Fourth Pillar | মোদিজি, ‘বন্দে মাতরম’ টেলিপ্রম্পটার না দেখে পুরোটা গেয়ে শোনান, তাহলে বুঝবো আপনার দম আছে

0
29

এটা আলাদা কথা যে, মোদিজি টেলিপ্রম্পটার দেখেও শুদ্ধ উচ্চারণে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে পারবেন না, গাইলে সেটা ‘চোলায় চোলায় বাজবি জোয়ের’ ভেড়ী হয়ে যাবে, পায়্যের বেগে কী যে কেটে যাবে, তা বোঝাও যাবে না। কিন্তু সেই মোদি সরকার আর তেনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ১০ পাতার ফতোয়াতে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার জন্য একগুচ্ছ কড়া নিয়ম জারি করা হয়েছে। এই নতুন প্রোটোকল বলছে, যখনই কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ গাওয়া হবে, তার ঠিক আগেই ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে। এই গানটার ছ’টা স্তবকই গাইতে হবে, আর তার জন্য ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড সময় ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এবং বলা হয়েছে যে, জাতীয় গান গাওয়ার সময় উপস্থিত সবাইকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ‘অ্যাটেনশন’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। হুকুম তামিল করো বুম বুম বা, সেটা আবার কেবল সরকারি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নেই। বলা হয়েছে, দেশের সমস্ত বিদ্যালয়ে দিনের কাজ শুরু করার আগে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এই জাতীয় গান গাওয়ানো উচিত। উচিতার্থে সপ্তমীও নয়, স্কুল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা জাতীয় গান, জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়াতে নিয়মিত কর্মসূচির আয়োজন করে। কিন্তু বিকেলে আরএসএস-এর শাখার সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ হবে না, সেখানে ওই ‘নমস্তে সদা বৎসলে’ ইত্যাদি। তবে সিনেমা হলের ক্ষেত্রে ছাড় আছে, যদি কোনও সিনেমা বা নিউজ রিলের অংশ হিসেবে এই গানটা বাজানো হয়, তাহলে দর্শকদের দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই, কারণ তাতে নাকি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। যেন এমনিতে বিশৃঙ্খলা খুব কম আছে। কেবল গান বলে দিয়েই ক্ষান্ত নেই, গানের কাঠামোও বলা আছে, নির্দেশ অনুযায়ী, গানটা শুরু হওয়ার আগে একটা ড্রাম রোল থাকবে, ড্রাম রোল বোঝেন না? ওই যে লক্ষণের শক্তি শেলের সময়ে ঢ্যা র‍্যা র‍্যা র‍্যা র‍্যা র‍্যা…, সেটাকে ড্রাম রোল বলে, ড্রাম রোল দিয়ে বলা হবে, ‘ভাই সকল এবার দাঁড়িয়ে পড়ো’, যা সাত কদম ধীর গতির মার্চের সমান সময় নেবে। এ কদম গাছে ফোটে না, এ কদম হল পা, সপ্তপদী গমন। এরপর এক বিটের বিরতি দিয়ে গান শুরু হবে। গানের মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে এর মানে জেনে নিন। এছাড়াও মৃদঙ্গ বা ট্রাম্পেট জাতীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্কুলে এবারে মৃদঙ্গ আর ট্রাম্পেট বাদকের চাকরি হবে।

কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এই বিতর্ক কেন? আমাদের সর্বোচ্চ আদালত তো বহু আগেই এই বিষয়ে রায় দিয়েছে। সমস্যা তো গানের কথায়, বিতর্কিত দিকটা হল, এর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের নিজের ধর্ম পালন এবং চর্চা করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। ইসলাম বা খ্রিস্টান ধর্মের মতো একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তি বা বস্তুর উপাসনা বা বন্দনা করা যায় না, নিষিদ্ধ। ‘বন্দে মাতরম’-এর চতুর্থ, পঞ্চম স্তবকে যখন দেশমাতৃকাকে দুর্গা বা লক্ষ্মী হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তখন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বা খ্রিস্টানের পক্ষে সেই স্তোত্র পাঠ করা, তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৩০-এও তো এই একই আপত্তির কথা উঠেছিল। মুসলিম লিগ, তৎকালীন অনেক মুসলিম নেতা এই গানের শেষের স্তবকগুলো নিয়েই তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, গানের শেষের অংশে দেশমাতাকে সরাসরি হিন্দু দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’, মানে ‘তুমিই সেই দশ অস্ত্রধারী দেবী দুর্গা’। মুসলমানদের জন্য দেশপ্রেম নিয়ে কোনও সমস্যা না থাকলেও, এক ভৌগোলিক ভূখণ্ডকে দেবী হিসেবে কল্পনা করে তাঁর আরাধনা করা, মূর্তিপূজার সমতুল্য স্তব পাঠ করা তাঁদের একেশ্বরবাদী বিশ্বাসের পরিপন্থী। সে কথা তো সর্বোচ্চ আদালতও বলেছে। ১৯৮৬ সালের ‘বিয়ো ইমানুয়েল বনাম কেরল রাজ্য’ মামলার কথাটা একটু বলি? এই মামলায় জেহোভা’স উইটনেস সম্প্রদায়ের তিনজন শিশুকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, কারণ তাঁরা জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ গায়নি। তাঁরা অসম্মান করেনি, গানের সময় শ্রদ্ধার সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁরা ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারও গান গাইতে পারে না, তাই তাঁরা গান গায়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি চিন্নাপ্পা রেড্ডি সেই সময় এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, যদি কারও সত্যিকারের, আন্তরিক ধর্মীয় বিশ্বাস, তাঁকে কোনও গান গাইতে বাধা দেয়, তবে তাকে জোর করা যাবে না। আদালত রায় দেয় যে, সম্মানের সাথে দাঁড়িয়ে থাকাই যথেষ্ট, গান গাওয়াটা বাধ্যতামূলক নয়। আদালত আরও বলেছিল যে, আমাদের সংবিধান এবং ঐতিহ্য আমাদের সহনশীলতা শেখায় এবং এই সহনশীলতা যেন নষ্ট না হয়।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মুক্তিযুদ্ধে সেদিনের বিশ্বাসঘাতকেরা আজ বাংলাদেশ রাজনীতির মাঝমাঠে

