কর্নাটকের ভোট প্রচার চলছে, কিন্তু সারা দেশে ২০২৪-এর প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক শিবিরে দ্রুত ঘুঁটি চালা হচ্ছে, আস্তিনের সব তাস কি দেখায় খেলোয়াড়? এখানেও সব তাস দেখা যাচ্ছে না। যা দেখা যাচ্ছে চোখের সামনে, তাই কি সত্যি না তাও নয়। পর্দার আড়ালে নানান তিকড়মবাজি চলছে। এবং একবারও মনে করবেন না তা কেবল বিরোধী দলগুলোর মধ্যে চলছে, সেই প্যাঁচপয়জার নিয়ে জটিল অঙ্ক কষছে এমনকী আরএসএস–বিজেপিও। আরএসএস–বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। তার জন্য সাম দাম দণ্ড ভেদ। প্রতিটা অস্ত্র তারা নিপুণভাবেই প্রয়োগ করছে, তা নিয়ে আলোচনা কাল। আজ তাদের প্রতিপক্ষের তুণীরের অস্ত্র নিয়েই আলোচনা। লক্ষ কোটি টাকা খরচ করার পরেও, দেশজোড়া রাম আবেগ, হিন্দুত্বের আবেগ ছড়ানোর পরে, দেশজুড়ে এক জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবেগ ভাসিয়ে দেওয়ার পরেও আরএসএস–বিজেপি দক্ষিণে ব্যাকফুটে। বাংলা, বিহার, ওড়িশা, অন্ধ্র, তেলঙ্গানা, পঞ্জাব, হিমাচলপ্রদেশ, দিল্লি তাদের হাতের বাইরে। মহারাষ্ট্র বা মধ্যপ্রদেশে তাদের বিধায়ক কিনে সরকার তৈরি করতে হয়েছে, তাতে বহু সমস্যাও আছে। মাথায় রাখুন যখন ২০২৪-এ সাধারণ নির্বাচন হবে তখন এই মহারাষ্ট্র বা মধ্যপ্রদেশে ডাবল ইনকমবান্সির সামনা করতে হবে বিজেপিকে। কিন্তু তবুও বিজেপি অ্যাডভানটেজ, কেন?
কারণ উল্টোদিকে নানান পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের ভিন্নমুখী অবস্থান, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সীমাবদ্ধ, তাদের বিরুদ্ধে, প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। তবুও ২০২৪-এর আগে হলচল, বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, মমতা-নবীন, মমতা-স্তালিন বৈঠক হচ্ছে, নীতীশ-সোনিয়া, রাহুল-খাড়্গে বৈঠক হয়েছে, নীতীশ কেজরিওয়াল বৈঠক হয়েছে। আমরা নীতীশ-মমতা, নীতীশ-অখিলেশ বৈঠক দেখলাম। সাংবাদিকদের সামনে হাসিমুখ, নীতীশ বললেন হাম তো সমাজবাদী হ্যায়, মমতা বললেন আমার কোনও ইগো নেই, অখিলেশ বললেন মিলকর চলেঙ্গে। এই হলচল কেন? তার প্রথম কারণ দেশজুড়ে মোদি–শাহের ইডি সিবিআই ভিজিলেন্স হানা। কেজরিওয়ালের ডান হাত জেলে, মমতার দু’ নম্বর মন্ত্রী জেলে, দলের অসংখ্য নেতা বিধায়ক দুর্নীতির দায়ে রোজ সিবিআই, ইডি দফতরে হাজিরা দিচ্ছেন। শরদ পাওয়ারের ডান বাঁ হাতের উপর ইডির হামলা জারি, স্তালিনের বোন কানিমোঝির মামলা আবার সামনে, উদ্ধবের দল ভাঙার পেছনেও এই ইডি সিবিআই-এর হুমকি। চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়েকে হাজিরা দিতে হচ্ছে সিবিআই দফতরে, অখিলেশ যাদবের বিরুদ্ধে ইডি সিবিআই মামলা আবার খুলছে আর লালু, রাবড়ি, মিসা, তেজস্বী নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন সিবিআই দফতরে। এর মানে কি এরকম যে কেবল বিরোধী নেতারাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে?
