পাঁচ বছর আগে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা আমরা দেখেছিলাম, রাজ্যে তৃণমূলের বিরাট জয়ের পাশেই নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হেরে যাওয়া, ১৯৫৪ ভোটে। সারা রাজ্যে জেতার আনন্দ মাঠে মারা গিয়েছিল তৃণমূলের। আর সেদিন থেকেই নন্দীগ্রাম এক আলোচনার বিষয়। হ্যাঁ, শুভেন্দু ভূমিপুত্র, হ্যাঁ, ওই জেলার দায়িত্বে থাকার সুবাদেই শুভেন্দুর হাতেই ছিল সংগঠনের চাবিকাঠি, কোন তালা কোন চাবিতে খোলে- সেটা বুঝেই নেমেছিলেন শুভেন্দু। তবুও আমরা, মানে সাংবাদিকেরাও কেউই আশা করিনি, মানে আমাদের হিসেবেই ছিল না নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে যাবেন, যে নন্দীগ্রামের নামের সঙ্গে তাঁর নাম জুড়ে আছে, হাজার মোছার চেষ্টা করলেও তা মোছা যাবে না। আবার পাঁচ বছর পরে সেই নন্দীগ্রাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, তা আর নতুন কী? এখনও যা খবর তাতে মমতা ব্যানার্জি নন্দীগ্রাম থেকে লড়ছেন না, কিন্তু সেখানে যে চমক থাকবে তা বলে দিতে হবে না, সেই চমক নিয়ে গবেষণা পরে করা যাবে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীও কি ওই আসন থেকে দাঁড়াবেন? ভোটের শতাংশ হিসেবে এক শতাংশের কম ভোটের ব্যবধানে জেতা আসনে দাঁড়ানো কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে? আর এই আলোচনার মধ্যে মাথায় রাখুন ওই আসনে তথাকথিত ‘আগুনপাখি’ মীনাক্ষী মুখার্জি সিপিএম-এর হয়ে দাঁড়িয়ে ২.৭৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ মহলে এই নির্বাচনে লড়া নিয়ে চিন্তা শুরু হয়েছে, মানে কোথাও তো একটা হেরে যাবার সম্ভাবনা কাঁটার মত খচ খচ করছে। সেটাই বিষয় আজকে, সিপিএম-এর সাহায্যের পরেও শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে জিতবেন?
আসুন অঙ্কের হিসেবটা বুঝে নিই। নন্দীগ্রাম আদতে কাদের আসন ছিল? সেই ১৯৭৭ থেকেই নন্দীগ্রাম কখনও সিপিআই-এর হাতে গিয়েছে, কখনও জনতা পার্টি, কখনও কংগ্রেসের হাতে গিয়েছে। ১৯৭৭ আর ১৯৯৬-এ সিপিআই হেরেছিল, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১-এ সিপিআই জিতেছিল, ২০০১ আর ২০০৬-তে জিতেছিলেন মহম্মদ ইলিয়াস, সিপিআই প্রার্থী। ২০০৯-এ প্রথম তৃণমূল ওই আসন বাই-ইলেকশনে জেতে, শহীদ মা ফিরোজা বিবি সেবারে জিতেছিলেন, ২০১১-তেও উনিই জিতেছিলেন। ২০১৬-তে শুভেন্দু অধিকারী জেতেন ৬৭ শতাংশ শতাংশ ভোট পেয়ে, কিন্তু তখনও সিপিআই-এর ভোট ছিল ২৬ শতাংশের বেশি। ২০২১-এ সেই বামেরা ২.৭৪ শতাংশ ভোট পেলেন, বিজেপি-র ৫ শতাংশ ভোট ৪৩ শতাংশে বাড়ল, মানে বামেদের প্রায় সবটার উপরেও তৃণমূলেরও অনেকটা ভোট পেয়ে সামান্য ব্যবধানে শুভেন্দু জিতলেন। গত ৫ বছরে বিজেপি ভোটের ক্ষয়কে মাথায় রাখলে অঙ্কের হিসেবে কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী এই আসনে জিততে পারবেন না।
আরও পড়ুন: Aajke | লকেট না মিঠুন, বিজেপির রাজ্যসভার মুখ কে?