প্রশ্ন তো ওঠাই উচিত যে, ১৯৩৭-এর কংগ্রেস অধিবেশনে কেন এই গানের দু’স্তবকই গাওয়া হল? কারণ তার আগে জিন্না আর কংগ্রেসের কিছু হিন্দুত্ববাদী নেতারা এই নিয়ে জলঘোলা শুরু করে। মুসলমান বহু সামাজিক সংগঠন থেকেও এই গান নিয়ে আপত্তি ওঠে। আবার গানের সবটাই রাখার জন্যও কিছু হিন্দুত্ববাদী নেতা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু খেয়াল করুন, সেই নেতাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস নেই। কারণ ‘বন্দে মাতরম’কে তাঁরা কংগ্রেসের গান বলেই মানতেন, সেই ১৯২৫ থেকেই আরএসএস-এর শাখাতে ওই ‘নমস্তে সদা বৎসলে’ই গাওয়া হয়েছে। সে যাই হোক, এই বিতর্ক ওঠার পরে গান্ধী সক্রিয় হয়ে ওঠেন, আর সেই সময়ে এই বিতর্ক মেটাতে ১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষচন্দ্র বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ চান। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত হওয়ায় একেশ্বরবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এক সমাধান দেন, যা ‘মধ্যপন্থা’ হিসেবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, গানের প্রথম দু’টো স্তবকে দেশমাতৃকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাম, শস্য শ্যামলাম’, যার মধ্যে কোনও ধর্মীয় বিরোধ নেই। এই অংশটা সমস্ত ভারতীয় আনন্দের সাথে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বাকি স্তবকগুলো যেখানে হিন্দু দেবীদের আবাহন করা হয়েছে, তা এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন এই গানের শেষের অংশগুলো নিয়ে আপত্তি করেছিলেন, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, জাতীয় গান বা সঙ্গীত এমন হওয়া উচিত যা দেশের প্রতিটা মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। সুভাষচন্দ্র বসুকে লেখা এক চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, কোনও মুসলমানের পক্ষে কি জাতীয় গানের অংশ হিসেবে সেই সব হিন্দু দেবীদের প্রশংসা মেনে নেওয়া সম্ভব, যাদের মূর্তি মন্দিরে পূজা করা হয়? রবীন্দ্রনাথ গানের প্রথম দুটো স্তবককে অত্যন্ত উঁচু মানের সাহিত্য হিসেবে গণ্য করতেন এবং সেগুলোকে তিনি ‘প্রকৃতি বন্দনা’ হিসেবে দেখেছিলেন কিন্তু তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে যখন এই গানটাকে দেখা হয়, তখন তা অনেক সময় একপাক্ষিক বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের মনে আঘাত দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, দেশমাতৃকাকে ভক্তি করা আর কোনও বিশেষ ধর্মীয় মূর্তির আরাধনা করা এক জিনিস নয়। তাই তিনি গানটাকে ‘সম্পাদনা’ করে প্রথম দুই স্তবকে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলেছিলেন যাতে এটা এক সর্বজনীন রূপ পায়। তাঁর এই পরামর্শ মেনেই ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় যে, জাতীয় স্তরে কেবল প্রথম দুটো স্তবকই গাওয়া হবে।

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের গণপরিষদ বা কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির শেষ অধিবেশনে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে ‘জনগণমন’ হবে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’ হবে জাতীয় গান। তবে সেই সময়ও ১৯৩৭ সালের সেই সমঝোতাটাকেই মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং গানের কেবল প্রথম দুটো স্তবককেই জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তার মানে খুব পরিষ্কার এক সাময়িক ব্যবস্থা নয়, দেশের বহুত্ববাদকে মাথায় রেখেই রবিঠাকুরের বিবেচনামতই এই গানের পরবর্তি তিন স্তবককে গাওয়া হয়নি। আর সেই প্রথম দুস্তবকই আজকেও আমাদের জাতীয় গান। একইভাবে রবি ঠাকুরের লেখা ‘জনগনমন অধিনায়ক জয় হে’ আদতে পাঁচ প্যারাগ্রাফের গান, যার কেবল প্রথম প্যারাটাই আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। কাজেই বিজেপি সরকারের এই ফতোয়া আইনতসিদ্ধ নয় আর এই ফতোয়ার উদ্দেশ্য হিন্দু মুসলমান সম্পর্ককে খারাপ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে এক ধারে এপস্টিন ফাইল, অন্যদিকে জেনারেল নারভানের বই, আরেক ধারে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া আমেরিকা ভারত বাণিজ্য চুক্তির ফাঁসে মোদিজির দমবন্ধ, তাই সেখান থেকে নজর ঘুরিয়ে দিতেই মোদিজি আবার এই হিন্দু-মুসলমান খেলায় নামলেন। এক নির্লজ্জ নোংরামি, রবি ঠাকুরের বিবেচনার উপরে নিজেকে রাখার পাগলামি আর দেশের মুসলমান, সংখ্যালঘু মানুষজনকে আরও দাবিয়ে রাখার এক ছক নিয়ে হাজির মোদি সরকার।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here