দেশসুদ্ধ মানুষ জানে, এই নেতাদের যে কেউ আগামীকাল বিজেপিকে সমর্থন করলেই সব মামলা উঠে যাবে। সমর্থনও চাই না, নবীন পট্টনায়ক, জগমোহন রেড্ডির মতো বিরোধিতা না করলেও খানিক আরাম পাবেন তাঁরা, মানে মামলা থাকবে কিন্তু ডাক পড়বে না। এই ইডি সিবিআই ইনকাম ট্যাক্স ভিজিলেন্স অস্ত্রের যথেচ্ছ প্রয়োগ আটকাতেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরএসএস–বিজেপির বিরুদ্ধে এক হওয়ার চাহিদা বেড়েছে। অন্য আর এক দিক হল রাজ্যপালের ভূমিকা, স্বাধীনতার পরে এমন কদর্য ভূমিকা এর আগে দেখা যায়নি। রাজ্যপাল এক সাংবিধানিক প্রধান না মোদি-শাহের এজেন্ট বোঝা যাচ্ছে না। ব্রাত্য বসু ভালো বাংলায় বলেছেন মত্ত হস্তীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজ্যপাল, প্রকাশ্যেই বলেছেন, কিন্তু জান্তে মুঞ্চায়, ঘরোয়া আড্ডাতেও কি তিনি মত্ত হস্তীই বলেছেন? নাকি হস্তীর জায়গায় অন্য কোনও প্রাণীর নাম বসিয়েছেন? সে কথা বাদ দিলেও এটা পরিষ্কার যে বিরোধী শাসিত রাজ্যে রাজ্যে রাজ্যপালের ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত মুখ্যমন্ত্রীরা একজোট হওয়ার তাগিদা বোধ করছেন। তাই পিনারাই বিজয়ন চিঠি লিখছেন স্তালিনকে, স্তালিন লিখছেন মমতাকে, এই রাজ্যপাল ইস্যুতে এক মঞ্চে দাঁড়াচ্ছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
আরও পড়ুন: জিতনি আবাদি উতনা হক, আটকাতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি (24.03.23)
তৃতীয় যে বিষয়টা বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে অক্সিজেন জোগাচ্ছে তা হল বিজেপি সরকারের ফেডারেল ইকোনমি নিয়ে অবস্থান, মানে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাজ্য তার প্রাপ্য পাচ্ছে না। জিএসটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে, এবং মাঝেমধ্যেই মোদিজি বা বিজেপি নেতারা বলছেন আমরা ফ্রিতে গ্যাস দিচ্ছি, ফ্রিতে র্যাশন দিচ্ছি, ফ্রিতে টিকা দেওয়া হয়েছে। মনেই হতেই পারে কোনও এক বাপকেলে সম্পত্তি বেচে মোদি সরকার দেশের মানুষদের ফ্রিতে অনেক কিছু দিচ্ছেন, কিন্তু সে টাকা তো রাজ্য থেকেই গেছে, সে টাকা তো দেশের মানুষের টাকা যার বিরাট অংশই প্রাপ্য রাজ্যের মানুষদের। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে চুরমার করছে বিজেপি এবং তার ফল ভুগছে বিভিন্ন বিজেপি বিরোধী রাজ্যের মানুষ, সে রাজ্যের শাসকদল। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ফিরিয়ে আনতেই বিরোধীরা জড়ো হচ্ছেন, লাগাতার বলে যাচ্ছেন মমতা, বিজয়ন, স্তালিন, কেজরিওয়াল, চন্দ্রশেখর রাও, কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীরা। এরপরের যে বিষয় বিরোধীদের এক জায়গায় আনছে তা হল বিজেপির প্রবল হিন্দুত্ববাদ। যেভাবে বিজেপি হিন্দুত্ববাদ নিয়ে এগোচ্ছে, তা বিরোধীদের কাছে একই কারণে বিপজ্জনক মনে হচ্ছে তাও নয়। দেশের মধ্যে সেই অর্থে এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে আদর্শগত অবস্থান কাদের? কমিউনিস্টদের, যদিও তাঁরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ঐক্যমঞ্চে বিজেপিকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন, তবুও কমিউনিস্টরা আদর্শগতভাবেই এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। সমাজবাদী দল আদর্শগতভাবেই এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। আরজেডি তার জন্মলগ্ন থেকেই এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়েছে। বাংলায় জ্যোতি বসু নয়, বিহারে লালু যাদব আটকেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রা। কংগ্রেসের আদর্শগত অবস্থান কট্টর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাকিরা?
