কলকাতা: ভারতের বিখ্যাত তীর্থযাত্রাগুলির মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল কেদারনাথ (Kedarnath)। উত্তরাখণ্ড (Uttrakhand) রাজ্যের চোরাবাড়ি হিমবাহের কাছে, মন্দাকিনী নদীর তীরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৫৮৩ মিটার উপরে অবস্থিত দেশের বিখ্যাত ও হিন্দু ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ মন্দির, কেদারনাথ মন্দির (Kedarnath Temple)। ভারতের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের (Jyotirlinga) মধ্যে এটি একটি অন্যতম। যার উল্লেখ মহাভারতেও রয়েছে। উল্লেখ্য, কেদারনাথ মন্দির হল ভগবান শিবের (Lord Shiva) পবিত্র ধাম। উত্তরাখণ্ড চারধাম যাত্রার (বৈদ্যনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনেত্রী) অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পুরাণ মতে জানা যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মহাভারতে জ্ঞাতি হত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে পান্ডবগন তীর্থ দর্শন করতে বেরিয়ে পৌঁছেছিলেন। সেই সময় তারা কাশীতে এসে জানতে পারেন ভগবান শিব তাঁদের দর্শন না দেওয়ার জন্য পাহাড়ের কোলে আত্মগোপন করেছেন। সেখানে নাকি তিনি এক ষাঁড়ের ছদ্মবেশে লুকিয়ে রয়েছেন। খুঁজতে খুঁজতে তারা গৌরিকুণ্ডের কাছে সেই ষাঁড়কে মাটিতে মিশে যেতে দেখে ভীম জাপটে ধরেন। ভগবান তাঁদের হাত থেকে নিস্তার পেতে দৌর শুরু করলেন। এইভাবে দীর্ঘক্ষণ সময় পেরিয়ে মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসলেন বৃষরূপী মহাদেব। তাই কেদারনাথে বৃষের পিঠের কুজ জ্যোতিরলিং হিসাবেই পূজা করা হয়।
আরও পড়ুন:Sabyasachi | Debi Chowdhurani | বিরতি কাটিয়ে ‘দেবী চৌধুরানী’তে ফিরছেন সব্যসাচী
মহাভারত অনুসারে জানা যায়, একদা পাণ্ডবরা ভগবান শিবকে তুষ্ট করার জন্য কেদারনাথ মন্দির নির্মাণ করেন। শোনা যায়, ৮ম শতকে হিন্দু দার্শনিক আদি শঙ্করাচার্য তাঁর শিষ্যদের নিয়ে এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ২০১৩ সালে বিধ্বংসী হরপা বানে কেদারনাথ মন্দির-সহ শহরের প্রচুর ক্ষতি হয়েছিল। পার্বত্য অঞ্চলে বিধ্বংসী ভূমিধস এবং বন্যার শিকার হলেও, পাহাড় থেকে নেমে আসা বিশাল পাথর নেমে আসা সত্ত্বেও মন্দিরটির কোনও রকম ক্ষতি হয়নি। অনেকেই মনে করেন, কোনও এক ঐশ্বরিক শক্তি এটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, একটি বিশাল পাথর মন্দিরের পিছনের অংশকে আটকে রেখেছিল। যার কারণেই জল এবং ধ্বংসাবশেষ তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল এবং কেদারনাথ মন্দির ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা হয়েছিল।
মন্দিরের অভিভাবক হলেন ভগবান ভৈরননাথজী। হিমালয়ের প্রকৃতির কোলে অবস্থিত কেদারনাথ মন্দিরটি নাকি তিনিই পাহারা দেন। ভগবান ভৈরনাথ জি গাড়োয়াল অঞ্চলের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবতা । তিনি সুরক্ষা এবং ন্যায় বিচারের প্রভু। ভগবান শিবের জ্বলন্ত অবতার এবং ধ্বংসের সাথে যুক্ত। ভৈরনাথজি “ক্ষেত্রপাল” নামেও পরিচিত। ভৈরনাথ জির মন্দির কেদারনাথ মন্দিরের দক্ষিনে অবস্থিত। তিনি কেদারনাথ মন্দির কে অশুভ আত্মা বা শক্তি থেকে রক্ষা করে থাকেন।
কেদারনাথ মন্দির পঞ্চ কেদারের একটি অংশ। পঞ্চ কেদার ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত পাঁচটি পবিত্র স্থান। যার সবকটি গাড়োয়াল হিমালয় এ অবস্থিত। শুধু তাই নয়, যারা পঞ্চকেদার তীর্থযাত্রায় পড়ে -তুঙ্গনাথ (যেখানে ভগবান শিবের হাত পড়েছিল), রুদ্রনাথ ( যেখানে ভগবান শিবের মুখ পড়েছিল), মধ্য মহেশ্বর (যেখানে ভগবান শিবের পেট পড়েছিল), এবং কল্পেশ্বর (যেখানে ভগবান শিবের নীচের অংশ পড়েছিল)। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল কেদারখণ্ড, তাই এখানে শিবকে কেদারনাথ নামে পূজা করা হয়।
এই মন্দিরটি প্রতি বছর বৈশাখ মাসে দর্শণার্থীদের জন্য খোলা হয় এবং কার্তিক মাসের প্রথম দিনে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শীতকালীন সময়টা ভগবান কেদারনাথকে উখিমঠে স্থাপন করা হয়। তবে তুষারাবৃত হিমালয়ের কোলে এবং মন্দাকিনী নদী তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত এই মন্দির এবং পরিবেশের সান্নিধ্য যে কোনও মানুষকে মুগ্ধ করবেই। গৌরীকুণ্ড থেকে কেদারনাথের দূরত্ব প্রায় ১৬ কিমি। এখানে থেকে আপনি ট্রেকিং করে কিংবা হেলিকাপ্টারের সাহায্যে ও মন্দিরে পৌঁছে পারেন। কেদারনাথ ভ্রমণের জন্য মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়টাই ভ্রমণের জন্য আদর্শ।
কীভাবে যাবেন- কলকাতা থেকে বিমানে চেপে প্রথমে পৌঁছে যান দেরাদুনের জলি গ্রান্ট বিমানবন্দর। সেখান থেকে ৫ ঘণ্টার দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে যান গৌরীকুণ্ড। গৌরীকুণ্ড থেকে পৌঁছে যান কেদারনাথের উদ্দেশ্যে। এছাড়াও হাওড়া থেকে ট্রেনে ধরে পৌঁছে যান হরিদ্বার। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে যান গুপ্তকাশী। এরপর গুপ্তকাশী থেকে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যান সোনপ্রয়াগ অথবা গৌরীকুণ্ড। একদিন গৌরীকুণ্ডে রাত্রিবাস করে পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়ুন কেদারনাথ দর্শনে।