কিন্তু সেখানে দুটো ফ্যাক্টর কাজ করছে, সারা রাজ্যের কোনও আসনে বাম প্রার্থীর নাম কিন্তু ঘোষণা করা হয়নি, কিন্তু একজন প্রার্থীর নাম এসে গিয়েছে, তিনি হলেন সেই ‘আগুনপাখি’ মিনাক্ষী মুখার্জি, সিপিএম-এর ক্যান্ডিডেট, তিনি কিন্তু এবারে উত্তরপাড়ায় দাঁড়াচ্ছেন। উত্তরপাড়া হল সিপিএম-এর সেই ১১টা আসনের মধ্যে একটা, যেখানে তারা ২০২১-এ ২০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। তাহলে নন্দীগ্রামে? সেই আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সিপিআই-কে, মানে ওই আসনে শুভেন্দু অধিকারীকে হারানোটা সিপিএম-এর প্রায়োরিটি নয়। সিপিএম-এর সরে যাওয়া কি শুভেন্দুকে সাহায্য করবে? না হিতে বিপরীতও হতেই পারে? গতবারে ওই আসনে সিপিআই-এর কর্মীরা কাজ করেননি, ভোটও দেননি, এরকম খবর আছে। এবারে সিপিয়াই যে আসনে সেই কবে থেকে লড়ে আসছে, সেখানেই লড়বে। যদি দু-তিন শতাংশ বেশি ভোট পায়? তাহলে কিন্তু ঘটি উল্টোবে। এদিকে নন্দীগ্রাম ছেড়ে শুভেন্দুর বের হওয়াটা এমনিতেই রিস্কি। হ্যাঁ, বিজেপির মধ্যেও অন্তর্ঘাত হয়, হবার আশঙ্কা আছে। সব মিলিয়ে এক স্টিকি রিস্কি আসনেই শুভেন্দু অধিকারিকে দাঁড়াতে হবে, যেখানে প্রশাসনিকভাবে, দলের সাংগঠনিকভাবে পাঁচ বছর ধরে কাজ চালিয়ে গিয়েছে আইপ্যাক, তৃণমূল। কতটা কার্যকরী, তা তো নির্বাচনের পরে বোঝা যাবে, তবে আসন ১০০ শতাংশ নিশ্চিত নয়। যে আসনের ব্যবধান এক শতাংশের কম ছিল, সেই আসন নিশ্চিত হবেই বা কী করে? তার উপরে তৃণমূলের প্রার্থী কে হবেন, সেটাই তো এক চমক হতেই পারে। সব মিলিয়ে শুভেন্দু অধিকারী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে কঠিন নির্বাচনে নামছেন। নিজের আসন ধরে রাখতে হবে, দলকে কম-সম করেও ১৩০ পার করাতে হবে। পারবেন? আমরা ওই নন্দীগ্রামেই মানুষজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুভেন্দু নন্দীগ্রামেই দাঁড়ালে জিতবেন? তাঁর জেতার সম্ভাবনা কতটা? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।
২০২১ সালে বিজেপি ০ থেকে ৫ শতাংশ ভোটের মার্জিনে ৩২টা আসন জিতেছিল। মানে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট কমলেই, আমি নির্দিষ্ট কোনও দিকে সুইংয়ের কথা বলছি না, ধরুন ওই ৫ শতাংশ বামেদের দিকে চলে গেল, তাহলেই বিজেপি কিন্তু ৭৭ থেকে ৪৫ হয়ে যাবে। মানে হিসেব কিন্তু পরিস্কার বলছে যে, বামেদেরা ভোট বাড়াতে পারলে বিজেপি কমবে। তৃণমূলের এখনকার ভোট ব্যাঙ্কে বামেরা হাতও দিতে পারছে না। কমার সম্ভাবনা আছে? সে আলোচনা পরে। পাঁচ কেন এক শতাংশ ভোট কমলেও কিন্তু আগের হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে বিধানসভার ফটক বন্ধ হয়ে যাবে।
দেখুন আরও খবর:
