একটা মজার গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। বৃষ্টিবাদলার দিন। খালে জল উঠেছে। তার উপর সরু একফালি বাঁশের সাঁকো। এতটাই সরু যে, মাত্র একজনই যেতে পারে তার উপর দিয়ে। সেই সাঁকোর দুদিকে এসে দুজন লোক দাঁড়িয়ে গেল। একজন চেঁচিয়ে বলল, “আমায় আগে যেতে দিন, নাহলে কাল যা করেছিলাম, আজও তাই করব।” উল্টোদিকের মানুষটি ভয় পেয়ে গেল। “না না, আসুন দাদা, আপনিই আগে যান।” ওপারে যাবার পরে সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা দাদা কালকে আপনি কি করেছিলেন? প্রথমজন বলল, “কি আর করব, ওপারের লোকটাকে আগে যেতে দিয়েছিলাম!” বিশ্ব রাজনীতির পটভূমিকায় এই গল্পটাই বোধহয় ঘটে গেল আরেকবার। তফাৎ এইটুকু যে, গল্পের সাঁকোর উল্টো দিকের লোকটা ভয় পেয়েছিল, আর এখানে ইরান ভয় পায়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু যা করার তাই করেছেন। অর্থাৎ, হাতা গুটিয়ে মাসল ফুলিয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হয়ে গিয়েছেন। এ যেন সুকুমার রায়ের ছড়া, ইরান বলল, “জানিস আমি স্যান্ডো করি?”, ট্রাম্প বললেন, “ভেরি ভেরি সরি মশলা খাবি?”
সত্যি, রূপকথায় ‘হবু চন্দ্র রাজা’র কথা পড়েছিলাম, এখন নিজের চোখে দেখছি। তার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ঠিক কি বলেছিলেন ট্রাম্প? ‘আজ রাতেই ইরানের শেষ’ বলে ঘোষণা করেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আর তার পরই ইরানের তৈলভাণ্ডার, খার্গ দ্বীপে পর পর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে বলে খবর এসেছিল। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে বলে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই সময়সীমা পেরনোর যখন আর কয়েক ঘন্টা বাকি, তার আগে ট্রাম্প লেখেন, ‘আজ রাতে একটা গোটা সভ্যতার মৃত্যু হবে, আর ফেরানো যাবে না। আমি চাই না সেটা হোক, কিন্তু হয়তো হবেই। এখন ক্ষমতার সম্পূর্ণ পালাবদলই লক্ষ্য, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন স্মার্ট, কম চরমপন্থী মানসিকতার লোকজন থাকবেন। হতে পারে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটবে। কে জানে? আজ রাতেই সব বোঝা যাবে’। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘৪৭ বছরের তোলাবাজি, দুর্নীতি, মৃত্যু মিছিলের শেষ হতে চলেছে পাকাপাকি ভাবে। ঈশ্বর ইরানের মহান জনগণকে আশীর্বাদ করুন’। এত বড় কথা! কিন্তু বাস্তবে কি হল? ইরানের সঙ্গে দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মুখপোড়া ডোনাল্ড ট্রাম এখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জোকার
সত্যিটা তাহলে কি? ইরান ভয় পায়নি কিন্তু ট্রাম্প ভয় পেয়েছেন? যখন গোটা একটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেবার কথা বলেছেন, তখন কি ট্রাম্পের পারমাণবিক আক্রমণের কথাই মাথায় ছিল? মার্কিন ইনটেল কি ট্রাম্পকে জানিয়েছে যে ইরান ইটের জবাব পাথর দিয়ে দিতে তৈরি, অর্থাৎ পাল্টা পারমাণবিক হানা হতে পারে আমেরিকাতেও? এসবই কথার কথা। আজ্যামশান। কিন্তু সত্যিটা হল এই যে, ইরান-আমেরিকার দুসপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিতে সব থেকে বড় ভূমিকা যারা নিয়েছেন, তাদের অন্যতম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরান একটি ১০ দফা শর্তাবলী প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিরতি; ইরানের উপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি; যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা ইরানি তহবিল ও জব্দ করা সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়া এবং পুনর্গঠনের খরচ বাবদ সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি। এছাড়াও ইরান কোনও ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উল্টোদিকে ট্রাম্প কি বলেছেন? ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দিতে রাজি থাকলে তিনি দু’সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা বন্ধ রাখবেন। হরমুজ প্রণালী হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল এবং অন্যান্য পণ্য রফতানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করে ফেলায় তিনি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন’।
ট্রাম্প মুখে যতই বড় কথা বলুন না কেন ইউরোপের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কিন্তু মনে করছেন, চড়া দামে সন্ধি করতে হল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। ঘুমায়নি মারা যাবার পর ট্রাম্প মনে করেছিলেন, এইবার ইরান ভেঙে পড়বে। ক্যাপ্টেন ছাড়া জাহাজ চলে না। কিন্তু সেনাপতি ছাড়াও যে যুদ্ধ হয় ইরান সেটা দেখিয়ে দিল।
সূত্রের খবর, ইরান আমেরিকার এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম পড়তে শুরু করেছে। আর এই কৃতিত্বের একটা বড় অংশ কে নিয়ে গেলেন? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। কিন্তু উল্টোদিকে বিশ্বগুরু কি করছেন? নরেন্দ্র দামোদর মোদি, এটলাসের মতো যিনি গোটা বিশ্বের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, এত বড় একটা কাণ্ডে তাকে কোথাও খুঁজেই পাওয়া গেল না! যে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসবদের আঁতুড়ঘর’ বলে বিশ্বের সামনে মোদি সরকার চিহ্নিত করতে চেয়েছিল, আজ তাদেরই এই সাফল্যে কি জবাব দেবে সরকার? আরে মশাই, ইরানের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এই মুহূর্তে মোদি সরকারের হাতে আছে। তা হল বাংলার ভোট। তোরা যে যা বলিস ভাই আমার পছিমবঙ্গাল চাই।
দেখুন আরও খবর:

