৩৩ দিন পার হল, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলে যৌথ বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর, এখন তা থামার নাম নেই। এই অভিযান ইরানের সার্বভৌমত্বের উপর যে নজিরবিহীন আঘাত হেনেছে, তা কেবল এক আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এই অভিযান বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংঘাতের অভিঘাত এখন আর কেবল তেহরান বা তেল আবিবের অলিগলিতে সীমাবদ্ধ নেই; প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক, আর আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রতিটা দেশের অর্থনীতি কূটনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের মতো এক দেশ, যার জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তার এক বিশাল অংশ পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতার উপর নির্ভরশীল, আমাদের জন্য এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেখুন এই মহাবিপদের দিনেও ভারতের মহান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হীরণ্ময় নিরবতা, কৌশলগত দোদুল্যমানতা কেবল কূটনৈতিক মহলেই নয়, সাধারণ মানুষের মনেও বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার এই দহনকালের শুরুতে মনে হয়েছিল, এটা কেবল ইরানের পারমাণবিক, সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপর কয়েকদিনের বিমান হামলার করার পরে থামবে। কিন্তু আজ যখন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও এই যুদ্ধে সরাসরি ইরানের পক্ষে যোগদানের ঘোষণা দেয়, তখন এটা পরিস্কার যদি আমেরিকা আক্রমণ থেকে না সরে তাহলে হুতিদের এই সিদ্ধান্তের ফলে লোহিত সাগরের বাব-এল-মানদেব প্রণালী বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক জলপথে হয়ে উঠবে। এটা হল এখন ‘মৃত্যুর প্রণালী’ বা ‘Strait of Death’, হুতিদের ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল যুদ্ধজাহাজ নয়, সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের উপরও চরম খড়গহস্ত হয়ে উঠেছে। এর ফলে লোহিত সাগর দিয়ে চলতে থাকা বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য এখন কার্যত স্থবির। হুতিদের যদ্ধে সামিল হবার সাথে সাথেই যুদ্ধের মাত্রা আরও তীব্র হয়েছে কারণ ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্ব সম্ভবত গত অর্ধশতাব্দীর সবচেয়ে বড় সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয়ের সাপ্লাই চেইন ডিজাস্টারের দিকে দিকে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হেঁটে চলেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল আসে যায়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির হাহাকার শুরু হয়েছে। হুতিদের বাব-এল-মানদেব, ইরানের হরমুজ—এই দুই চাবিকাঠির সাঁড়াশি চাপে বিশ্ব অর্থনীতির দম বন্ধ। তার প্রত্যক্ষ আঁচ এসে পড়েছে ভারতের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
১ এপ্রিল ২০২৬ বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ১৯৫.৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী দিল্লিতে ১৯ কেজি ওজনের একটি বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম এখন ২,০৭৮.৫০ টাকা এবং কলকাতায় তা ২,২০৮ টাকায় পৌঁছেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির আঁচ দিল্লির গোবিন্দপুরীর ফুটপাথের সেই চা বিক্রেতা বা কলকাতার অলিগলির ছোট হোটেলের মালিকদের বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তেল সংস্থাগুলো যদিও ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের দাম আপাতত স্থিতিশীল রাখার দাবি করেছে, কিন্তু মার্চ মাসেই এর দাম ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব বহুমাত্রিক। আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা এটিএফ-এর দাম ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কিলোলিটার ২ লাখ টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম। সরকার যদিও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য এই বৃদ্ধিকে আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবে ইন্ডিগোর মতো বিমান সংস্থাগুলো দূরত্বের ভিত্তিতে ৩০০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ চাপিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই চার্জ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর ফলে পর্যটন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জরুরি যাতায়াতও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার উপরে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের উপর। পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের কাঁচামাল যেমন পিপি, পিভিসি-র দাম ৫০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারের খবর পাওয়ায় প্লাস্টিক, ডিটারজেন্ট, জুতোর দাম একলাফে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে, রুটি বা বিস্কুটের প্যাকেটেও ৩ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের জন্য জীবনযাত্রার এই খরচ এখনই এক অসহ্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বিজেপির ‘সুনার বাংলা’ ১০০ শতাংশ ঢপবাজি
ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি। পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত ভারতের কৃষকদের সামনে এক ভয়াবহ ছবি এনে দাঁড় করাচ্ছে। ভারত তার ইউরিয়া সারের মোট চাহিদার প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আমদানি করে আর তার এক বিশাল অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে, ঐ হরমুজ প্রণালী হয়ে। ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫০ শতাংশই আসে ওইখান থেকেই। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া রফতানি আর এক-তৃতীয়াংশ সারের বাণিজ্য এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়। আর সেই জলপথ বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম টন প্রতি ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ৭২০ ডলারে পৌঁছেছে। ভারতের সামনে এখন ২০২৬ সালের খরিফ মৌসুমের বিরাট চ্যালেঞ্জ। সরকারের দাবি যে তাদের কাছে ১৮০.১২ লাখ মেট্রিক টন সারের বাফার স্টক বা মজুদ রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি, কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে এই মজুদ ফুরিয়ে আসতে সময় লাগবে না। সারের দাম বাড়লে বা সরবরাহ কমলে সরাসরি তার প্রভাব পড়বে ধান গমের উৎপাদনে, যা শেষ পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্যের দাম বাড়াবে আর মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছোঁবে। যুদ্ধের পরে আমাদের শেয়ার বাজারের অবস্থা কী? ১ এপ্রিলের বাজার খোলার সাথে সাথেই সেনসেক্স নিফটিতে ধস নেমেছে। একদিনেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার সম্পদ ভ্যানিশ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন, যার ফলে টাকার দাম মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৯৫-এ নেমেছে।
আর এত কিছুর পরেও ট্রাম্প অত্যন্ত আমেরিকান ভোটারদের বোঝাচ্ছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর আমেরিকার আর কোনও নির্ভরতা নেই, জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলো যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনে বা হরমুজ প্রণালী থেকে তা ‘ছিনিয়ে নেয়’। মানে মেগালো ম্যানিয়া আক্রান্ত ট্রাম্প সাহেব তাঁর বকওয়াস চালিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হচ্ছে, আর ঠিক তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই স্থবিরতা এই মৌনতা অত্যন্ত হতাশাজনক। অনেক দেশই এখন ‘strategic hedging’ বা কৌশলগত সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে তারা জনসমক্ষে কিছু না বলে কেবল নিজেদের পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করছে। মোদিজিও সেই নীতি নিয়েই চলছেন। যুদ্ধের ২৪তম দিনে সংসদে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, না, মার্কিন-ইজরায়েল হামলার সরাসরি কোনও নিন্দা করেননি। এটা মোদি সরকারের কূটনৈতিক দুর্বলতা বা ইজরায়েল-ঘেঁষা নীতির প্রতিফলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের চরম পরিপন্থী। অথচ ভারত সরকার এই আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বদলে কেবল তেলের দাম আর ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত, ব্রিকস গোষ্ঠীর সদস্য গ্লোবাল সাউথের নেতা বিশ্বগুরুর কাছে অনেক বেশি সাহসী কূটনৈতিক ভূমিকার প্রত্যাশা ছিল বিশ্বের।
কিন্তু মোদিজি তো মোদিজি! বিপদ সামনে দেখলেই ওনার ৩৬ ইঞ্চি, কুঁকড়ে ৬ ইঞ্চি হয়ে যায়, আর মুখে বোবা মেরে যায়। সরকারের এই মৌনতা ভারতের সেই ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো, যারা এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত,তাদেরই উচিত ছিল যুদ্ধবিরতির জন্য একসঙ্গে চাপ তৈরি করা। কিন্তু নয়াদিল্লির নীরবতা কেবল ট্রাম্পের হাতকেই শক্ত করছে না, বরং ভবিষ্যতে ভারতকে এর জন্য চড়া অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হতে পারে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কেরলে নির্বাচনী জনসভায় যুদ্ধ আসছে বলে ভয় দেখাচ্ছেন, একবারের জন্যও এই যুদ্ধের মূল উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। আসলে উনি কম্প্রোমাইজড, হ্যাঁ, এই শব্দটা ব্যবহার করেছেন রাহুল গান্ধী। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ কেবল দুটো দেশের সংঘাত নয়, এটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাপ্রলয়। হুতিদের লোহিত সাগরে সক্রিয় হওয়া আর হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা ভারতের জ্বালানি, খাদ্য আর্থিক স্থিতিশীলতাকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বিশ্বনেতাদের সুবিধাবাদী নীরবতা এই সংঘাতকে আরও লম্বা করতেই পারে। ভারতের সংকট কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ ছিল সক্রিয় আর নিরপেক্ষ কূটনীতি। কিন্তু মোদি সরকারের বর্তমান মৌনতা, কৌশলগত অস্পষ্টতা ভারতকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যদি দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হয়, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া না হয়, তাহলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতির যে দাবানল জ্বলবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কেবল অসম্ভবই হবে না, এর রাজনৈতিক ও সামাজিক খেসারত মোদি সরকারকে আগামী অনেক বছর ধরে দিতে হবে।
দেখুন আরও খবর:

