কলকাতা: আজ বিপত্তারিণী পুজো (Bipodtarini Puja)। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া থেকে নবমী তিথিতে যে কোনও শনি বা মঙ্গল বারে এই ব্রত পালন করা হয়। মা বিপত্তারিণী আসলে দুর্গারই (Maa Durga) আর এক রূপ। এই পুজোর মাধ্যমে সন্তান, স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের সমস্ত ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করার প্রার্থনা করেন বিবাহিত মহিলারা। এই কামনা পূরণের উদ্দেশে হাতে ১৩টি গিঁট বিশিষ্ট বরাদ সুতো বাঁধা হয় হাতে। জেনে নিন বিপত্তারিণী পুজোর দিন ও পুজোর নিয়ম।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসে রথযাত্রা থেকে উল্টোরথের মধ্যে যে মঙ্গলবার ও শনিবার পড়ে, সেইদিনই এই ব্রত পালন করা হয়। এ বছর ২ তারিখ (২৪ জুন) শনিবার ও ৫ তারিখ (২৭ জুন) মঙ্গলবার অর্থাৎ বাংলা ক্যালেন্ডারের ১৭ ও ২০ আষাঢ় বিপত্তারিণী পুজো পড়েছে। সমস্ত রকমের বাধা, বিপত্তি ও বিপদ থেকে সন্তান এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্যই এই পুজো করা হয়। তবে বিপত্তারিণী পুজোর বিশেষ কিছু নিয়ম রয়েছে।
কবে থেকে শুরু বিপত্তারিণী মায়ের পুজো শুরু- পুরাণ অনুযায়ী, শুম্ভ-নিশুম্ভ, অসুর ভাইদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দেবতারা মহাশক্তিশালী মহামায়ার স্তব করেন। সেই সময় পার্বতী সেখানে হাজির হন। দেবতাদের জিজ্ঞাসা করেন, “তোমরা কার পুজো করছো।” দেবী নিজেই দেবতাদের পরীক্ষা করার জন্য এই প্রশ্ন করেন। কিন্তু, দেবতারা তাঁকে চিনতে পারেননি। তখন পার্বতী নিজের রূপ ধরেন, সকলের সামনে আবির্ভূত হন। তিনি এসে বলেন, “তোমরা আমারই স্তব করছ। চিনতে পারনি আমায়।” তারপর তিনি ভয়ঙ্কর শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেন অনায়াসে। দেবতাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন। সেই থেকেই বিপত্তারিণী মায়ের পুজো শুরু। তারপর মর্ত্যলোকে এই পুজোর প্রচলন হয়।
এই পুজোর একটি কাহিনি রয়েছে। ব্রতকথা অনুযায়ী, বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশের এক রানির এক নিম্নবর্ণের সখী ছিলেন। তিনি জাতে মুচি। এই মহিলা নিয়মিত গোমাংস খেতেন। রানিও একদিন কৌতূহলী হয়ে গোমাংস খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। প্রথমে তিনি নিমরাজি হন। পরে তিনি রানির আদেশ রক্ষার্থ গোমাংস আনেন। অন্তঃপুরে গোমাংস প্রবেশ করেছে— এই খবর রাজার কাছে পৌঁছে যায়। তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে রানিকে শাস্তি দিতে উদ্যত হন। রানি গোমাংস তাঁর বস্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে রেখে বিপত্তারিণী মা দুর্গাকে স্মরণ করতে থাকেন। রানিকে তল্লাশি করে রাজা দেখতে পান তাঁর বস্ত্র আড়ালে গোমাংস নয়, রয়েছে একটি লাল জবা ফুল। লাল জবা কালী পুজোর অন্যতম উপকরণ। মায়ের এই পুষ্প দেখে রাজা তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। রানিকে ক্ষমা করে দেন। মা বিপত্তারিণী দুর্গার কৃপায় রানির বিপদ কেটে গেল। এরপর থেকে রানি নিষ্ঠা-সহকারে বিপত্তারিণীর ব্রত করতে থাকলেন। সেই থেকেই বিপত্তরিণীর পুজো প্রচলিত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পুজোর নিয়মকানুন – বিপত্তারিণী মায়ের পুজোয় ১৩ সংখ্যাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্রত পালন করতে লাগে ১৩টি ফল, ১৩টি ফুল, ১৩টি সুপুরি ও ১৩ রকম নৈবেদ্য। এই ব্রত পালনের দিন কেউ কেউ ১৩ টি ছোট ছোট লুচি ভেজে খান। ব্রত পালন করলে চাল বা চালজাতীয় জিনিস নিয়ে তৈরি কোনও খাবার খাওয়া যাবে না। মুড়ি, ভাত, চিঁড়ে থেকে দূরে থাকতে হবে। এদিন মহিলারা আলতা, সিঁদুর পরে পুজো করেন। লাল সুতোয় ১৩টি গিট বেঁধে পুজো হয়। সেই ধাগা হাতে বাঁধা হয় মঙ্গল কামনায়। এদিন পরিবারের সকলেই নিরামিষ খেয়ে থাকেন।