হিমাচল প্রদেশের (Himachal Pradesh) জ্বালামুখী মন্দিরের অগ্নি শিখা কখনই নেভে না! মন্দিরটি অবস্থিত হিমাচলের কাংড়া জেলার কালিধর পাহাড়ে। সতীর একান্নপীঠের এক পীঠ জ্বালামুখী (Jwalamukhi Mandir)। জ্বালামুখী কালীধর পাহাড়ের উপর অবস্থিত। মন্দিরটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২০০০ ফুট উচ্চতায়। বর্তমানে একটি ছোট শহর গড়ে উঠেছে মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে। জ্বালামুখী দলাই লামার আবাস ধর্মশালা থেকে ৫ কিমি দূরত্বে অবস্থিত। বৈষ্ণোদেবী ছাড়া আর কোনও দেবস্থান এত প্রাচীন নয় বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের। জ্বালামুখীর কথা ‘মহাভারত’-এও উল্লিখিত রয়েছে। এই জাগ্রত মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নিন বিস্তারিত।
দক্ষযজ্ঞে স্বামীর অপমানমেনে নিতে না পেরে যখন সতী প্রানত্যাগ করেন তখন শোকে অধীর হয়ে শিব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করেন। তার এই উন্মত্ততা দেখে দেবতারা ভয় পেয়ে যান। সেই সময় বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতী দেহ খন্ড খন্ড করে কেটে ফেললেন। দেহের এক একটি অংশ পৃথিবীতে এসে পড়ে। পরবর্তীকালে সেই স্থানগুলি সতীপীঠ নামে খ্যাত হয়। কথিত আছে সতীর জিহ্বা এখানে পড়েছিল।
হিন্দু ধর্মশাস্ত্র বলছে, অগ্নি স্বয়ং ঈশ্বর বা শিব। আর তাঁর জিহ্বা বা জিভ হলেন প্রকৃতি বা শক্তি। এখানেই পতিত হয়েছিল সতীর জিহ্বা। তাই দেবী এখানে অবস্থান করেন সিদ্ধিদা রূপে, তাঁর ভৈরব উন্মত্ত। জিহ্বা পতিত হয়েছিল বলে অগ্নিময় জিহ্বারূপেই ভক্তদের দর্শন দেন দেবী। জ্বালা দেবীর মন্দিরে রয়েছে ৯টি সদা জ্বলন্ত অগ্নিশিখা।এই নয়টি অগ্নিকুণ্ডর রয়েছে নির্দিষ্ট নাম। অন্নপূর্ণা, চণ্ডী, হিংলাজ, বিন্ধ্যবাসনী, মহালক্ষ্মী, সরস্বতী, অম্বিকা, অঞ্জিদেবী এবং মহাকালী নামে এক একটি কুণ্ড পরিচিত। প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী মন্দিরে দেবীমূর্তি দর্শনে যান। অগ্নিশিখারূপেই ভক্তের চোখের সামনে ধরা দেন দেবী কালী।ধরিত্রীর বুক চিরে বের হয়েছে আগুনের শিখা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই অগ্নিশিখা জ্বলছে। একবারের জন্যও তা নেভেনি। অনেকে বলে থাকেন, ওই অনির্বাণ অগ্নিশিখা পর্বতজাত প্রাকৃতিক গ্যাসের আগুনে রূপান্তর। ভারত সরকার সেই রহস্যভেদের জন্য গবেষণাও চালায়। কিন্তু, ওই পাহাড়ে কোনও প্রাকৃতিক গ্যাসের অস্তিত্ব মেলেনি। দিনরাত এই মন্দিরে দেবীর আরতি চলে। বিষ্ণুচক্রে কর্তিত হওয়ার পর সতীর জিহ্বা অগ্নিশিখারূপে এই পর্বতে অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু, লোকচক্ষুর অগোচরে। এক রাতে রাজাকে স্বপ্নাদেশ দেন স্বয়ং দেবীই! জানিয়ে দেন, তিনি কোথায় রয়েছেন। মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ভূমিচাঁদ। পরবর্তীতে মহারাজা রঞ্জিত সিং এবং রাজা সংসার চাঁদ ১৮৩৫ সালে এই মন্দিরের নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। যা আজও পূর্ণ মহিমায় উজ্জ্বল।
আরও পড়ুন: Indian Destination । দেশেই রয়েছে এক চিলতে বিদেশ, ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই ঘুরে আসুন
কথিত আছে সম্রাট আকবর এই মন্দিরে গিয়েছিলেন। তিনি জল ঢেলে মন্দিরের শিখা নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। দেবীর মাহাত্ম্য প্রমাণ করার জন্য মন্দিরের কাছাকাছি এক ঝরনার বাঁক মন্দিরের দিকে ঘুরিয়ে দেন, যাতে অগ্নিশিখা গুলি নিভে যায়, কিন্তু তারপরেও জলের সংস্পর্শে এসেও সেই অগ্নিশিখা না নেভায় আকবর দেবীর মাহাত্ম্য বুঝতে পারেন। মোগল সম্রাট ভক্তিতে এই শিখার ওপর একটি সোনার ছাতা বানিয়ে দেন। কিন্তু, সেই সোনার ছাতা নাকি সঙ্গে সঙ্গেই ফুটো হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা ওই ছাতাটি পরীক্ষা করে, তার মধ্যে কোনও সোনাই খুঁজে পাননি। ভক্তদের বিশ্বাস, মোগল সম্রাটের অহংকারকে ধ্বংস করে দেবীই সোনাকে সাধারণ ধাতুতে পরিণত করেছিলেন। আকবর ভক্তিতে অর্থব্যয় করে এই মন্দিরের তোরণদ্বার তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। ফিরোজ তুঘলক এই মন্দির ধ্বংস করতে সচেষ্ট হলে বহু মৌমাছি এসে তাকে ও তার সৈন্যদের কে আক্রমণ করে এবং সেই আক্রমণের ফলে মন্দির ধ্বংস করার কাজ থেকে তারা বিরত হন, আর ফিরে যেতে বাধ্য হন।
এছাড়া দেখা যায় মন্দিরের সামনে একটি ছোট নাট মন্দির আছে, যেখানে নেপালের রাজার দেওয়া অসংখ্য ঘন্টা ঝুলানো আছে। মন্দিরের উত্তর দিকের দেওয়ালে যে জ্যোতি শিখা দেখা যায়, সেটি হলো আদি অগ্নিশিখা, রুপার সিংহাসন বসানো হয়েছে। এই জায়গা টিকেই বলা হয় দেবীর প্রধান গদি অথবা আসন। যারা দেবীর পুষ্পাঞ্জলি দেন, তারা এই সিংহাসনের সামনেই পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন। দেবীকে রাবড়ি, দুধ, মিছরি, প্যাড়া, বিভিন্ন ধরনের ফল ইত্যাদি ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়ে থাকে। ভক্তদের দাবি, কোনও মানত করতে হয় না। এই মন্দিরে এসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করলেই নাকি তা পূরণ হয়ে যায়।