যুদ্ধ, হ্যাঁ প্রত্যেক যুদ্ধ ভূরাজনীতিকে বদলে দেয়, দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে কেবল এই অঞ্চলের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, তা বিশ্বশক্তির ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ আর চমকপ্রদ যে সত্যিটা বেরিয়ে আসছে তা হল আপাতদৃষ্টিতে ইরানের ওপর যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে, তার ছাই থেকেই ইরান এক নতুন, সম্ভবত আরও অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। আর একই সঙ্গে, এই পুরো সংঘাতে এক দেশ এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে একটা গুলি না চালিয়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্থনৈতিক বিজয় হাতিয়ে নিয়েছে, হ্যাঁ সেটা হলো চীন। এই রূপান্তরকে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মহাকাব্য বলা যেতেই পারে, যেখানে প্রথাগত সামরিক শক্তি আর আধুনিক কৌশলের লড়াইয়ে পর্দার আড়ালের খেলোয়াড়রাই আসলে লাভবান হচ্ছে। ইরানের (Iran) উপর ইজরায়েল আমেরিকা (US-Israel) যে আঘাত হেনেছে, তা যেকোনও সাধারণ রাষ্ট্রের পতনের জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তাকিয়ে দেখুন ইরান এখনও হুমকি দিচ্ছে, ইরান এখনও শর্ত দিচ্ছে, ইরান এখনও আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে এই যুদ্ধকে, ইরান আটকে রেখেছে হরমুজ বন্দর, যার জ্বালায় চিড়বিড়িয়ে উঠছে প্রায় সব রাষ্ট্র। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই সহ ডজনখানেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, যা ইজরায়েলি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার এক বিরাট সাফল্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছিল । কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা আর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই ধরনের ‘ডিক্যাপিটেশন’ বা শীর্ষ নেতৃত্বকে মেরে ফেলার কায়দা অনেক সময়েই হিতে বিপরীত হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটতে চলেছে। পাগলা ট্রাম্প সাহেবের জানাই নেই যে ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল কোনও এক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটা প্রায় পাঁচ দশকের আন্তর্জাতিক একাকিত্ব আর নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক এক্সট্রিম হার্ড, ব্যালান্সড স্ট্রাকচার, এক অত্যন্ত শক্তপোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো । সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরানের ক্ষমতা এখন পুরোপুরিভাবে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির কট্টরপন্থী অংশের হাতে চলে গিয়েছে, তাঁরা দেশের একটা মানুষ বেঁচে থাকা পর্যন্ত প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখবেন। যখন কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরের স্তরের নেতারা নিহত হন, তখন ভেতর থেকে এক নতুন প্রজন্ম বেরিয়ে আসে যারা আগের চেয়ে অনেক বেশি উগ্র, অনেক বেশি প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠে যাদের হারানোর আর কিছুই নেই। আমরা আফগানিস্থানে এ জিনিষ দেখেছি। আমেরিকা ইজরায়েল আশা করেছিল যে নেতৃত্বের পতনের পর ইরানের সাধারণ মানুষ হয়তো রাস্তায় নেমে আসবে, শাসনের পরিবর্তন ঘটাবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল এই যুদ্ধ ইরানের জনগণকে আরও বেশি শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত করে তুলেছে । মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া জাতীয়তাবাদী চেতনা ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে আরও সংহত, শক্তিশালী করবে। সামরিক দিক থেকেও ইরান দেখিয়েছে যে তারা কেবল টিকে থাকতেই জানে না, তারা অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বিধ্বংসী বিমান হামলা জুন ২০২৫-এর ১২ দিনের যুদ্ধের পরও ইরান তার প্রত্যাঘাত করার ক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি । তারা তাদের ড্রোনের বিশাল ভাণ্ডার আর ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো পাহাড়ের গভীর সুড়ঙ্গে মাটির নিচে এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছে, যা আকাশপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব । ইরানের প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার বিশাল শক্তি, ৩ হাজার বছরের প্রাচীন এক সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য তাদের এমন এক কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে, যা কোনো সীমিত মেয়াদের যুদ্ধ করে শেষ করা সম্ভব নয় । যুদ্ধের এই ধ্বংসস্তূপ থেকে ইরান যখন উঠে আসবে, তখন তারা আবার এক লড়াকু জাতি হিসেবে