাহের নেতৃত্ব এক বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, যে বিজেপি আগের বিজেপি নয়, যে বিজেপির নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী বলেছিলেন, বিরোধীরা হলেন সংসদের চৌকিদার, এটা সেই বিজেপি নয়, এখানে মোদিজি নিজেই বলে দিলেন, ‘আমিই সেই চৌকিদার’, আর আজ সেই চৌকিদারি আমাদের চোখের সামনে। মাত্র ১১ বছরে ১০টা রাজ্য সরকারকে ভেঙেছেন, পুদুচেরি, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, মহারাষ্ট্র, বিহার, কর্নাটক। একমাত্র কর্নাটক ছাড়া তাকিয়ে দেখুন প্রত্যেক জায়গাতে বিজেপি ক্ষমতায়, শরিক দল যদিও বা থাকে তারা ধীরে ধীরে মুছে গিয়েছে বা যাবে। না, তাদের এই কাজ নিয়ে তারা লজ্জিত নন, শঙ্কিত নন, এই কাজ অসাংবিধানিক, এই কাজ গণতান্ত্রিক ধারণার বিপরীত, এমটা বিজেপি মনেই করে না। তারা বুক ফুলিয়েই এই কাজগুলো করছে। হ্যাঁ, মাত্র ক’দিন আগেই এই বিজেপির একজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, অনায়াসে বললেন ১১০-১২০ পার করলে সরকার আমাদের। হ্যাঁ, ১৪৮-এর বাকি ৩০ ওনারা কিনে নেবেন, ওনারা নাকি সেই যোগাযোগ রেখেই চলছেন। মানে সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক রীতি নীতি মেনে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার জন্য ন্যুনতম ১৪৮ দরকার, সেটা তাদের কাছে কোনও বিষয়ই নয়, ‘তোরা পারলে আটকা, আমরা কিনে নেবো আরও ৩০-৪০টা বিধায়ক’। বাংলার বিধায়কের দাম কত হবে? ২০-৩০ কোটি? একটা ছোট্ট হিসেব দিই, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২৪-এ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা তিনটি সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ইউনিট অনুমোদন করে। এর মধ্যে দুটি ইউনিট টাটা গোষ্ঠী পরিচালনায় হবে। ভারত সরকার ‘সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন উৎসাহ পরিকল্পনা’র আওতায় মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু টাটা গোষ্ঠীর দুটো ইউনিটের ক্ষেত্রেই এই ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪,২০৩ কোটি টাকা। ক্যাবিনেটের এই অনুমোদনের চার সপ্তাহ পর, এপ্রিল ২০২৪-এ টাটা গোষ্ঠী বিজেপিকে ৭৫৮ কোটি টাকা দান করে। নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া দলীয় অনুদানের নথি অনুযায়ী ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে কোনও রাজনৈতিক দলকে দেওয়া এটাই সবচেয়ে বড় কর্পোরেট অনুদান। ৭৫৮ কোটি টাকা, এ বাংলার ৩৫ জন বিধায়ক কেনার জন্য যথেষ্ট নয়? একটু শুরু থেকে দেখুন।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | ইতিহাসে থেকে যাবে এক অপদার্থ শাসকের নাম নরেন্দ্র মোদি

২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার পরেও বাংলাতে বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারেনি, ২০১৬-র বিধানসভাতেও নয়। কিন্তু এর পরে সিপিএম সেই সুযোগ তাদের হাতে তুলে দিল, হ্যাঁ, আমি বলছি না, বলতে লজ্জা লেগেছে, তবুও এই কথা সেদিন মুখ ফুটে বললেন অশোক ভট্টাচার্য। হ্যাঁ, তাঁদের ভোটে বলীয়ান হয়ে ২০১৯-এ চমকে দিল বিজেপি। ১৮ জন এমপি। সোজা হিসেবে ১২৬ জন এমএলএ। মানে সরকার তো হয়েই গিয়েছে, তবুও আরও সিওর হবার জন্যই দল ভাঙার কাজে হাত দিয়েছিল বিজেপি, হু হু করে বিজেপি মুখি যাত্রা শুরু হল, কে বা আগে প্রাণ করিবেক দান। পৃথিবী যা দেখেনি তাই দেখল বাংলা, শিবির করে দলবদল। রেজাল্ট, ৭৭। এরপর শুরু হল ইডি আর সিবিআই, লক্ষ্য মাথাটা, লক্ষ্য ঢাকি সমেত বিসর্জন। হয়নি। ২০২৪-এ ১৮ থেকে কমে ১২। হ্যাঁ, চাকরি চুরি, কয়লা চুরি, বালি চুরি ইত্যাদির অভিযোগ আর মামলাতেও সরকার টনটনাটন টন। মাথা তো দুরের ব্যাপার যাদের বিরুদ্ধে মামলা হল, জেলে পোরা হল যাঁদের, তাঁরাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে? তাহলে এসআইআর। বের হল প্রথম খসড়া, রোহিঙ্গা কোথায়? মুসলমান কোথায়? নো ম্যাপিং আর ডিলিশনের তালিকাতে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তার মধ্যে আবার বড় সংখ্যায় মতুয়ারা আছেন, হিন্দু সিডিউল কাস্টের মানুষজন আছেন, আছেন কলকাতা, হাওড়া, ব্যারাকপুর অঞ্চলের হিন্দিভাষী মানুষজন, আছেন আদিবাসী, রাজবংশী মানুষজন। কাজেই এই ডিলিশন আর নো ম্যাপিং এর ধাক্কায় পড়ল বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক, মানে সেই ‘লেনে কে দেনে পড় গয়ে’। কাজেই সমস্ত লাজ লজ্জা ফেলে, নিয়ম নীতি সরিয়ে রেখে আনা হল লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির একটা বিষয়, যা ভারতের কোথাও আনা হয়নি, বিজেপির এই উচ্ছৃষ্টভোগীরা, আকাদেমি পুরস্কারের, রাষ্ট্রপতি ভবনে ডাকা পাবার জন্য আ-তু-তু-তু-তু কুকুর ছানার দল, মাস মাইনের উপর উপরি পাওয়া সাংবাদিকের দল লিখছেন কই? অন্য কোনও রাজ্যে তো এসআইআর নিয়ে এত কথা উঠছে না, বাংলাতে হচ্ছে কেন? এসব আসলে মমতা সরকারের নির্দেশে সরকারি কর্মচারীদের কাজ কারবার। একবারও কেউ বলছেন না যে, কেন একমাত্র বাংলাতেই এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির ব্যাপারটা আনা হল। চারিদিক থেকে প্রতিবাদ শুরু হল, আর সব থেকে বড় গন্ডগোল হল এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে থাকা লোকজন ম্যাপড, মানে এনাদের নাম ধাম ২০০২-এর সঙ্গে লিঙ্কড করা গিয়েছে, সেটা মেনে নিলে ওই জ্ঞা জ্ঞা জ্ঞা জ্ঞানেশ কুমারের ভাষাতেই এঁরা সবাই দেশের নাগরিক, ওদিকে প্রত্যেক নাগরিক যাতে ভোট দিতে পারে তার ব্যবস্থা করতেই হবে নির্বাচন কমিশনকে, এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি আগে করলে কিন্তু এই কথাগুলো আমরা বলতেই পারতাম না। কিন্তু এখন ওই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে বিচারাধীন ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না, ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৩ লক্ষের বিচার নাকি শেষ হয়েছে, কবে সেই তালিকা বের হবে কেউ জানি না, অ্যাট লিস্ট নির্বাচন কমিশন তো জানায়নি, কিন্তু তারা নির্বাচন ঘোষণা করে দিল।

ওদিকে ১৯৯৫ সালের লালবাবু হুসেইন মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় হল, যাঁদের ক্ষেত্রে সময়ের অভাবে বা অন্য কোনও কারণে ভোটার তালিকা সংশোধন করা সম্ভব হয়ে উঠবে না, তাঁদের নাম সংশোধনের আগের যে ভোটার তালিকা তা অনুযায়ীই নতুন তালিকাতেও রাখতে হবে। মানে আপনারা বলবেন বিচারাধীন আর সেই বিচার চলবে ৫ বছর আর সেই মানুষজন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না, তা হবে না, কাজেই ওই সমস্ত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর দাবি তুলছি আমরা। বৈধ নাগরিকদের বিচারের নামে ঝুলিয়ে রেখে ভোট করিয়ে চলে যাবে এই নির্বাচন কমিশন, তা হবে না। হ্যাঁ, এটা বুঝেছে নির্বাচন কমিশন, কাজেই এবারে আরও খোলামেলা কাজে নেমে পড়েছে তাঁরা। রাস্তায় নেমে মমতার সরকারকে ফেলে দেবার আন্দোলন করেননি শুভেন্দু অধিকারী, কিন্তু এই তালিকা বানিয়েছেন মন দিয়ে। কিন্তু সমস্যা হল এসবে কিছুই হবে না, একটা মানুষ, একজন আমলা এই বিরাট কাঠামোতে কিছুই নন, তিনি এসে তাঁর চেম্বারের পর্দা পাল্টানোর মতো কিছু কাজ করতেও মিনিমাম সাত থেকে আট দিন লেগে যাবে। আর সমস্যা হল, এই আমলা দামলা সরিয়ে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে একজন নতুন মুখ্যমন্ত্রী না বসাতে পারলে আপনাদের ইচ্ছেপূরণের কোনও চান্স নেই, আর সেটা করার ধক আপনাদের জ্ঞানেশ কুমারের নেই। এই আমলা সরানো আসলে চমকানো, ধমকানো, সঙ্ঘি জ্ঞানেশ কুমারের ধারনা এসব করেই তিনি প্রভুদের সেবা করছেন। না করছেন না, উলটে জেনে রাখুন এই প্রত্যেকটা পদক্ষেপ ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে যাবে ভোটের বাক্সে। ইতিমধ্যেই এতকিছুর পরেও ওই গোদি মিডিয়ার সমীক্ষাও এ বাংলাতে বিজেপিকে ১১৫-র বেশি দিতে পারছে না। হ্যাঁ, মানুষ দেবে ভোট, আমলারা নয়, মানুষের কাছে যত স্পষ্ট হবে এই অগণতান্ত্রিক চেহারা, তত ক্ষোভ দানা বাঁধবে, হ্যাঁ, পাঁচ বছর পরে ‘সাত রাজার ধন এক মানিক’ এই ভোট দেবার অধিকার নিয়ে মানুষ বড্ড সেনসেটিভ, ছলে বলে কোউশলে সেই ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে চাইলে কপালে দুঃখ আছে।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here