উদ্ধভ ঠাকরে এখনও সাভারকারের আদর্শের কথা বলেন, শরদ পাওয়ার বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনডিএ মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন, নীতীশ কুমার তো এই সেদিনেও বিজেপির সঙ্গে হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, ডিএমকে এনডিএ মন্ত্রিসভায় ছিল, কেজরিওয়াল বলেই দিয়েছেন কোনও আদর্শগত অবস্থান নেওয়াটা রাজনৈতিক দলের কাজ নয়, তিনি সুশাসন চান, গুড গভর্নেন্স, ব্যস। কিন্তু এই বিরোধীরা এই প্রবল কট্টর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কেন? হয় তাঁদের আদর্শগত অবস্থান না হলে তাঁদের ভোটব্যাঙ্কের অবস্থান। রাজ্যের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ সংখালঘু ভোট পেয়েছেন মমতা, তাঁর পক্ষে বিজেপিকে এমনকী তলায় তলায় সমর্থনও হারিকিরি, রাজনৈতিক আত্মহত্যা, এটা তিনি জানেন, সিপিএমও জানে। উদ্ধব ঠাকরে চোখের সামনে দল ভাঙতে দেখেছেন, তিনি কট্টর হিন্দুত্ববাদের বদলে মারাঠা জাত্যাভিমানকেই আঁকড়ে ধরেছেন। আপ বুঝে গেছে হনুমান পুজো করলেও কট্টর হিন্দু ভোট তাদের দিকে আসবে না বরং অন্য সংখ্যালঘু ভোট চলে যাবে। ঘোষিত নাস্তিক দল ডিএমকে, নেতা স্তালিন জানেন রাজ্যের কট্টর হিন্দুদের সমর্থন তিনি পাবেন না, তাঁকে বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ হিন্দু ভোটের সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট পেতেই হবে। কাজেই মোটের ওপর কট্টর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে বিরোধীরা একজায়গায় আসছেন। একজায়গায় তো এলেন কিন্তু দেশের মানুষকে ফেডারেলিজম, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ইডি সিবিআই হানা, কেন্দ্রে বঞ্চনা বা রাজ্যপালের ভূমিকার কথা বলে ভোট পাওয়া যাবে? এগুলো বিরোধী ঐক্যের সিমেন্টিং ফ্যাক্টর নিশ্চয়ই, কিন্তু এই কথাগুলো বলে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট পাওয়া যাবে? হ্যাঁ, অবশ্যই দেশের এক বড় শিক্ষিত মানুষজন যাঁরা এগুলো বোঝেন আলোচনা করেন, তাঁদের সমর্থন পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে কেন বলছি? বলা উচিত তাঁদের সমর্থন তো আছেই। কিন্তু আম আদমি? তাঁদেরকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবেন বিরোধীরা? কোন ইস্যুতে তাঁদেরকে নিয়ে আসা যাবে?
হ্যাঁ, এটাই লক্ষ টাকার প্রশ্ন, কেবল ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। এই ভারতের গরিষ্ঠাংশ মানুষের কাছে এমন কিছু ইস্যু তুলে ধরা, এমন কিছু বিষয় যা তাদেরকে বিজেপির এই আগ্রাসী হিন্দুত্ব, এই জঙ্গি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে। সেই দাবিগুলোওকেই আগে চিহ্নিত করা উচিত, সেই দাবিগুলোকে নিয়ে বিরোধী দলগুলোর একসঙ্গে বা আলাদা আলাদা করে পথে নামা উচিত, এখন থেকেই। একমাত্র পথে নেমে সেই আন্দোলনই মানুষের কাছে বিরোধী ঐক্যের বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরতে পারে। কারণ মানুষ বিরোধী ঐক্যের নামে বহু ছ্যাবলামি, বহু বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছে। ক’দিন আগেই বিজেপির ঘর করা নীতীশ কুমার একগাল হেসে বলবেন, আখির হম ভি তো সমাজবাদী হ্যায়, আর মানুষ তা বিশ্বাস করে নেবে তা ভাবার কোনও কারণ নেই। হ্যাঁ দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বিরোধীরা পারলে একসঙ্গে, না পারলে আলাদা আলাদা ভাবে রাস্তায় নামুক কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে, মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের দাবিতে, বিরোধীরা নামুক দেশের লক্ষ কোটি বেকার ছেলেমেয়েদের চাকরির অধিকারের দাবিতে, নামুক প্রত্যেকের জন্য স্বাস্থ্য চাই সেই দাবিতে। বিরোধীরা একজোটে বলুক মিডিয়াম স্মল মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা নিয়ে, আদানি আম্বানির কর্পোরেট লুঠ নিয়ে পথে নামুক বিরোধীরা। বানের জলে ভেসে যাবে মোদি-শাহের কট্টর হিন্দুত্ববাদ বা জঙ্গি জাতীয়তাবাদের বুলি। মানুষের সামনে এক বিকল্প হাজির হোক না হলে মনে হবে সিবিআই ইডি খ্যাদানো কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ পথে নেমেছে পিঠ বাঁচানোর জন্য, কিছু সুবিধেবাদীর জোট যারা কিছুদিন পরেই মন্ত্রিত্ব নিয়ে কামড়াকামড়ি করবে, মধুভাণ্ড লুঠ করার কাজে হাত দেবে। কারণ এ তাবৎ বিরোধী ঐক্য নিয়ে এটাই মানুষের সাধারণ ধারণা, কমন পারসেপশন। সে ধারণার ঊর্ধ্বে না উঠতে পারলে বিরোধী ঐক্য কলকাতা, লখনউ, চেন্নাই বা দিল্লির বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।