নিজেদের বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রহীন করার লক্ষ্য নাকি অর্জন হয়েছে । কিন্তু বাস্তব ছবিটা অনেক বেশি জটিল আর বিপজ্জনক। নাতাঞ্জ, ফোরডো, ইসফাহানের মতো কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হলেও, ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো ধ্বংস হয়নি । প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো ইরানের সুড়ঙ্গগুলোতে মজুত রয়েছে যা ১২টা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট । সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো, এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে যা নিয়ন্ত্রণ করা বা ওখান থেকে সরিয়ে ফেলা আমেরিকার পক্ষে আর সম্ভব নয় । আগে ইরানের ধর্মীয় নেতারা পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন আইআরজিসি শাসিত ইরান নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে আরও দ্রুত এগোবে । আগে যা ছিল দর কষাকষির মাধ্যম, এখন তা হয়ে উঠবে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত। ধ্বংস হওয়া ল্যাবরেটরিগুলো হয়তো তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগবে, কিন্তু বোমা তৈরির প্রয়োজনীয় জ্ঞান আর কাঁচামাল ইরানের কাছেই রয়ে গিয়েছে। আমেরিকা ইজরায়েলের হামলা ইরানকে আসলে একটা পারমাণবিক সক্ষম রাষ্ট্রের দরজায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আসুন একটু ইতিহাসের কথা মনে করি, মনে আছে? ১৯৫৬ সালে ব্রিটেন যখন মিশরের সুয়েজ খাল দখল করতে গিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল? আজ আমেরিকার বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা সেরকম । আমেরিকা এই যুদ্ধে এক বিশাল অসম লড়াইয়ের ফাঁদে পা দিয়েছে। ইরানের এক-একটা শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র ২০ হাজার ডলার, অথচ সেই ড্রোন আকাশে ধ্বংস করতে আমেরিকার যে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করতে হয়, তার এক-একটার দাম ১২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে ।
আমেরিকা তার লক্ষ কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার দ্রুত নিঃশেষ করে ফেলছে, যেখানে ইরানের ড্রোন তৈরির ক্ষমতা প্রায় অসীম । আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, তাদের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাও এই যুদ্ধের ফলে চরম সংকটে পড়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভুলে আমেরিকা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, হ্যাঁ খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই আক্ষেপ করেছেন। ইজরায়েলের ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমেরিকা আশা করেছিল যে ইরান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। কিন্তু আমেরিকার আসল কৌশলগত লক্ষ্য তো চীন, কিন্তু এই মুহুর্তে চীনকে নিয়ে আমেরিকার ভাবার সময় নেই । আমেরিকা যত বেশি মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে অর্থ, সামরিক শক্তি অপচয় করবে, বিশ্বমঞ্চে তাদের প্রভাব তত বেশি ফিকে হয়ে আসবে। এই ক্লান্তি আর সম্পদের অপচয় আমেরিকান সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনবে। এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে এই যুদ্ধের পুরো পরিস্থিতির দিকে তাকালেই দেখা যায় যে, চীন কোনো সরাসরি লড়াইয়ে অংশ না নিয়েও সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে এসেছে। চীনের এই সাফল্যের পেছনে কাজ করছে তাদের দীর্ঘমেয়াদী, অসম্ভব পরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। প্রথমত, আমেরিকা যখন ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে বোমা ফেলছে, চীন তখন সেই অর্থ সাশ্রয় করছে তাদের নিজেদের নৌবাহিনী আর প্রযুক্তির আধুনিকীকরণে। আমেরিকার প্রতিটা ডলার যা ইরানের ওপর ফেলা হচ্ছে, তা আসলে চীনকে প্রশান্ত মহাসাগরে আটকানোর তহবিল থেকে কমছে । আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে যত বেশি ব্যস্ত থাকবে, দক্ষিণ চীন সাগরে, তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের আধিপত্য বিস্তারের পথ তত বেশি প্রশস্ত হবে । ২০২৫, ২০২৬ সালে চীন তাইওয়ানের চারপাশে রেকর্ড সংখ্যক সামরিক মহড়া চালিয়েছে, তাদের বিমান অনুপ্রবেশের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ তারা জানে আমেরিকা এখন দুই দিকে একসঙ্গে পূর্ণশক্তি নিয়ে লড়তে পারবে না । দ্বিতীয়ত, চীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে এখন একমাত্র স্থিতিশীল আর বিশ্বস্ত অংশীদার হয়ে উঠেছে। যেখানে আমেরিকা কেবল যুদ্ধ দিয়েই রেজিম পরিবর্তনের চেষ্টা করে, চীন সেখানে কূটনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব, ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা তাদের এই অঞ্চলে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী কূটনীতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে । এমনকি যুদ্ধের মধ্যেও চীন ইরান থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ছোট ছোট ‘টিপট রিফাইনারি’র মাধ্যমে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জ্বালানি সংগ্রহ করছে, যা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাস নিতে সাহায্য করছে আর চীনকে সস্তায় জ্বালানির নিশ্চয়তা দিচ্ছে । তৃতীয়ত, চীন এখন ইরানের আর অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তার এক অলিখিত গ্যারান্টার জামিনদার হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:Fourth Pillar | বর্গির দল বাংলা দখলে এসেছে, রুখে দাঁড়ান
পাকিস্তান, ইরানের মতো দেশগুলো এখন চীনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে কারণ তারা দেখেছে যে আমেরিকার বন্ধু হওয়া মানে যেকোনো সময় যুদ্ধের কবলে পড়া, আর চীনের বন্ধু হওয়া মানে অর্থনৈতিক, কৌশলগত সুরক্ষা পাওয়া । চীন এই অঞ্চলে তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প এনে এমন এক পরিকাঠামো তৈরি করছে যেখানে ইরান, পাকিস্তান, প্রায় সব উপসাগরীয় দেশগুলো একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যাবে, আর এই পুরো নেটওয়ার্কটা আমেরিকার কন্ট্রোলে থাকবে না। সবাই জানে জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায় । ইরান এই জলপথে এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে আর তারা ইতিমধ্যে এই চোকপয়েন্টটা ব্যবহারের করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। এর ফলে তেলের দাম, প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে গ্যাসের দাম প্রায় ৯১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে । মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকা এই জলপথে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে আর বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অথচ চীন এই পরিস্থিতির ফায়দা তুলছে এক অদ্ভুত উপায়ে। চীন মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে এমন এক অলিখিত সমঝোতায় এসেছে যাতে চীনা জাহাজগুলোর ওপর কোনো হামলা না হয় । এর ফলে আমেরিকা যখন বিশ্ব বাণিজ্যের পথ নিরাপদ রাখার দায়ভার আর খরচ বহন করছে, চীন তখন সেই নিরাপত্তার সুবিধা নিয়ে বিনে পয়সায় বা ‘ফ্রি-রাইডার’ হিসেবে নিজের বাণিজ্য বৃদ্ধি করছে । আমেরিকার এই ব্যর্থতা আর চীনের এই নিঃশব্দে এগিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হবে। প্রক্সি নেটওয়ার্কের নতুনচেহারা নিয়েছে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট হয়ে উঠেছে। তারা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে আর এক বিরাট সংকট তৈরি করেছে। ইহুথিদের এই ক্ষমতা, ইরানের পাহাড়ঘেরা কৌশলগত অবস্থান প্রমাণ করে যে কোনো সাময়িক বিমান হামলার দিয়ে ইরানকে দমানো সম্ভব নয় । বরং এই যুদ্ধ ইজরায়েলকেই এক দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
ইজরায়েল এখন বেশ বুঝতে পারছে যে তারা কেবল আকাশপথে বোমা মেরে শান্তি কিনতে পারবে না। আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধীরে ধীরে সরে যাবে, তখন ইজরায়েলকে এক ভয়ংকর শক্তিশালী আর প্রতিহিংসাপরায়ণ ইরানের মোকাবিলা করতে হবে, যার পেছনে কেবল চীনের মতো পরাশক্তির সমর্থন থাকবে তাই নয়, দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার মুসলমান দেশগুলো তাকিয়ে দেখবে তাদের শত্রুকে বাঘে খাচ্ছে। আবার দেখুন ভারত আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যে ‘আইএমইসি’ অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যুদ্ধের ফলে তা এখন প্রায় পরিত্যক্ত । এটাও চীনের জন্য আরও বড় এক খুশির খবর, কারণ ভারতের এই বিকল্প রুটটা ব্যর্থ হওয়া মানে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা। ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু ইরান এখন পুরোপুরি চীনের প্রভাব বলয়ে চলে যাচ্ছে, যা ভারতের জন্য এক বড় কূটনৈতিক পরাজয় হতে পারে । সবমিলিয়ে ইরান সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা আগামী দিনে এক নতুন রাজনৈতিক পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আরও সংহত হবে। তাদের নেতৃত্বের পরিবর্তন ইরানকে আরও কট্টর আর পশ্চিমা বিরোধী করে তুলবে। আর এই সবকিছুর মাঝে চীন চুপচাপ নিজেকে আগামী দিনের বিশ্বনেতা হিসেবে প্রস্তুত করে নিচ্ছে। চীন দেখিয়েছে যে বন্দুকের চেয়ে ব্যাংক আর বোমার চেয়ে বাণিজ্য অনেক বেশি শক্তিশালী।

